বড়দিন : একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১:৪২
বড়দিন : একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
প্যানুয়েল প্রিন্স
প্রিন্ট অ-অ+

আধুনিক এই সময়ে বছরের যে দিনটি ঘিরে বিশ্বজুড়ে মানুষের প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনা কেন্দ্রীভূত থাকে, সে দিনটি হচ্ছে ২৫ ডিসেম্বর বা ক্রিসমাস ডে অর্থাৎ বড়দিন।


খ্রিস্ট ধর্মের প্রবর্তক যীশু খ্রিস্টের আলৌকিক জন্ম ও পৃথিবীতে তাঁর আগমনের অনন্য অর্থপূর্ণতার স্মরণে বিশ্বব্যাপী খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় ও সামজিক জাঁকজমকে বড়দিন উৎসব পালন করে থাকে। যেহেতু বড়দিন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব, সেহেতু তাদের কাছে এই দিনটির ধর্মীয় তাৎপর্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে আধুনিক মানবসভ্যতায় বছরের অন্য কোনো দিন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক ইত্যাদি ভাবেও এতটা তাৎপর্যপূর্ণ নয়। তাই বড়দিন উৎসব নিয়ে আগ্রহ এখন শুধু মাত্র খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।


২৫ ডিসেম্বর, বড়দিনের দিনেই যে যীশু খ্রিস্টের জন্ম হয়েছিল, এই বিষয়টি প্রমাণ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, পবিত্র বাইবেলে, মার্ক এবং লুক লিখিত ‘গসপেল’ বা মঙ্গল সমাচারে যেখানে যীশুর খ্রিষ্টের জন্মকাহিনী বর্ণিত আছে, সেখানেও তাঁর জন্মদিনটি ঠিক কবে, সেই সম্পর্কে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় না। তাহলে কীভাবে বিশ্বজুড়ে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন উৎসব পালনের দিন হিসেবে আবির্ভূত হলো, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।


বড়দিন উৎসব উদযাপনের শেকড় খুঁজতে আমাদের যেতে হবে যীশু খ্রিস্টের জন্মেরও বহু আগে, মানবসভ্যতার প্রথম দিককার সময়ে। সেই সুপ্রাচীন সময়ে, সমগ্র উত্তর গোলার্ধজুড়ে বিরূপ, বিবর্ণ শীতকালকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন মানুষেরা ‘তুষ্টি উৎসব’ পালন করত। বর্তমান পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে উত্তরের স্ক্যানডেনেভিয়ান অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে মহাভোজ, অগ্নিউৎসব, পশু বলি ইত্যাদির মাধ্যমে পালিত হতো সেই উৎসব। প্রাক-আধুনিক ইউরোপে ডিসেম্বরের শেষ দিকে এই উৎসব পালনের রেওয়াজ প্রচলন ছিল। আসন্ন শীতকালে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে না বলে প্রচুর গবাদি পশু বলি দেয়া হতো এবং সারা বছর ধরে গাঁজন দেয়ার পর সেই সময়ে এসে মদ ও বিয়ার পান করার উপযোগী


হতো। ফলে উৎসবের সময়টিতে মাংস, পানীয় ও খাবারের আধিক্য থাকত অসীম। সব শ্রেণীর মানুষই সেই উৎসবে অংশগ্রহণ করত স্বতঃস্ফূর্তভাবে। রোম সাম্রাজ্যের সময়ে এসে ইউরোপের সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল রোমানদের কৃষি দেবতা, শনি গ্রহের সম্মানে উৎসব। এই উৎসবটি শীতকালের মাঝামাঝিতে, তুষ্টি উৎসবের কাছাকাছি সময়ে, ২৫ ডিসেম্বরের দিকে শুরু হতো। এই উৎসবের সময় রোম সাম্রাজ্যের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকত।


সামাজিকভাবে ধনী-গরীবের ব্যবধান মুছে ফেলা হতো। দরিদ্র ও ভিক্ষুক শ্রেণীর মানুষ থেকে শুরু করে সৈনিক কিংবা শাসক – সবাই একসাথে উৎসব উদযাপন করত। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, সেই সময়কার খ্রিস্ট ধর্ম অনুসারীরা এই উৎসবকে প্রত্যাখ্যান করেছিল বিধর্মীয় উৎসব বলে। এবং যেহেতু যিশুর খ্রিস্টের জন্মের দিনটি সম্পর্কে তারা নিশ্চিত ছিল না সেহেতু যীশুর পুণরুত্থানের দিনটির কাছাকাছি সময়ে তারা বড়দিন পালন করত।


এরপর বিভিন্ন গোষ্ঠী ৬, ১০ জানুয়ারি; ১৯, ২০ এপ্রিল; ২০ মে; ১৮ নভেম্বর ইত্যাদি দিনগুলোকে বড়দিন উৎসব পালনের দিন হিসেবে প্রস্তাব করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসে এই দিনগুলো বিতর্কিত হয়ে ওঠে। যেহেতু ততদিনে সবাই বসন্তের মহাবিষুব, ২৫ মার্চকে মহান দিন হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। খ্রিস্ট ধর্ম অনুসারীরা বিশ্বাস করত, ২৫ মার্চেই পৃথিবী সৃষ্টি হয় এবং যিশুকে ক্রুশে দেয়া হয়। খ্রিস্টান পাদ্রীরা অবশ্য বাইবেলের পুরাতন নিয়ম অনুযায়ী বিশ্বাস করত যে প্রবক্তারা সকলেই পূর্ণ বছর বাঁচেন, অর্থাৎ তাঁদের জন্ম দিনেই তাঁদের দেহত্যাগ ঘটে। কারণ, ঈশ্বর অসম্পূর্ণতা বা ভগ্নাংশ পছন্দ করেন না। পাদ্রীদের এই বিশ্বাসকে বাস্তব রূপ দিতে, ২৫ মার্চ দিনটিকে ঠিক করা হয় সেই মহান দিন হিসেবে, যেদিন ঈশ্বরের মহাদূত গ্যাব্রিয়েল মাতা মেরী বা মরিয়মের কাছে ঈশ্বরের সেই বাণী বা ঘোষণা নিয়ে আসেন যে, ঈশ্বরের ইচ্ছায় ও অলৌকিক ক্ষমতায় মরিয়ম গর্ভবতী হবেন এবং ঈশ্বরের পুত্রকে গর্ভে ধারণ করবেন। মরিয়ম গর্ভবতী হওয়ার দিনটি থেকে ৯ মাস পরে যেই দিন সেটিই হচ্ছে ২৫ ডিসেম্বর, যীশুর খ্রিস্টের পৃথিবীতে আগমনের দিন।


যা হোক, ৩৩৬ সাল নাগাদ রোমান বর্ষপঞ্জীতে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন উৎসব পালন করার নির্দেশনা দেয়া শুরু হয়। ততদিনে খ্রিস্ট ধর্ম রোমের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে এবং রোমানদের পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করছে। বড়দিন উৎসব অবশ্য রোমানদের প্যাগান ধর্মের ভাবতত্ত্ব দ্বারাও অনেকটা প্রভাবিত।


যদিও অনেক জাঁকজমকপূর্ণ রীতি ও শিশু যীশুর মোহনীয় স্তবগানের মধ্য দিয়ে বড়দিন উৎসব পালিত হয়, সেই রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ববর্তী রাষ্ট্রধর্ম প্যাগান ধর্মের জনপ্রিয় অনেক আচার-রীতিও বড়দিন উৎসবের মধ্য দিয়ে খ্রিস্ট ধর্মে স্থান করে নিয়েছে।


মধ্যযুগে এসে বড়দিন উৎসব আরও প্রাণ পেতে শুরু করে। ইউরোপিয়ান খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারীরা নিশি জাগরণের মধ্য দিয়ে প্রার্থনা ও উৎসব আয়োজনের সহযোগে বড়দিন পালন করা শুরু করে। তারাই প্রথম বড়দিন উৎসবে ‘ক্রিসমাস ক্যারল’ বা আনন্দ গানের, যা বাংলাদেশে বড়দিনের কীর্তন নামে পরিচিত তার প্রচলন করে। এছাড়া বড়দিনে ‘গোশালা ঘরে যিশুর জন্মদৃশ্য’-এর যে ভাস্কর্য বা চিত্র ব্যবহার করার রীতি, সেটিও মধ্যযুগের ইউরোপীয় খ্রিস্ট ধর্ম অনুসারীদের দ্বারা প্রচলিত। উত্তর ইউরোপের অনুসারীরা বড়দিন উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ ক্রিসমাস ট্রি-র প্রবর্তক এবং তারাই এই রীতিটিকে লালন করে আধুনিক সময় পর্যন্ত নিয়ে আসে।


আধুনিক সময়ে এসে বড়দিন উৎসব বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতায় আরও বেশি আড়ম্বরপূর্ণ হয়ে ওঠে। আধুনিক পপ কালচার বড়দিন উৎসব উদযাপনের ধরনটাই বদলে দেয় এবং সমগ্র পৃথিবীর মানুষের কাছাকাছি নিয়ে। চার্লস ডিকেন্স তাঁর ‘অ্যা ক্রিসমাস ক্যারোলস (১৮৪৩)’ বইটিতে যারা বড়দিন উৎসব উদযাপন করে না তাদের হীন ও নীচমনা হিসেবে উপস্থাপন করেন। ক্লেমেন্ট মুরের, ১৮২২ সালে প্রকাশিত কবিতা ‘অ্যা নাইট বিফোর ক্রিসমাস’-এ সাধু নিকোলাসের পৌরাণিক গল্পটি আলোচনায় চলে আসে। কথিত আছে, সাধু নিকোলাস ডিসেম্বরের ৬ তারিখে, যে বাচ্চারা দুষ্টুমি করে না সেসব ভালো, শান্ত শিশুদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন। এই শ্রুতিকথার পরবর্তী আধুনিক সংস্করণ হচ্ছে, বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় সান্টা ক্লস বা সান্টা বুড়োর চরিত্র, যিনি সাধু নিকোলাসের মতই বড়দিনের রাত্রে বাচ্চাদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোকাকোলা কোম্পানির শিল্পী হেড্ডন সান্ডব্লম অবশ্য এই বিষয়ে একটি বিশেষ ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। কারণ, তিনি ১৯৩১ সালে সর্বপ্রথম সান্টা ক্লসকে একজন লাল বর্ণের একজন স্থূলকায় দাদুর চরিত্রে রূপান্তর করেন এবং মানুষের কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সান্টা ক্লসকে বাস্তব দুনিয়াতে নিয়ে আসেন।


বড়দিন উৎসবের লাগামহীন আনন্দকে উস্কে দিতে পরবর্তীকালে প্রচলিত হয় আরও কিছু রীতি। যেমন ক্রিসমাস ট্রি সাজানো, আলোকসজ্জা করা, শুভেচ্ছা কার্ড বিতরণ, উপহার ও চকোলেট আদানপ্রদান, ঘুরতে যাওয়া, বড়দিনের কেক তৈরি ও ভোজসভা ইত্যাদি। ছেলে-বুড়ো সকলের জন্য এসব আচারঅনুষ্ঠান বড়দিনের আনন্দকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। সাথে সাথে অর্থনীতির চাকাও কিছুটা গতিপ্রাপ্ত হয়। আধুনিক কালে এসে বাণিজ্যিকীকরণের প্রভাবে যদিও বড়দিন উৎসব অনেকটাই আনুষ্ঠানিক বাহুল্য ও আচারসর্বস্ব অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়, কিন্তু খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই দিনটির নিগূঢ় গুরুত্ব অনন্য। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ দেখলে দিনটি মানবজাতির পরিত্রাতা প্রভু যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন শুধু নয়, মহান ঈশ্বর এবং মানবসম্প্রদায়ের মধ্যে প্রোথিত ভালোবাসার সাক্ষীস্বরূপ।


লেখক : একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত (E-mail: [email protected])


বিবার্তা/প্রিন্স/উজ্জ্বল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com