‘বাঙ্গালীয়ানাকেই ফুটিয়ে তুলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি’
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০:০৪
‘বাঙ্গালীয়ানাকেই ফুটিয়ে তুলতে  স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি’
ছবি : মোহসীন আহমেদ কাওছার
অভি মঈনুদ্দীন
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে ভীষণ শ্রদ্ধাতুল্য এক নায়িকার নাম শবনম। এদেশের অনেক সহশিল্পী বা সহকর্মী এখনো শ্রদ্ধার সঙ্গেই তার নাম উচ্চারণ করেন। পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে অভিনয় বেশি করলেও সেসব চলচ্চিত্রে তিনি তার অভিনয়ে বাঙ্গালিয়ানাই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন বারবার। আর এদেশে যে’কটি সিনেমাতে অভিনয় করেছেন, সবগুলোতেই একজন পুরোপুরি বাঙ্গালী নারীকেই দেখতে পেয়েছেন দর্শক। তাই শ্রদ্ধার আসনেই রেখেছেন সবাই তাকে। গ্রাম-বাংলার সিনেমা হলগুলোর পর্দায় পর্দায় উপস্থিত হয়ে এদেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শকের মন জয় করে নিতে পেরেছিলেন। তাই সময়ের পরিক্রমায় শবনব আজ জীবন্ত এক কিংবদন্তী। বহুবার ‘নিগার এ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত এই নায়িকার মুখোমুখি হয়েছিলো বিবার্তা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অভি মঈনুদ্দীন।


বিবার্তা : প্রায় আঠারো বছর চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক আপনাকে খুব মিস করছে, কেন এখন নতুন সিনেমাতে আপনাকে দেখা যায় না?


শবনম : পাকিস্তান থেকে নিজ দেশে একেবারেই চলে আসি ১৯৯৮ সালে। আমি কিন্তু বাংলাদেশেরই মেয়ে, এটা অনেকেই জানেন না। পাকিস্তানের সিনেমাতে বেশি কাজ করেছি বলে অনেকেই মনে করেন আমি পাকিস্তানের। আবার আমি কিন্তু বিগত প্রায় আঠারো বছর যাবত ঢাকাতেই থাকছি। সেটাও অনেকেই জানেন না। ঢাকায় একেবারে চলে আসার পর চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’ছবিতে ১৯৯৯ সালে অভিনয় করি। এরপর কিন্তু আজও ভালো মৌলিক গল্পের কোন সিনেমাতে কাজ করার প্রস্তাব পাইনি। ভালো গল্প পাইনি বলেই শিল্পী হিসেবে আমার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই কোনো সিনেমাতে অভিনয় করিনি। তার মানে এই নয়, আমি ভালো মৌলিক গল্প পেলে অভিনয় করবো না। আমাদের দেশে সিনিয়র কিংবা অভিজ্ঞ শিল্পীদের নিয়ে সিনেমা নির্মাণের দৃষ্টান্ত তৈরী হয়নি। হলেও সেটা খুবই কম।


বিবার্তা : অনেক বছর বিরতি নিয়ে যখন ‘আম্মাজান’সিনেমাতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে এদেশের চলচ্চিত্রে আবার কাজ শুরু করলেন, তখন সেই সময় আর এই সময়ের মধ্যে পার্থক্য বিশেষভাবে চোখে পড়তো কি?


শবনম : আসলে আমাদের সময়কার কথা তো বলে এখন আর কোনো লাভ নেই। বলতেও চাই না। কারণ, বললে অনেকেই বিশ্বাসও করতে চাইবেন না। তখন সবার মাঝে এক ধরনের আত্নিক একটা সম্পর্ক ছিলো, যা এখন ভাবাই যায় না। সবার প্রতি সবার এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ ছিলো, যা এই সময়ে একেবারেই অনুপস্থিত। শুটিং স্পটে দেরী করে আসাটাতো এখন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে একটা সত্য কথা না বললেই নয়, আমি যখন আম্মাজান সিনেমার শুটিং করি, প্রথম দিন সকাল আটটায় আমি স্পটে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন মান্না এসেছিলো দুপুর দুইটায়। পরে আমার আসার বিষয়টি যখন সে জানতে পারে, তখন খুব অনুশোচনা হয়েছিলো তার এবং এর পরেরদিন থেকে যে সময় বেধে দেয়া হতো, সেই সময়ের পরে আসতে তাকে আমি দেখিনি।



আসলে একজন শিল্পীই কিন্তু একটি ইউনিটের অনেক বড় অনুপ্রেরণা। শিল্পীই যদি সঠিক সময়ে স্পটে না আসে তাহলে কাজ করার অনুপ্রেরণাটা আসবে কোত্থেকে। আরেকটু বলতে চাই আম্মাজান সিনেমাতে মান্না এতোটাই ভালো অভিনয় করেছিলো যে, মনে হয়েছিলো এই চরিত্রটিতেই অভিনয়ের জন্য মান্নার জন্ম হয়েছিলো।


বিবার্তা : চলচ্চিত্রের সাথে আপনার সম্পৃক্ততার কথা একটু জানতে চাই।


শবনম : চলচ্চিত্রে আসার অনেক আগে থেকেই আমি নাচের সাথে জড়িত ছিলাম। বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচ শিখতাম। এহতেশাম পরিচালিত ‘এদেশ তোমার আমার’ ছবিতে তখন একটি গানে বেশ কয়েকজন নাচের মেয়ের দরকার হয়। তখন আমাদের বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকেই কয়েকজনকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই দলে আমিও ছিলাম। এরপর ‘রাজধানীর বুকে’ছবিতে একটি একক নৃত্যে অংশগ্রহণ করি। তারপরই এহতেশাম আমাকে ও রহমানকে নিয়ে শুরু করেন ‘হারানো দিন’ ছবিটি। এরপর একে একে অনেক ছবিতে কাজ করলাম।


বিবার্তা : তারপরতো অনেক উর্দু সিনেমাতে আপনি অভিনয় করেছিলেন, প্রথম দিকে কি উর্দু সিনেমায় কাজ করতে অসুবিধা হতো?


শবনম : অবশ্যই হয়েছিলো। কারণ উর্দুতো আমার ভাষা ছিলো না। এই ভাষাটিকে আয়ত্ত্ব করার একটা বিষয় ছিলো। এফডিসির একজন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট ছিলেন মোহসীন, তিনি এবং সুরুর বারা বাংকেভীর সহযোগিতায় আমি উর্দু ভাষা আয়ত্ত্ব করতে পেরেছিলাম। যে কারণে পরে আর তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি। অনায়াসে কাজ করেছি একের পর এক উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রে যখন আমার শুরু তখন তো রহমান ছাড়া আর কোন নায়কই ছিলো না। তাই চয়েজের কোনো অপশনও ছিলো না। তাই সে সময় যত সিনেমাতে কাজ করেছি, আমি আর রহমানই ছিলাম জুটি।


বিবার্তা : মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি কোথায় ছিলেন, কেমন কাটতো আপনার সময়?


শবনম : মুক্তিযুদ্ধের সময়তো আমি পাকিস্তানে ছিলাম। কারণ, তখন আমি পাকিস্তানের সিনেমাতে একের পর এক কাজ করছিলাম। তবে এতোটুকু বলতে পারি সিনেমাতে কাজ করলেও মানসিকভাবে ভালো ছিলাম না। কারণ পাকিস্তানে থাকলেও আমার পরিবার ছিলো ঢাকাতেই। তাই বাবা-মা-বোন এর জন্য একটা দুঃশ্চিন্তা সবসময়ই মনের ভেতর কাজ করতো। ভীষণ ভয়ে থাকতাম, না জানি কখন কোন দু:সংবাদ চলে আসে।



বিবার্তা : দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরইতো আর দেশে আসতে পারেননি?


শবনম : না না , কী করে আসি! কারণ, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক বাঙ্গালীই তখন কোনো কিছু না জানিয়ে দেশে চলে এসেছিলেন। ফলে অনেক প্রযোজকই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। যে কারণে আমি যখন ভিসার জন্য ‘নো অবজেকসন’ পাবার জন্য আবেদন করি, তখন আমাকে আসতে দেয়া হয়নি। কারণ, সবাই ভেবেছিলো আমিও হয়তো আর ফিরে যাবো না। তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই আমি দেশে আসতে পারিনি। দেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালে। আমি দেশে আসি ১৯৭৪ সালে।


বিবার্তা : আপনার স্বামী রবিন ঘোষ এই উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক, তারসাথে পরিচয় এবং বিয়ে সম্পর্কে জানতে চাই।


শবনম : এহেতশামের ‘হারানো দিন’ছবির কাজ করতে গিয়েই তার সাথে আমার পরিচয়। রিহার্সেলের সময় দেখা হতো আমাদের। তাছাড়া আমাদের উভয় পরিবারের মধ্যে পারিবারিক বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক ছিলো। যে কারণে আমাদের মাঝে সম্পর্কের একটা সুযোগও তৈরী হয়ে যায়। ভালোলাগা থেকেই উভয় পরিবারের সম্মতিতে ১৯৬৫ সালে আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই।


বিবার্তা : এখানে কিংবা ওখানে কী উর্দু ভাষাতেই অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন?


শবনম : নিজের ভাষায় কথা বলার মতো ভালোলাগা কী আর অন্য কোনো ভাষায় হতে পারে? পারে না। উর্দু ভাষাতে অভিনয় করেছি আসলে প্রফেশনালিজমের কারণে। বাংলা ভাষার সিনেমাতেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। এখানে একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি সবার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, আমি পাকিস্তানে যত সিনেমাতে অভিনয় করেছি, চেষ্টা করেছি সে সব সিনেমাতে আমার মাধ্যমে বাঙ্গালিয়ানাকে ফুটিয়ে তুলতে। এটা কিন্তু আমি মন থেকেই করতাম। আমি বাঙ্গালীয়ানাকেই ফুটিয়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম।


বিবার্তা : নাচের পুতুল ছবির বিখ্যাত গানটি দিয়েই শেষ করতে চাচ্ছি..


শবনম : নাচের পুতুল ছবির ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে’গানটি এখনো অনেক শ্রোতা দর্শকের কাছে অনেক পছন্দের। এই সিনেমাতে আমার বিপরীতে ছিলেন নায়ক রাজ্জাক। ছবিটির পরিচালক ছিলেন অশোক ঘোষ। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার পরিচালিত ‘সন্ধি’ছবির একটা চিঠি লিখে দাও তুমি সবারে জানাও, আসামী হয়েছে স্বামী চোখে দেখে যাও’গানটিও বেশ শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। এই গানে লিপসিং করেছিলাম আমি ও রাজ্জাক। ‘নাচের পুতুল’, ‘সন্ধি’ ছাড়া ‘সন্দেহ’, ‘কারণ’, ‘সহধর্মিনী’, ‘শর্ত’, ‘যোগাযোগ’, ‘জুলি’, ‘বশিরা’, ‘দিল’সহ আরো বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করি। মূলত পরবর্তী সময়ে ঢাকার যতগুলো সিনেমাতেই আমি অভিনয় করেছি, তার সবগুলোই ছিল ব্যবসা সফল।


বিবার্তা/অভি/মৌসুমী


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com