শিরোনাম
ভয়ে কাঁপছি
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০১৬, ১৮:২২
ভয়ে কাঁপছি
হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী
প্রিন্ট অ-অ+

মার্কিন নির্বাচনের আগে একটি ছোট লেখা লিখেছিলাম। মার্কিন নির্বাচন ও অন্ধ নারী গণকের ভবিষ্যদ্বাণী শিরোনামের লেখাটি শেষ করেছিলাম এভাবে : হাঙ্গেরী না অন্য কোনো পূর্ব ইউরোপীয় দেশের এক অন্ধ নারী গণক নাকি বহুকাল আগে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, একজন কৃষ্ণ মানুষই হবেন আমেরিকার শেষ প্রেসিডেন্ট। তারপর নাকি আমেরিকাই থাকবে না।


ভবিষ্যতবাণীতে আমার আস্থা নেই। কিন্তু হালে যা ঘটছে তা দেখে-শুনে সভয়ে ভাবি, তবে কি ওই অন্ধ নারী গণকের ভবিষ্যতবাণীই সত্যি হতে চললো!


'হালে যা ঘটছে' বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম দুই প্রধান প্রার্থীর নজিরবিহীন নোংরা আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ, একজন প্রার্থীর ' জয়ী না হলে ফলাফল মেনে না নেয়ার' ঘোষণা, নির্বাচনের পর 'প্রয়োজনে' সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি ইত্যাদিকে।


নোংরা ভাষায় আক্রমণের ঘটনাটা দু'দিক থেকেই ঘটছে। বাকি সবগুলোর 'একক কৃতিত্ব' শ্রীযুক্ত ট্রাম্প মহাশয়ের।


তার এসব উল্টাপাল্টা কথা, আক্রমণ ও বেমানান শরীরী ভাষা - সব মিলেমিশে পরিস্থিতি এমন মনে হচ্ছিল যে, ট্রাম্পের পরাজয় বুঝি সময়ের ব্যাপার। দেশটির মিডিয়াও সময়ে-সময়ে জনমত জরিপ চালিয়ে সে-রকম আভাসই দিচ্ছিল যেন হিলারি প্রেসিডেন্ট হয়েই গেছেন, বাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতা।


জনমত জরিপ দিয়ে যদি নির্বাচনের ফলাফল স্থির করা যেতো, তাহলে তো হতোই। কিন্তু হয় না, এখানেও হয়নি। ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন - কথাটাকে সত্য প্রমাণিত করে ফিকশন বা কল্পকাহিনীর ওপর জয়ী হলো বাস্তবতা। সব জল্পনা, জনমত জরিপ, মিডিয়া ও বিশিষ্টজনদের উদ্বাহু সমর্থন - সবকিছুকে ভুল প্রমাণিত করে জয়ী হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। অনৃতভাষণের, নারীর প্রতি অসম্মানের, অনভিজ্ঞতার।


ট্রাম্প জয়ী হলেন, হিলারিও মার্কিন গণতান্ত্রিক রীতিমাফিক পরজয় মেনে নিলেন। অতএব, নটে গাছটি মুডে গিয়ে আমাদের সকলের সব কথা এখানেই ফুরোতে পারতো আর ট্রাম্প সাহেবও সুখে-শান্তিতে দেশশাসন, পৃথিবীশাসন করতে পারতেন।


কিন্তু না, তা বুঝি আর হলো না। এবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলো হিলারির সমর্থকরা। তারা শুরু করলো রাজপথে বিক্ষোভ। কী ব্যাপার? না, তারা ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট মানেন না। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের আগে যে বিষয়ে 'একক কৃতিত্বের' অধিকারী ছিলেন ট্রাম্প, এবার তার ভাগীদার হতে চাইছে হিলারি-সমর্থকরা। ট্রাম্প জয়ী না হলে তার সমর্থকরা যা করতো, হিলারি হেরে যাওয়ায় তার সমর্থকরাও তা-ই করছে। তারা কি জানে, এর মধ্য দিয়ে তারা ট্রাম্প-সমর্থকদের কাতারে নেমে আসছে!


প্রতিবাদ-বিক্ষোভ গণতন্ত্রের ভাষা, এ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রতিবাদেরও তো একটা ব্যাকরণ থাকা লাগে। একজন ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়ামাত্রই তিনি কেন জয়ী হতে গেলেন, এই 'মহাঅপরাধে' রাস্তায় নেমে পড়া - একেও কি গণতান্ত্রিক অধিকার বলা যায়?



শুরুটা করেছিলাম অন্ধ নারী গণকের ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে। শুক্রবার দেখলাম, ভারতীয় একটি বাংলা পত্রিকায়ও একই প্রসঙ্গ। তারা বলেছে, কই, ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হলো না তো! আমেরিকা তো ভেঙ্গে যায়নি!


পড়ে মনে হলো, লেখক (বা সাংবাদিক) বুঝি আমেরিকার ভাঙ্গন দেখতে অস্থির হয়ে গেছেন। তিনি বা তারা বুঝতে চাইছেন না যে, ৪৪তম প্রেসিডেন্টের মেয়াদপূর্তি বা ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে কিংবা পরদিনই আমেরিকা ভেঙ্গে যাবে - এমন কথা ওই গণক নিশ্চয়ই বলেননি। আর বললেই বা কী, আমেরিকা ভাঙবে, এমন দিব্যিও তো কেউ দেয়নি!


গত লেখায় বলেছিলাম, এখনও বলছি, আমি ভবিষ্যতবাণীতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু 'অলক্ষণের তিলকরেখা' ভেসে বেড়াচ্ছে দেখে সত্যিই ভয়ে কাঁপছি।


কেননা ট্রাম্পের জয়ের পর ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে স্বাধীনতার দাবি জোরালো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যকে পৃথক করতে চায় ‘ইয়েস ক্যালিফোর্নিয়া ইন্ডিপেন্ডেন্স’ ক্যাম্পেইন নামে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী। এ দলটি ২০১৮ সালের ব্যালটে ক্যালিফোর্নিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে একটি গণভোট আয়োজন করতে চায়। স্বাধীনতার এ দাবি সমর্থনও পেতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে শেরভিন পিশেভার নামে একজন বিনিয়োগকারী এ আন্দোলনের সব ব্যয়ভার গ্রহণে রাজি হয়েছেন।


এক বিবৃতিতে ইয়েস ক্যালিফোর্নিয়া বলেছে, ‘বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি হলো ক্যালিফোর্নিয়া। অর্থনৈতিকভাবে ফ্রান্সের চেয়ে বেশি শক্তিশালী এটি। এর জনসংখ্যা পোল্যান্ডের চেয়েও বেশি। প্রতিটি পয়েন্টে অনেক স্বাধীন দেশের সঙ্গে তুলনীয় ক্যালিফোর্নিয়া, স্রেফ বাকি ৪৯টি রাজ্যের সঙ্গেই নয় কেবল।


'ইয়েস ক্যালিফোর্নিয়া' আন্দোলনের প্রেসিডেন্ট লুইস ম্যারনেলি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরই ক্যালিফোর্নিয়ার সার্বভৌম সত্তার দাবি করেন, ঠিক যেমনটা যুক্তরাজ্যে রয়েছে স্কটল্যান্ডের। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এ ব্যাপারে কীভাবে আপিল করা যাবে, তার স্পষ্ট কোনো পথ নেই। মার্কিন সংবিধানে একটি রাজ্য কিভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে, তার প্রক্রিয়া লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু কিভাবে বের হবে, তার কোনো পথ নেই।


কোনো রাজ্যই এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হতে পারেনি। এ বছরের শুরুর দিকে টেক্সাস অনেক চেষ্টা করেছে, তবে সফল হয়নি। অস্টিনে অবস্থিত টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এরিক ম্যাকডেনিয়েল বলেন, ‘পৃথক হওয়ার আইনি প্রক্রিয়া বেশ সমস্যাসংকুল।’ ব্রেক্সিটের প্রাক্কালে তিনি বলেন, ‘মূলত গৃহযুদ্ধই কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছে।'


কী ভয়ানক খবর! যে-দেশটি বিশ্বের একক পরাশক্তি, তার ঘরেই ভাঙ্গনের সুর! আর সেই ভাঙ্গন যে সহজে হবে না, তাও স্পষ্ট অধ্যাপকের কথায়। তার ঈঙ্গিত গৃহযুদ্ধের দিকে।



গৃহযুদ্ধের প্রকৃতি ও পরিণাম কী ভয়ঙ্কর, তা আমরা দেখেছি শ্রীলংকায়। দেখেছি আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক ও দক্ষিণ সুদানে। কোটি মানুষের জীবন নরকাগ্নিতে জ্বলতে থাকে। এ যে কী বিভীষিকা, ভুক্তভোগীই কেবল জানেন। কোনো সুস্থ মানুষ গৃহযুদ্ধে সমর্থনের কথা চিন্তাও করতে পারে না।


কিন্তু আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাকের অস্থিতিশীলতা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতা এক নয়। পছন্দ করি অথবা না-ই করি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু বর্তমান ভূমণ্ডলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এই দেশের ভাগ্য-ভবিষ্যতের সঙ্গে গোটা পৃথিবীর ভাগ্য-ভবিষ্যত অনেকটাই গ্রথিত। অর্থ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমরশক্তি - সব দিক থেকে আগুয়ান এই দেশটিতে পৃথিবীর নানা দেশের মানুষেরা আশ্রয় পেয়েছে ও পাচ্ছে আর বদলে ফেলছে নিজেদের জীর্ণ অতীত।


সত্যি বটে, মি ট্রাম্প ওই মানুষদের অর্থাৎ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলেই বাজিমাত করেছেন। বাস্তবে তিনি সত্যি-সত্যিই প্রায় এক কোটি অভিবাসীকে আমেরিকাছাড়া করতে পারবেন কি না, সেটা আসলেই দেখার বিষয়।


সেই দেখাটা দেখার জন্য সময় লাগবে। সময় দিতে হবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট গদিতে বসার আগেই 'মানি না, মানবো না' আওয়াজে রাজপথ গরম করার এবং বিচ্ছিন্নতার দাবি তোলার 'গণতন্ত্র' শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই নয়, গোটা পৃথিবীকেই একটা কঠিন ঝাঁকুনি দেবে - এটা নিশ্চিত।


ভয় পাচ্ছি, সেই আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সামরিক ভূমিকম্পের ভার আমরা পৃথিবীবাসী বইতে পারবো তো!


লেখক : সাংবাদিক


বিবার্তা/মৌসুমী


মার্কিন নির্বাচন ও অন্ধ নারী গণকের ভবিষ্যতবাণী

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com