দর্শকের ভালোবাসা ছাড়া ‘ববিতা’ হতে পারতাম না
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৬, ১৬:৩৪
দর্শকের ভালোবাসা ছাড়া ‘ববিতা’ হতে পারতাম না
অভি মঈনুদ্দীন
প্রিন্ট অ-অ+

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নায়িকা বলতে এদেশে সবার আগে ববিতাকেই বোঝায়। তাই দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার নাম উঠে গেছে তার জীবদ্দশাতেই। এখন চলচ্চিত্রে তেমনভাবে না থাকলেও চলচ্চিত্রের নানান দিকের আলোচনায় বারবার উঠে আসে তার নাম।


সেই ছোটকালেই ববিতা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পর্দায় পর্দায় মানুষের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাবেন। হয়েছিলোও ঠিক তাই। ববিতা পেরেছিলেন গ্রাম-বাংলার সিনেমা হলগুলোর পর্দায় পর্দায় উপস্থিত হয়ে এদেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শকের মন জয় করে নিতে। তাই সময়ের পরিক্রমায় ববিতা আজ জীবন্ত এক কিংবদন্তী।


ববিতা আজ আমাদের শিল্পীদের আদর্শ ও অনুপ্রেরণা, আমাদের চলচ্চিত্রের গর্ব, আমাদের দেশের গর্ব।


সেই ছোটবেলায় ববিতা ছিলেন পপি। পপি থেকে স্বল্পসময়ের জন্য হলেন সুবর্ণা। তারপর চিরকালের জন্য হলেন ববিতা।


পারিবারিক নামের আবহ থেকে বাংলাভাষী সকল সিনেমাপ্রেমী দর্শকের কাছে ববিতা হয়েই সমাদৃত হলেন। চলচ্চিত্রের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননাসহ পেয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্মাননাও।


১৯৬৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ববিতা চলচ্চিত্রে কাজ করছেন নিজের জনপ্রিয়তা অটুট রেখে। এখনো ববিতা তাই অনেকেরই ‘স্বপ্নের নায়িকা’। ‘স্বপ্নের নায়িকা’র সঙ্গে কথা বলে তাকে নিয়ে বিশেষ এই আয়োজনটি করেছেন অভি মঈনুদ্দীন।


বিবার্তা : অনেকদিন আপনাকে চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি...


ববিতা : আমি সর্বশেষ নারগিস আক্তারের ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ সিনেমাতে অভিনয় করেছি। এরপর কিন্তু আমি এমন ঘোষণা দেইনি যে সিনেমাতে আর অভিনয় করবো না। আসলে আমার কাছে ভালো কোনো ছবির প্রস্তাব আসেনি, তাই করাও হয়ে ওঠেনি। গত বছর একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কথা থাকলেও পরিচালক শেষ পর্যন্ত আমাকে যে গল্প শুনিয়েছিলেন তাতে পার্থক্য খুঁজে পেয়েছি আমি।


জীবনে চলচ্চিত্র থেকে অনেক কিছুই পেয়েছি আমি। তাই এখনো সর্বোচ্চ ভালো কাজটাই করতে চাই। যেমন আজিজুর রহমান ভাইয়ের ‘মাটি’ চলচ্চিত্রে আমার কাজ করার কথা চলতি বছরেই। যদি শেষ পর্যন্ত এটি নির্মিত হয় তাহলে আমি কাজটি করবো। কারণ আমার কাছে আমার চরিত্র এবং গল্প খুব ভালো লেগেছে। দেখা যাক কী হয়।


আমি একটি কথাই বলতে চাই, আমি চলচ্চিত্রের মানুষ। তাই গল্প এবং চরিত্র ভালো হলে কাজ না করার কিছু নেই।


বিবার্তা : আপনার ববিতা নামের নেপথ্য কাহিনীটা জানতে চাই..


ববিতা : আমার বাবা-মা নাম রেখেছিলেন ফরিদা আক্তার। ডাকনাম পপি তাদেরই দেয়া ছিলো। আমার প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্র ছিলো জহির রায়হান পরিচালিত ‘সংসার’। সেই ছবিতে আমি মাহমুদ সাজ্জাদের বিপরীতে অভিনয় করি। পরবর্তীতে আমাকে যখন ‘জ্বলতে সুরুজকে নিচে’ছবিতে নায়িকা হিসেবে কাস্ট করা হলো, তখন আমার নাম রাখা হলো ববিতা। নামটি রাখেন সেই সময়ের প্রখ্যাত আলোকচিত্রগ্রাহক আফজাল চৌধুরী। (কিছুদিন আগে আফজাল ভাই আর আমি একসঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে সম্মাননা পেলাম।) এরপর থেকেই ববিতা নামেই পরিচিত হতে থাকি আমি। এটা সত্যি যে, এখন পপি নামটি আর সেভাবে আমাকে টানে না। কারণ সবাইতো ববিতা নামেই আমাকে যেমন চেনেন।



বিবার্তা : বাবা-মায়ের দেয়া নামটি এখন অনেকটা মুছে গেলেও মাঝে মাঝে কী এর জন্য দুঃখ বোধ হয়?


ববিতা : কিছুটা তো হয় অবশ্যই, তবে তেমন একটা নয়। কারণ নতুন নাম নিয়েও কিন্তু আমার বাবা-মায়ের তেমন কোনো আপত্তি ছিলো না। তাই সবাই যখন নামটি মেনে নিয়েছিলেন, আমিও মেনে নিই আর নিজেকে ববিতা নামেই দাঁড় করাই।


আসলে নাম একজন মানুষের জীবনে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। মানুষের নামমাত্রই সুন্দর। তবে তার সেই নাম তার কাজের দ্বারাই সবচেয়ে বেশি সুন্দরে পরিণত হয়। কাজের গুণেই তো মূলত মানুষের আসল পরিচয়।


বিবার্তা : আপনার মা তো ছিলেন একজন ডাক্তার..


ববিতা : আমার মা যশোরের গ্রামে থেকেও কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে পড়াশুনা করেছেন। আমার মায়ের সাথে বাবার পূর্বপরিচয় থাকলেও পারিবারিকভাবেই দুজনের বিয়ে হয়েছে। আমার মায়ের অনেক গুণ ছিলো, খুব সংস্কৃতিমনা ছিলেন তিনি। আমার বোন জেলীর অকস্মাৎ মৃত্যুর কারণেই পরবর্তীতে মা পড়াশুনা করে ডাক্তার হয়েছিলেন। তাই যদি বলা হয়, তার ডাক্তার হবার অনুপ্রেরণা কে ? উত্তর ঐ একটাই, আমার বোন জেলী। মায়ের সেই আদর্শকে জীবনে অনুসরণ করতে চেয়েছিলাম আমি। হতে চেয়েছিলাম একজন ডাক্তার। কিন্তু সেই ইচ্ছের পথে আমি আর পা ফেলতে পারিনি।


বিবার্তা : বাবার কথা মনে পড়ে?


ববিতা : আমার বাবা ছিলেন একজন সহজ-সরল প্রাণোচ্ছ্বল মানুষ। খুব উদার মনের একজন মানুষ ছিলেন তিনি। বাবার কাছ থেকে যেমন আদর পেয়েছি ঠিক তেমনি শাসনও পেয়েছি।


আমি ছোটবেলায় খুব দুষ্ট ছিলাম। গ্রামের গাছে গাছেই সময় কাটতো আমার। বান্ধবীদের নিয়ে গাছের উপর বসে থাকতাম আর গল্প করতাম। বাসার পাশেই ছিলো একটা পুকুর। সেই পুকুরে সুযোগ পেলেই সাঁতার কাটতাম আমরা। তবে ভয়ে ভয়ে থাকতাম কখন বাবা এসে পড়েন। জামাকাপড় সবসময় লুকিয়ে রাখতাম। কারণ, ভেজা কাপড় দেখলেই বাবা সন্দেহ করবেন। একদিন বাবা দেখে ফেললেন আর চিকন বেত দিয়ে বেদম পিটুনি। বাবা এই কারণেই মারলেন যে যদি পুকুরে ডুবে আমি মরে যাই! মা আমাকে দেখে খুব কেঁদেছিলেন। পরে মা সেই বেতটি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন।


আরেকটা স্মৃতি খুব মনে পড়ে। বাবা ইংরেজি পত্রিকা পড়তেন। একদিন বাবার সেই পত্রিকা হাতে নিয়ে আমি খুব ভাব নিয়ে পড়ছিলাম। ভাবখানা এমন ছিলো যে, ইংরেজিতে আমি খুব পণ্ডিত। ইংরেজি শেখার আগ্রহ দেখে বাবা আমাকে তখন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলন। স্কুলটির নাম ছিলো যশোর ক্যান্টনম্যান্ট দাউদ পাবলিক স্কুল। সেই স্কুলের প্রিন্সিপাল লিলি ম্যাডামের কথা খুব মনে পড়ে। তিনিই আমাকে মূলত নাচ ও গানে আগ্রহী করে তোলেন।


বিবার্তা : ক্যারিয়ারের শুরুতেই আপনি একের পর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেতে শুরু করেছিলেন, কেমন ছিলো সেই সময়ের অনুভূতি?


ববিতা : আসলে সেই সময় পরপর তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করা একজন শিল্পীর জন্য ছিল অনেক গৌরব ও সম্মানের। সেই সম্মান ধরে রাখার জন্যই অনুপ্রাণিত হয়ে আমি পরবর্তী ছবিগুলোতেও কাজ করেছি আন্তরিকতা দিয়ে।


তবে সবসময়ই আমি মনে করি, একজন ববিতাকে ববিতায় পরিণত করেছেন এদেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শকেরা। তাদের ভালোবাসা ছাড়া ববিতা হয়তো আজকের ববিতাতে পরিণত হতে পারতেন না।



বিবার্তা : অশনি সংকেতই মূলত আপনাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিলো, জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো। শুনতে চাই অশনি সংকেতের গল্প..


ববিতা : সত্যি বলতে কী, সত্যজিৎ রায় প্রথমে আমার অভিনয়ই দেখেননি। তিনি ছবি তোলার জন্য ভারতীয় আলোকচিত্রী নিমাই ঘোষকে বাংলাদেশে পাঠালেন। নিমাই ঘোষ ঢাকায় এসে আমার প্রায় আড়াই শ’ ছবি তুললেন। কিছুদিন পর ভারতীয় হাইকমিশন থেকে অশনি সংকেত ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি পাই। তাতে লেখা ছিলো আমি যেন দ্রুত সত্যজিৎ রায়ের সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু চিঠিটি পড়ে আমি হাসতে হাসতে ছিঁড়ে ফেলে দিই। কারণ আমি মনে করেছি কেউ আমার সাথে দুষ্টুমী করছে। পরে আবার ভারতীয় হাইকমিশন থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হলো। সুচন্দা আপা আমাকে বিষয়টি নিয়ে উৎসাহ দিলেন। আমি বিশ্বাস করলাম। একদিন সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে গেলাম। সাথে ছিলেন সুচন্দা আপা। অনেক কথা হলো সেদিন তার সাথে। কথা শেষে আমাকে একটি স্ক্রিপ্ট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘স্ক্রিপ্টগুলো পড়। কাল ইন্দ্রপুর স্টুডিওতে আসবে। সেখানে তোমার অভিনয় টেস্ট হবে।’ রাত জেগে সংলাপ মুখস্থ করলাম। পরদিন সত্যজিৎ রায় আমাকে দেখে বললেন, ‘কাল তো মেকাপ ছিলো, আজ মেকাপ ছাড়াই তোমাকে অনেক ভালো লাগছে।’ তিনি আমাকে সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে একটি শাড়ি পরিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আমি অভিনয়ের চেষ্টা করছি। এটা সত্যজিৎ লক্ষ্য করলেন আর বললেন, ‘আরে কালকের মেয়েটার সাথে তো এই মেয়ের কোনোই মিল নেই।’এভাবেই আমি সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেতে’ অনঙ্গ বউ হিসেবে মনোনীত হলাম । অভিনয় করলাম কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘অশনি সংকেত’-এ। তারপর যা হলো সবটাই ইতিহাস। ইতিহাসের খাতায় হয়তো আমিও নাম লেখাতে পেরেছিলাম।


বিবার্তা : এদেশের চলচ্চিত্রে এখনো মেয়েদের কাজ করতে এলে পারিবারিকভাবে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?


ববিতা : এটা সত্য যে এখন সময় বদলেছে। সবকিছুর সাথে আমি নিজেও কিন্তু তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না। তারপরও যুগের চাহিদার সাথে কিছুটা হলেও তাল মেলাতে হয়। আমাদের চলচ্চিত্রের সোনালী দিন ছিলো, এটা সত্য। এখন নেই, সেটাও সত্য। এ কথাটা যদি কখনো মিথ্যে হয় তাহলে হয়তো একজন চলচ্চিত্রের মানুষ হিসেবে শুনতে আমার ভালো লাগতো। কারণ নিজের পরিবারের মানুষ খারাপ থাক - এটা কেউই কখনো চায় না। আমিও চাই না। তবে এটা সত্য যে, এখন চলচ্চিত্রে সত্যিকারের শিল্পীর বড়ই অভাব। আমাদের সময়েই তো নায়িকা হবার ক্ষেত্রে অনেক বড় বাধা ছিলো। আমার দাদা-দাদী ছিলেন ভীষণ রক্ষণশীল। সবার ধারণা ছিলো অভিনয়ে গেছি, তার মানে আমার আর ভালো থাকা হলো না। কিন্তু আমার মা সংস্কৃতিমনা ছিলেন বিধায়ই তিনি আমাদেরকে সংস্কৃতির অঙ্গনে পা রাখতে ব্যাপকভাবে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন।


চলচ্চিত্রে সত্যিই এখন শিল্পীর অভাব, আর এই অভাব দূর করতে হলে স্মার্ট শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। তারাই হয়তো চলচ্চিত্রের হাওয়া বদলে সহযাগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।



বিবার্তা : তাহলে একজন ভালো শিল্পী হবার জন্য স্মার্ট শিক্ষিত হওয়া উচিৎ বলেই আপনি মনে করছেন?


ববিতা : না, শুধু এই দুটো বিশেষ বৈশিষ্ট্যই যে থাকবে তা নয়। একজন শিল্পী হচ্ছেন সমাজের মানুষের আদর্শ। তাকে অনেকেই ফলো করেন। তাই স্মার্ট শিক্ষিত হবার পাশাপাশি তাকে যেমন যথেষ্ট বিনয়ী হতে হবে ঠিক তেমনি হতে হবে সিনিয়র শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এটা সত্য যে অন্যকে সম্মান দিলেই নিজে সম্মানিত হওয়া যায়। তবে অধ্যবসায়টাও একজন শিল্পীর জন্য অনেক জরুরী। শুধু অর্থের পেছনে ছুটলেই হবে না। অনেক সময় অর্থকে উপেক্ষা করে ভালো ভালো কাজও করতে হয়। যাতে দর্শক যুগ যুগ তাকে মনে রাখে।


বিবার্তা : শেষ প্রশ্নে জানতে চাই আপনার বাকী জীবনের পরিকল্পনার কথা..


ববিতা : নাহ, সেভাবে কোনো পরিকল্পনা নেই। যশ-খ্যাতি সবই তো পেলাম। বেঁচে আছি, বেশ ভালো আছি, মহান আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া। চলচ্চিত্রে অনেকদিন কাজ করছি, আজীবন করে যেতে চাই। কারণ আমি চলচ্চিত্রকে ভালোবাসি। ভালোবাসি চলচ্চিত্র পরিবারের সবাইকে, ভালোবাসি এদেশের মানুষকে। তবে এখন সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করে যেতে চাই। একটা কথা না বললেই নয়, এখন আর বিশেষ কোনো দিনে কোনো পার্টি করতে ইচ্ছে হয় না। মনটা ভীষণ টানে দুঃস্থ অসহায়দের জন্য।


জীবনের প্রত্যাশার বিপরীতে ববিতার প্রাপ্তি অনেক, তাই সেই প্রাপ্তির পর থেকে এই সময়ের ববিতা যেন এক অন্য ববিতা, যার চিন্তা-চেতনায় এখন শুধুই সমাজের মানুষকে নিয়ে চিন্তা, দেশকে নিয়ে নতুন এক ভাবনার দিগন্তে ছুটে চলা। যে ছুটে চলায় ববিতা নিজের প্রাণের মাঝে এক অন্যরকম ভালোলাগা খুঁজে পান। ভুবন ভোলানো হাসির চিরসবুজ নায়িকা ববিতার সেই সে শুরুর স্নিগ্ধ হাসি যেন আজও তার ঠোঁটের কোনে জেগে উঠে ক্ষণে ক্ষণে। এযেন আমাদের চিরদিনের চিরচেনা ববিতা।



ছোটবেলার সেই নৃত্যের শিল্পী থেকে ববিতা ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবির মধ্যদিয়ে হয়ে উঠলেন এদেশের একজন জনপ্রিয় নায়িকা, যাকে এখনো ভালোবাসে এদেশের মানুষ। শেষ পর্যন্ত ছবির পর মুক্তি পেলো ববিতা অভিনীত এহতেশাম পরিচালিত ‘পীচ ঢালা পথ’, বাবুল চৌধুরীর ‘টাকা আনা পাই’, মোস্তফা মেহমুদের ‘মানুষের মন’, সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’মিতার ‘আলোর মিছিল’সহ আরো বেশ কিছু ছবিতে। মিতার ‘আলোর মিছিল’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ১৯৭৫ সালে ববিতা প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। পরপর তিনি মোহসীনের ‘বাঁদী থেকে বেগম’ এবং আমজাদ হোসেনের ‘নয়ন মনি’ছবিতে অভিনয়ের জন্যও একই সম্মাননায় ভূষিত হন। টানা তিনবছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে তিনি হ্যাট্রিক করেন।


৪০ বছরেরও অধিক সময়ের চলচ্চিত্র জীবনে তিনি অভিনয় করেছেন নায়করাজ রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা, ফারুক, উজ্জ্বল, জাভেদ, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চনসহ আরো অনেক নায়কের বিপরীতে।


সহকর্মীদের কাছে ববিতা সবসময়ই একজন বন্ধু বৎসল মানুষ। নায়করাজ রাজ্জাক ববিতা সম্পর্কে বলেন, ‘মানুষ হিসেবে ববিতা খুব চমৎকার মনের একজন মানুষ। আমার সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ববিতা তার অভিনয়শৈলী দিয়ে এদেশের কোটি কোটি দর্শকের হৃদয়ে একটি অবস্থান তৈরী করে নিয়েছেন যা অনেকেই পারেননি। এদেশে একজন ববিতার সত্যিকার অর্থের মর্যাদা দেয়া হয়নি। তার জন্য সবসময়ই আমার শুভ কামনা, আল্লাহ যেন তাকে সবসময় ভালো রাখেন, সুস্থ রাখেন।’


গুণী অভিনেত্রী ববিতা পরবর্তী সময়ে ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’, ‘রামের সুমতি’ও ‘ম্যাডাম ফুলি’সহ আরো বেশ কটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। শুধু তাই নয়, সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ছবিতে অভিনয় করে আন্তর্জাতিকভাবেও সমাদৃত হন ববিতা।


নায়িকা হিসেবে ববিতা প্রায় দেড় শত ছবিতে অভিনয় করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘সুন্দরী’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বসুন্ধরা’, ‘সোহাগ’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘ওয়াদা’, ‘লাঠিয়াল’, ‘কথা দিলাম’, ‘নিশান’, ‘এতিম’, ‘লাইলী মজনু’, ‘দূরদেশ’, ‘মিস লংকা’, ‘ফুলশয্যা’, ‘বীরাঙ্গণা সখিনা’, ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘বেহুলা লখিন্দর’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই পর্যন্ত ববিতা সব মিলিয়ে প্রায় ২৮০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন।


সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’আলোর মুখ দেখলেও তবে ববিতা অভিনীত জহির রায়হান পরিচালিত ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ইংরেজি ভাষায় নির্মিত। ছবিটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। ছবিটিতে প্রথমে ওমর চিশতীর বিপরীতে অলিভিয়ার অভিনয় করার কথা থাকলেও পরবর্তীতে ববিতাই অভিনয় করেন। ছবিটি ১৯৬৯ সালে নির্মিত হয়।


দীর্ঘ এই চলচ্চিত্রজীবনে ববিতা কৃতজ্ঞ তার অভিনীত প্রতিটি ছবির শিল্পী ও কলাকুশলীদের কাছে। সেই সাথে কৃতজ্ঞ প্রযোজকদের কাছে। কারণ, তাদের অর্থ বিনিয়োগের কারণেই তৈরী হয়েছে ভালো ভালো ছবি।


এখনো ববিতা কাজ করে যাচ্ছেন বিরামহীনভাবে। তবে মাঝে মাঝে কিছুটা বিরতি নেন তার একমাত্র সন্তান অনিকের জন্য। অনিক কানাডায় পড়াশোনা করছেন। সেখানে তাকে দেখতে গেলেই সব কাজে বিরতি নিতে হয় তাকে।


দেশীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী এই নায়িকা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের জন্য শুভেচ্ছা দূত (গুডউইল অ্যাম্বসেডর) হিসেবে কাজ করেছেন। ববিতা বলেন, এটা আমার জীবনে বড় একটা পাওয়া । কারণ মানবসেবা একটা কঠিন ব্যাপার, সে তুলনায় শিল্পী হওয়া সহজ।


১৯৮৯ সালে হলিউডের জনপ্রিয় নায়িকা অড্রে হেপবার্ন গুডউইল অ্যাম্বসেডর হওয়ার পর বাংলাদেশে এসেছিলেন। তখন আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তার সঙ্গে দেখা করার। জানতে চেয়েছিলাম একজন জনপ্রিয় শিল্পী হয়ে মানবসেবা করতে কেমন লাগছে। উত্তরে তিনি বলেন, একজন শিল্পীর শেষ বলে কোনো কথা নেই। তারা ক্যামেরার আড়ালে থেকেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের জন্য কাজ করে যেতে পারে। তখন থেকেই আমি উৎসাহী হয়েছিলাম, যদি কখনো সে সুযোগ আসে তাহলে সে সুযোগটি যাতে কাজে লাগানো যায় তার চেষ্টা করবো। আমার আশা পূর্ণ হলো। আমার দেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে যদি একটু হাসি ফোটাতে পারি তখনই নিজেকে ধন্য মনে করবো।’


ববিতা আরো বলেন, ‘এখন বয়স হয়েছে। সমাজের জন্য, সমাজের মানুষের জন্য কিছু করে যেতে চাই। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য।’


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com