চাই নতুন এক পৃথিবী
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৭:৩৬
চাই নতুন এক পৃথিবী
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

সময়ের ঠিকুজিতে ইংরেজি ২০১৬ সাল ‘গত’ হয়েছে আর ২০১৭ সাল ‘শুরু’ হয়েছে। এই সমাপ্তি ও সূচনায় ‘বর্তমান’ যেমন আছে তেমনি আছে ‘অতীত।’ অতীতের পথ ধরেই আমরা বর্তমানে উপনীত হই। বহমান স্রোতের ধারায় দিন যায় রাত আসে। পুরনো বছর গত হয়ে নতুন বছর এসেছে।


নতুন বছরে রাজনীতিও জমে উঠেছে। ‘পতিত’ এরশাদ দর কষাকষিতে ব্যস্ত। যে দল বেশি ছাড় দেবে, সেদিকেই তিনি দৌড় দেবেন। বামেরা চিরাচরিত কায়দায় হালুয়া রুটির দিকেই নজর রাখছে। কিন্তু জাতীয় নেতারা আখের গোছাতে এতো বেশি ব্যস্ত যে, জনগণ তাদের বিবেচনায় নেই। বাংলাদেশে কোনো নেতাই গরীব নন, তিনি যে দলেরই হোন। প্রতিক্রিয়াশীলদের প্লাস পয়েন্ট এখানেই। বহমান সময়ের কিশতি ভিড়ে দুর্ভাগ্যের বন্দরে। দেশপ্রেম খিড়কি দিয়ে পালায়।


তারপরও বলবো, সময়-সম্পদকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, একটি নতুন বর্ষের সূচনা শুধু আগমনই নয়, বিদায়ও বটে। তাই বলে নেয়া ভাল, জীবনের সময়-সম্পদ থেকে একটি পূর্ণ বছর ব্যয় হয়ে গেল। তাই নতুন বছরের আগমন বিদায়েরই বার্তাবাহক।


অর্থসম্পদ, জ্ঞানসম্পদ ও সময়সম্পদ এই সব আল্লাহর দান। তবে একটি প্রকাশ্য পার্থক্য এই যে, অর্থসম্পদ, জ্ঞানসম্পদ ও অন্য সকল সম্পদে বিয়োগ যেমন হয় তেমনি যোগও হয়। মানুষ যেমন অর্থ ব্যয় করে তেমনি উপার্জনও করে। তদ্রূপ প্রতিনিয়ত আমরা যেমন বিস্মৃত হই তেমনি নতুন নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধও হই।


পক্ষান্তরে সময়সম্পদে শুধু বিয়োগ, কোনো যোগ নেই। আমাদের জীবন থেকে দিন-রাত, সপ্তাহ, মাস ও বছর শুধু বিয়োগই হচ্ছে, যোগ হচ্ছে না। এভাবে প্রত্যেকের জীবনে সেই অমোঘ মুহূর্ত উপস্থিত হবে, যা আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন।


একটি নতুন বছরের আগমনের তাৎপর্য হলো জীবনের নির্ধারিত সময় থেকে একটি পূর্ণ বছর বিয়োগ হয়ে যাওয়া। প্রশ্ন এই যে, বিয়োগ কি শুধু ফূর্তি ও উৎসবের বার্তা বহন করে?


নতুন বছরের শুরুতেই তাই মিলিয়ে নিতে হচ্ছে জীবনের পাওয়া না পাওয়ার পরিসমাপ্তি। অবশ্য এটা এক দৃষ্টিতে গাণিতিক হিসাবে ৩৬৫ দিনের পরিসমাপ্তি। মনস্তাত্ত্বিকভাবে অতীতকে আমরা বহন করি ভবিষ্যতের ধারণায় বর্তমানকে বিনির্মাণ করবো বলে।


সময়ের ত্রিমাত্রিকতায় জীবনের প্রতিফলন তার সংযোগ নিশ্চয় প্রকৃতির সাথে। আর আমাদের বাঙালিত্ব বা বাঙালি জাতিসত্তা ধারণ করেছি প্রকৃতি থেকে। প্রকৃতির উদারতার ভেতর হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বাসীরা প্রজন্মান্তর বসবাস করছে। বিভাজন যতটুকু তার দায়- ধর্মান্ধতা আর নষ্ট রাজনীতির কূটচাল। ধর্ম বিশ্বাসের সাথে জাতিসত্তার কোনো বিরোধ নেই। সে বিরোধ অজ্ঞদের এবং স্বার্থান্বেষীদের যারা ক্ষমতার লোভে দেশের, সমাজের বিপর্যয় ঘটাতে একটুও দ্বিধা করে না। প্রকৃতি উদার, মায়া, মমতা ঘেরা তার পরিমণ্ডল। জ্ঞান, উদারতা, সহ-অবস্থান, মানবিকতা, মূল্যবোধ সবই আমরা প্রকৃতি থেকে পেয়েছি। জ্ঞান দিয়েই এসবকে অনুভব করতে হয়।


প্রকৃতি আমাদের মতো কৃপণ নয়, জ্ঞানকে উন্মুক্ত করে দেয়। তেমনি প্রকৃতি আমাদেরকে সাবধান ও করে দেয় বলে, ‘তোমরা আমার উপর অত্যাচার কর না, আমাকে হত্যা কর না, আমাকে সুস্থ রেখে আমার সর্বোচ্চ ব্যবহার কর’।


মুক্তিযুদ্ধের আগে জাতিসত্তার উন্মেষ পরিপূর্ণ হয়নি সত্য কিন্তু বিলুপ্ত ছিল না, রক্তের সাথে মিশে আছে। পাক-শাসক বাঙালি জাতিসত্তাকে অস্বীকার করে প্রকারান্তে তারা প্রকৃতিকেই অস্বীকার করেছিলো। অবিভক্ত ভারতবর্ষে শাসক ইংরেজরাই হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় বিভাজন এবং একে অন্যের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিলো। এটি কৌলিন সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক হাতিয়ারও বটে।


সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত থাকে, এখনও আছে। তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ চাতুর্যের ভেতর এসব বহন করে সাধারণ মানুষের কাছে। আমাদের শিক্ষিত সমাজ বা প্রগতিশীল সমাজ এই উষ্ণতা থেকে মুক্ত নয়।


২০১৭ সাল অর্থাৎ ৩৬৫ দিনের প্রত্যাশা নিয়ে যুক্ত হতে যাচ্ছে জীবনের ক্যালেন্ডার। অতীতে বাঙালির জীবনে অনেক দুঃখ-কষ্ট এসেছে, কাদা জলে মাখা শরীর দুঃখের তরী বেয়ে এগিয়েছে- হার মানেনি। এখন চলছে আধুনিক জগত। জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তির জগত। এখানে আমরা যুক্ত হয়েছি সত্য কিন্তু আমাদের পশ্চাৎপদতা পরিত্যাগ করতে পারিনি। চিন্তার ক্ষেত্রে, ভাবনার ক্ষেত্রে আমরা এখনো পশ্চাৎমুখী। পশ্চাতে এখনো একটি বড় অংশ রয়ে গেছে যারা অনবরত সমাজকে পেছনে টানছে। ফলে এক পা এগোতে দু’পা পিছিয়ে পড়ছি। ২০১৭ সাল কতটুকু আমরা নির্মাণ করতে পারব সবই নির্ভর করছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলার উপর।


প্রতিবারের মতো গত বছরেও আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশার দোলায় দুলেছে সবাই। সুখকর ঘটনায় পুলকিত হয়েছে হৃদয়। তেমনি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ভারাক্রান্তও হয়েছি সবাই। বিশেষত বছরের শেষ দিকে এসে দেশে প্রথম আত্মঘাতী নারী জঙ্গির ঘটনায় আমাদের উদ্বেগ বেড়েছে।


২০১৭ সালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কী রূপ নেবে, তা এ মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে সবার প্রত্যাশা, নতুন বছরটি দেশবাসী তথা বিশ্ববাসীর জন্য নিয়ে আসবে স্বস্তিদায়ক ও আনন্দের সব খবর। তেমন প্রতিশ্রুতি রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদেরও।


মনে রাখতে হবে, জীবন থেকে ক্যালেন্ডারের পাতা ঝরে পড়ে কেবল বয়স বাড়ায়, তারুণ্য দেয় না। তাই আল্লামা ইকবালের মতো বলতে চাই: ‘এ আকাশ এই নক্ষত্র পুরনো হয়ে গেছে। আমি এক নতুন পৃথিবী চাই।’


লেখক: সাংবাদিক, বিশ্লেষক


বিবার্তা/জিয়া/যুথি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com