বিএডিসির বীজ কার্যক্রমে যত জটিলতা
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০১৬, ১৭:১৬
বিএডিসির বীজ কার্যক্রমে যত জটিলতা
ড. মো. শাফায়েত হোসেন
প্রিন্ট অ-অ+

বীজ একটি প্রযুক্তিনির্ভর জীবন্ত কৃষি উপকরণ। কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামক।


সরকারি পর্যায়ে বিএডিসির পাশাপাশি বিভিন্ন বীজ কোম্পানি ও এনজিও বীজ উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণ করছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাপক প্রসারতা লাভ করেছে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে দেশে অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছে।


খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিএডিসি বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশেষ করে দানাজাতীয় খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বিএডিসির অবদানই মূখ্য।


নতুন নতুন প্রকল্পের আওতায় বিএডিসির কর্মপরিধি বৃদ্ধি পেলেও নতুন লোকবল নিয়োগ না দিয়ে বরং বর্তমান জনবল দিয়েই কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, বিএডিসির অনুমোদিত ৬,৮০০ জনবলের মধ্যে বীজ ও উদ্যান উইংয়ের নির্ধারিত জনবলের সংখ্যা ৩,১৮৪ বর্তমানে যার অর্ধেকের বেশি পদ শূণ্য রয়েছে। একদিকে জনবলের স্বল্পতা ও অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান লক্ষমাত্রা অর্জন প্রতিষ্ঠানটির জন্য রীতিমত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাকরি থেকে স্বাভাবিক অবসরগ্রহণ এবং দীর্ঘদিন থেকে নিয়োগ বন্ধ থাকাই জনবলের শূণ্যতা সৃষ্টির মূল কারণ।


সদর দপ্তর থেকে নিয়ে মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন পদে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে বাধ্য করায় বীজ উৎপাদনের মতো জটিল ও নাজুক কর্মকাণ্ড তদারকিতে তাদের প্রয়োজনীয় সময় দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্বাভাবিক কারণেই এর নেতিবাচক প্রভাব বীজের মানের উপর পড়তে বাধ্য।
অন্যদিকে বিগত কয়েক বছর থেকে যোগ হয়েছে অর্থসংকট। বিএডিসির বীজ ও উদ্যান উইংয়ের আওতাধীন বিভিন্ন কার্যক্রম ও প্রকল্পের মধ্যে ৭টি স্থায়ীধর্মী সাব-কার্যক্রম রয়েছে, যা সরকারি বরাদ্দ ও বীজ বিক্রয়লব্ধ নিজস্ব আয় দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু বিগত তিন বছর ধরে সরকার থেকে যে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। চলতি ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বিএডিসির বীজ ও উদ্যান উইংয়ের উক্ত সাব-কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন ফসলের ৮২৬৯১.৪৫ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। উক্ত কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য ৫৯৫৮৫.১৮ লাখ টাকা প্রয়োজন; তন্মধ্যে সম্ভাব্য নিজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩৭৫৪৫.১৮ লাখ টাকা এবং জিওবি বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২২০৪০.০০ লাখ টাকা।


উল্লেখ্য, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সীড প্রমোশন কমিটির মাধ্যমে বীজের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম বিএডিসি বাস্তবায়ন করে থাকে।


জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের মাধ্যমে উক্ত অর্থ বরাদ্দ প্রদানের জন্য সরকারের অর্থ বিভাগে অনুরোধ জানানো হলেও জিওবির চাহিতব্য ২২০৪০.০০ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ৭৮২৯.৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়, যা চাহিতব্য টাকার চেয়ে ১৪২১০.৫০ লাখ টাকা কম।


বরাদ্দ কেন এত কম - এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। বিএডিসির পক্ষ থেকে বাজেটঘাটতির যৌক্তিকতা এবং ঘাটতি বাজেট বরাদ্দের উদ্যোগ নেয়া হলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষে দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।


২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত তিন বছরের জিওবি চাহিদা, জিওবি প্রাপ্তি এবং জিওবি ঘাটতির চিত্রঃ


GOB-Table-1 ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ১২২৫১.১৮ লাখ টাকা পুঞ্জিভূত ঘাটতির কারণ মূলত কঃগ্রোঃ চাষীর নিকট হতে সংগৃহীত বীজ ও কৃষি উপকরণের অপরিশোধিত মূল্য এবং নিজস্ব আয় হতে অফিস পরিচালনা, মেরামত ও সংরক্ষণ, সম্পদ সংগ্রহ ও নির্মাণ ও পূর্ত কাজ সম্পাদন করা। এছাড়া বীজের আনুষাঙ্গিক খরচ খাতে অর্থাৎ বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বস্তা ক্রয় বাবদ কেজি প্রতি ১০-১২ টাকা ব্যয় হয়, যা বীজের বিক্রয়মূল্যের সাথে যোগ করা হয় না। অধিকন্তু প্রতি বছর শ্রমিকদের মজুরি এবং উৎসব বোনাসসহ অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বীজের আনুষাঙ্গিক ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও চাষীর ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করে সে হারে বীজের বিক্রয়মূল্য বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় না।


একদিকে নিজস্ব আয় কম অন্যদিকে সরকারি বরাদ্দ হ্রাসের ফলে ক্রমপুঞ্জিভূতভাবে (Cumulative) ঘাটতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বকেয়া ১২২৫১.১৮ লাখ টাকা চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ইতোমধ্যে পরিশোধ করায় চলতি অর্থবছরে আমন (আংশিক), গম ও বোরো বীজের মূল্য পরিশোধের জন্য অর্থের কোনো সংস্থান নেই।


উল্লেখ্য, বিগত অর্থবছরের মে-জুন ২০১৫ মাসে চুক্তিবদ্ধ (কঃগ্রোঃ) চাষীর নিকট হতে সংগৃহীত বোরো বীজের মূল্য সর্বশেষ নভেম্বর-২০১৫ মাসে বীজ বিক্রি করে পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। বিক্রিত বীজের অর্থ দিয়ে চুক্তিবদ্ধ চাষী পরবর্তী ফসল চাষের পরিকল্পনা করে। সময়মতো এ অর্থ পাওয়া না গেলে তাদের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে চুক্তিবদ্ধ চাষী বীজ সরবরাহে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বীজের মূল্য বিলম্বে প্রাপ্তির কারণে তাদের মধ্যে হতাশা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ফলে বীজ উৎপাদন কার্যক্রম থেকে তারা সরে যেতে বাধ্য হবেন, যা জাতীয় পর্যায়ে বীজ সরবরাহে সংকট তৈরি করবে এবং খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য জিওবি বরাদ্দকৃত ৭৮২৯.৫০ লাখ টাকা যথাসময়ে চাষীর বীজের মূল্য পরিশোধ করলে চলতি অর্থবছরে আরও ১৪২১০.৫০ লাখ টাকা জিওবি বরাদ্দ প্রয়োজন। নতুবা পূর্ববর্তী বছরের মতো এবারও বীজের মূল্য অপরিশোধিত থাকবে এবং চাষী বীজ সরবরাহে অনীহা প্রকাশ করবেন।ফলে বীজ সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হবে।


চলতি বছরে ইতোমধ্যে ১২২২১.০০ মেট্রিক টন আমন বীজ সংগৃহীত হয়েছে, যার ক্রয়মূল্য ৩৬৬৬.০০ লাখ টাকা। তন্মধ্যে ১৩৩৯.১৮ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং ২৩২৭.১২ লাখ টাকা অপরিশোধিত রয়েছে। চলতি বছরে বীজের ৭টি কার্যক্রমের মাধ্যমে ১৫৫৬৪.০০ মেট্রিক টন গম ও ৪৩০১০.০০ মেট্রিক টন বোরো বীজ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যার প্রাক্কলিত ক্রয়মূল্য ১৮৬২৪.০০ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে জুন-২০১৬ পর্যন্ত জিওবি ও নিজস্ব আয় (সম্ভাব্য) হবে ৪৯৫৮.০০ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বীজের মূল্য পরিশোধ বাবদ আরও ১৫৯৯৩.০০ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। উক্ত টাকা সরকারি অনুদান হিসাবে পাওয়া না গেলে এবং কৃষকের নিকট হতে সংগৃহীত বীজের মূল্য পরিশোধে আরো বিলম্ব হলে কৃষক শীঘ্রই বীজ উৎপাদন বন্ধ করে দেবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।


উল্লেখ্য, চলতি বছর ঘাটতিকৃত ১৫৯৯৩.০০ লাখ টাকার স্থলে বছরের শুরুতে ১৪২১০.৫০ লাখ টাকা ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে। উক্ত ১৪২১০.৫০ লাখ টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ দিলে জুন-২০১৬ পর্যন্ত বীজের মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব হবে।


আরো উল্লেখ্য, বোরো বীজের কিছু অংশ জুলাই মাসে সংগ্রহ হয়ে থাকে, যার মূল্য ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে পরিশোধ করা যাবে। মজুদকৃত ৮৯৩৫.৮৪ মেট্রিক টন বীজ বিক্রি করে আনুমানিক ১৩৪০.০০ লাখ টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে। এমতাবস্থায় বিএডিসির বীজ কার্যক্রমকে অব্যাহত রাখা অর্থাৎ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ যাতে আর্থিক কারণে বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের আশু দৃষ্টি প্রয়োজন। অন্যথায় জাতীয় অর্থনীতি তথা কৃষিখাতে বর্তমান সরকারের অভূতপূর্ব অর্জনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।লেখক : উপব্যবস্থাপক, বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ (বীপ্রস) বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com