‘গণতন্ত্র ছাড়া সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়’
প্রকাশ : ২৪ মে ২০১৬, ১৩:২৯
‘গণতন্ত্র ছাড়া সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়’
জাহিদ হোসেন বিপ্লব
প্রিন্ট অ-অ+

বিএনপির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালাম বলেছেন, সরকার প্রকাশ্যে রাজপথে মিছিল করতে দিবে না, সমাবেশ করতে দিবে না, হরতালের কর্মসূচি দিলে তারা নিজেরা বোমাবাজি করে আমাদের উপড় দায় চাপাবে। আমরা কেন রাজপথে নাই আপনারাসহ দেশের সচেতন মানুষ প্রশ্ন করেবেন, এখন আমরা কি করবো আপনারাই বলুন? কর্মসূচি দিলে সন্ত্রাসী, কর্মসূচি না দিলে বলবেন আপসকামী! জনগণের পাশাপাশি মন্ত্রীরাও বলেন, বিএনপি ঘরে বসে গেছে, বিএনপি ঝিমিয়ে পড়েছে।
আব্দুস সালাম শনিবার তার শান্তিনগরের বাসভবনে বিবার্তার সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাতকালে তিনি বিএনপির বর্তমান রাজনীতি, আন্দোলনের সফলতা এবং ব্যর্থতা নিয়ে খোলামেলা আলাপ করেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিবার্তার নিজস্ব প্রতিবেদক জাহিদ হোসেন বিপ্লব।
বিবার্তা: দেশের বর্তমান চলমান রাজনীতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন?
আব্দুস সালাম: বর্তমান সরকার আসলে বিএনপিকে ঠেকাতে গিয়ে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরেছে। সে কারণে গণতন্ত্রশূন্যতায় দেশ আজ চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্র না থাকলে মানুষের মৌলিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়। জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। নষ্ট হয় সামাজিক ভারসাম্য। দেশের রাজনীতিতে চলছে একপেশে চর্চা। সভা-সমাবেশের অধিকার হরণ করা হচ্ছে।
বিবার্তা: দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন?
আব্দুস সালাম: যেহেতু দেশে গণতন্ত্র নেই সেহেতু সরকার বিরোধী দল বা বিরোধী মতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তারা কোনো সমালোচনা পজিটিভভাবে নিতে পারেন না। কিন্তু সমালোচনা ছাড়া কোনো বিষয় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কোনো দল বা ব্যক্তি সমালোচনার উর্ধ্বে নন।
যখনই যে কোনো দল বা ব্যক্তি নিজেকে সমালোচনার উর্ধ্বে মনে করেন তখনই সেই স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে স্বৈরাচারের জন্ম নেয়। সরকার আজ ক্ষমতায় থাকার জন্য সেই পথকেই বেছে নিয়েছেন। এটা কোনোভাবেই সরকার প্রধান বা তাদের দলের জন্য শুভকর নয়। অতীত ইতিহাস তাই বলে।
বিবার্তা: দুই মাসের অধিক সময় ধরে বিএনপির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এখনও আপনারা কমিটি দিতে পারছেন না কেন?
আব্দুস সালাম: কাউন্সিলে দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে কমিটি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শহীদ জিয়া শাহাদাৎ বরণ করার পর অগোছালো বিএনপিকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, চড়াই উৎড়াইয়ের মাধ্যমে আজকের এই দেশনেত্রীর নেতৃত্বেই এই দল আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়েছে এবং তিন তিনবার তিনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছেন। বিএনপি যেহেতু বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল, সেহেতু এত বড় একটি দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা সময় সাক্ষেপের বিষয়। সারাদেশের বেশির ভাগ নেতাকর্মী সম্পর্কেই তার পরিষ্কার ধারণা আছে। তাই বুঝে-শুনে যাকে যেখানে দরকার তাকে সে দায়িত্বই দিবেন।
বিবার্তা: নতুন কমিটিতে আপনি কি পদ প্রত্যাশা করেন?
আব্দুস সালাম: দেশনেত্রী আমাকে যেখানে কাজে লাগাবেন, যা দায়িত্ব দিবেন আমি সেখানে সে দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করবো।
বিবার্তা: দেশের রাজনীতির কেন্দ্র রাজধানী ঢাকা, ঢাকা মহানগর বিএনপির এই দুর্বল অবস্থা কেন?
আব্দুস সালাম: আপনার এই প্রশ্নের সাথে আমি একমত নই। আমরা, বিশেষ করে আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম ঢাকা মহানগরী সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ছিল। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পরে ঢাকা শহরের সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার প্রতিটিতে আমরা জয়লাভ করেছি। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ আমাদের অধিকাংশ কাউন্সিলর প্রার্থী জয়লাভ করেছিল। আমাদের প্রায় প্রতিটি থানা, ওয়ার্ড এবং ইউনিয়নে সাংগঠনিক কমিটি ছিল। পরবর্তীতে থানার সংখ্যা প্রশাসনিকভাবে বৃদ্ধি করা হলে সেখানেও বেশির ভাগ থানা পূর্ণাঙ্গ বা আহবায়ক কমিটি করে দিয়েছি। সে কারণে আমি মনে করি এই মহানগরীতে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে বিএনপি অনেক বেশী শক্তিশালী।
বিবার্তা: ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ও পরে সারাদেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন হলেও ঢাকাতে আন্দোলন জমাতে ব্যর্থ বিএনপি। এ ব্যর্থতার দায় আপনি কিভাবে এড়াবেন?
আব্দুস সালাম: এতেও আমি দ্বিমত পোষণ করি। বিএনপি ঢাকা মহানগরীর আন্দোলন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক কর্মীকে গুম হতে হয়েছে, যাদেরকে আমরা আজও খুঁজে পাইনি। আমাদের জনসভায় প্রকাশ্যে গুলি করা হয়েছে, যাতে আমি নিজেও আহত হয়েছি। আমাদের নগর ও বহু থানার নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে পঙ্গু করে দিয়েছে। ঢাকা মহানগর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের এমন কোনো নেতা বা কর্মী নাই যে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দেওয়া হয়নি এবং এখন পর্যন্ত নেতাকর্মীরা পরিবারের সাথে রাত কাটাতে পারেন না, নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না। প্রায় প্রতিদিনই কোর্টে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
আমি বলতে চাই বিএনপি কোনো সশস্ত্র দল নয় যে অস্ত্রকে অস্ত্র দিয়ে মোকাবিলা করবে। আমরা গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। কিন্তু সরকার যখন অস্ত্র নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ঠেকাতে চায় তখনতো অস্ত্রের বিপক্ষে রাজপথে অবস্থান করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও আমরা চেষ্টা করেছি আন্দোলনকে সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য, সেখানে হয়ত কোথায় না কোথাও ভুল ছিল।
তারপরও আমাদের এই আন্দোলনের ফসল হিসেবে রাজধানীতে সেই বিতর্কিত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ৫ ভাগ মানুষও ভোট কেন্দ্রে যায়নি। যা দেশের এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রকাশ পেয়েছে। আর এটাই আমাদের সফলতা।
বিবার্তা: বিএনপি এখন আন্দোলন বিমুখ, অনেকে এ দলকে গোলটেবিল ও প্রেস বিফ্রিংয়ের দল বলে। মাঠে না থাকার কারণ কি?
আব্দুস সালাম: এর আগে আমরা যখন শান্তিপূর্ণ মিছিল সমাবেশের মাধ্যমে প্রতিবাদ করতে চেয়েছি তারা (সরকার) এই শান্তিপূর্ণ সভা ও মিছিলে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। শুধু তাই নয় আমরা শান্তিপূর্ণ হরতাল-অবরোধ আহবান করলে তারা সে সমস্ত কর্মসূচিতে বোমাবাজি, পেট্রোলবোমা মারাসহ বিভিন্ন ধ্বংসাত্বক কার্যকলাপ ঘটিয়ে আমাদের উপড় দায় চাপানোর অপচেষ্টা করেছে এবং এটাকে ব্যবহার করে আমাদের নেত্রীসহ বিএনপির সকল শীর্ষনেতাদের (আমিসহ) বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে জনসম্মূখে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে।
আপনারা দেখেছেন, কিভাবে আমাদের দলীয় কার্যালয়ের তালা ভেঙ্গে, দরজা ভেঙ্গে মধ্যযুগীয় কায়দায় অফিসের ভিতরে থাকা দলের নেতাকর্মীদের টিনে হিঁচড়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। যা কোন সভ্য দেশে কাম্য হতে পারে না। প্রায় তিন মাস অবরূদ্ধ রাখা হল আমাদের নেত্রীকে। দীর্ঘদিন অবরূদ্ধ রাখা হল আমাদের দলীয় কার্যালয়। এখন আপনারাই বলুন আমরা কি করতে পারি। প্রকাশ্যে রাজপথে মিছিল করতে দিবে না, সমাবেশ করতে দিবে না, হরতালের কর্মসূচি দিলে তারা নিজেরা বোমাবাজি করে আমাদের উপড় দায় চাপাবে। আমরা কেন রাজপথে নাই আপনারাসহ দেশের সচেতন মানুষ প্রশ্ন করেবেন, এখন আমরা কি করবো আপনারাই বলুন? কর্মসূচি দিলে সন্ত্রাসী, কর্মসূচি না দিলে বলবে আপসকামী! জনগণের পাশাপাশি মন্ত্রীরাও বলেন, বিএনপি ঘরে বসে গেছে, বিএনপি ঝিমিয়ে পড়েছে।
আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। আমরা চাই সরকারি দলও সে গণতন্ত্রের উপড় আস্থায় আসীন হবেন। আমরা মুখে বলি ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড় আর দলের চেয়ে দেশ বড়’। সরকার সে নীতিতে বিশ্বাস করে না। আমাদের নেত্রী সে নীতিতে বিশ্বাস করেন বলেই শত অত্যাচার নিপীড়নের মুখেও গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখার স্বার্থে বারবার আলোচনার সাপেক্ষে সমস্যা সমাধানের উপড় গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
বিবার্তা: সংসদের প্রধান বিরোধীদল জাতীয় পার্টি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
আব্দুস সালাম: জাতীয় পার্টির রাজনীতির আদর্শও বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ। যেহেতু তারা এই ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী তাই আমি আহবান করবো সকল জাতীয়তাবাদ শক্তি এক মঞ্চে এসে এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশবাসীকে আলোর পথ দেখাতে ভূমিকা রাখবেন।
উল্লেখ্য, বিএনপির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালাম ৭১-এর রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে যার রাজনীতি শুরু। ৬৯ সালে ছাত্র অবস্থায় প্রথমবার গ্রেফতার হন সালাম। পরবর্তীতে জাসদের রাজনীতিতে সম্পৃক হন তিনি। রাজনীতির কারণে ৪ বার কারাবরণ করতে হয় তাকে। এ ছাড়া প্রায় ৬ বছর হুলিয়া নিয়ে রাজনীতি করতে হয়েছে। সালাম ঢাকার ডেপুটি মেয়র ছিলেন। বিএনপির আগে তিনি জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন মহানগর রাজনীতিতে সম্পৃক থাকায় ১৯৯৭ সালে সালাম বিএনপিতে যোগদান করার পর তাকে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হয়। একই সাথে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারশনের সভাপতি এবং জাতীয় সমবায় ইউনিয়নেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। তার সহধর্মিনী ফাতেমা সালাম একাধিকার নির্বাচিত কাউন্সিলর ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক ছেলে এবং এক মেয়ের জনক।
বিবার্তা/বিল্পব/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com