মিরসরাইয়ের উন্নয়ন ও গণমাধ্যম
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০১৬, ০৯:৪০
মিরসরাইয়ের উন্নয়ন ও গণমাধ্যম
নুরুল আলম
প্রিন্ট অ-অ+

উন্নয়নের কথা বলতে গেলেই গণমাধ্যমের প্রসঙ্গ আসবে। গণমাধ্যমের আগে উন্নয়ন বাস্তবায়নের ভাবনা গাছ লাগানোর আগে ফল চাওয়ার মতো। উন্নয়ন ও গণমাধ্যম এ দুটি শব্দের উপস্থিতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটি অন্যটি ছাড়া ভারসাম্যহীন। উন্নয়নে গণমাধ্যমের বহুমাত্রিক ভূমিকা এবং গণমাধ্যম ও উন্নয়ন পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুনিবিড়। এ জন্য রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদমাধ্যমকে বিবেচনা করা হয়। শক্তিশালী গণমাধ্যম রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনার চালিকাশক্তি।


সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা, অর্জন, চাহিদা, জনমত সৃষ্টি ও সমাজের ভালোমন্দ প্রতিফলিত হয়। গণমাধ্যমকে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের প্রতিনিধি বলা চলে। মানবজীবন ও সমাজ উন্নয়নের একমাত্র মাধ্যম হলো গণমাধ্যম। গণমাধ্যম দ্বারা সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেন সাংবাদিক। আর উপজেলা পর্যায়ে একজন সংবাদকর্মীর চোখ থাকে সমাজের ঘটে যাওয়া একেবারে পিন থেকে কামান, ছোট থেকে বড়, ভালোমন্দ, সমস্যা-সম্ভাবনা সবকিছুতে। একজন সাংবাদিক নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে রাতদিন জীবনের সোনালি সময় ব্যয় করে গণমানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনার খোঁজে কান পেতে থাকেন। দিনের শেষে তার পাঠানো সংবাদ যখন পরদিন পত্রিকার পাতায় পাঠক হাতে ধরলে বাস্তবের প্রতিফলন ঘটে। তখন হারানো সন্তান ফিরে পাওয়ার মতো আনন্দ লাগে সে সংবাদকর্মীর মনে। এটাই সংবাদকর্মীর সফলতা।


একজন নির্ভীক সংবাদকর্মী হলেন সমাজের নির্মাতা। সে গণমানুষের চাহিদা ও স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলার পর সরকার বাস্তবায়ন করে। একটি অবহেলিত জনপদের খবর লেখনির মাধ্যমে তুলে ধরতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ভূমিকার বিকল্প নেই। গণমাধ্যম সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করে। সুবিধাবঞ্চিত জনপদের নাগরিকদের আধুনিক উন্নতসমৃদ্ধ মানুষে পরিণত করে। একমাত্র গণমাধ্যম পারে মানুষকে নতুন নতুন চিন্তা, ধারণা ও পদ্ধতি সম্পর্কে প্রতিনিয়ত তথ্য সরবরাহ করে উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে।


আজকের যুগে গণমাধ্যম শিক্ষা, যোগাযেগ, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, লাইফস্টাইল, রেসিপি, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, আইসিটি, চাষাবাদ, কেনাবেচা থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের প্রয়োজনীয় সব চাহিদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করছে। নানা সীমাবদ্ধতা আর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও গণমাধ্যম সমাজের উন্নয়ন নিশ্চিত করছে। সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। যে দেশে গণমাধ্যম স্বাধীন-শক্তিশালী সে দেশে গণতন্ত্র উন্নত এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলাও দেশের বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চল নয়। এখানেও উন্নয়নে গণমাধ্যম সে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।


একটি জনপদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি মূল্যায়নের সার্বিক মাপকাঠি হলো উন্নয়ন। উন্নয়নের ধারা ত্বরান্বিত করতে জনগণ গণমাধ্যমের ভূমিকার পক্ষে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অর্জনের পেছনে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত একটি দেশ ৪৫ বছরে এখন বিশ্ব অর্থনীতির উন্নয়নের অংশীদার। দেশের উন্নয়নে জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত। কিন্তু দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক স্থানে অবস্থান করে দেশের সর্বাধিক মুক্তিযোদ্ধার রণাঙ্গন মিরসরাই উপজেলার উন্নয়ন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে সুধীজনের মতামত কি। আমাদের সমৃদ্ধ জনপদ চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার অর্থনীতির গেটওয়ে মিরসরাই উপজেলা আধুনিক জনপদের প্রতিচ্ছবি কতটুকু বহন করে। মিরসরাই উপজেলা স্বাধীনতা সংগ্রামের রণাঙ্গন থেকে এখনও গণমাধ্যম ও রাজনীতির জন্য অত্যন্ত উর্বর জনপদ। আমরা গণমাধ্যমকর্মীরাও চাই মিরসরাইয়ের উন্নয়নের অংশীদার, রূপকার, পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীদের মতামত নিয়ে তা গণমাধ্যমে তুলে ধরতে।


মিরসরাই উপজেলার গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রাণের সংগঠন মিরসরাই প্রেসক্লাব মিরসরাই উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আয়োজন করে ‘মিরসরাইয়ের উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক মতবিনিময় অনুষ্ঠান। গত ১৫ সেপ্টেম্বর উপজেলা চত্বর জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে এ মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, মানবাধিকারকর্মী, এনজিও প্রতিনিধি, শিক্ষক প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, পেশাজীবী ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে মিরসরাইয়ের উন্নয়নের চিত্র ও গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা।


বক্তারা তাদের সুচিন্তিত বক্তব্যে মিরসরাইবাসীর উন্নয়নের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান খোঁজেন। তারা পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোর উন্নয়নের সঙ্গেও তুলনা করেন মিরসরাইয়ের। মিরসরাই উপজেলার বর্তমান উন্নয়ন অবস্থা ও আগামীর উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তারা। আলোচনায় উঠে আসে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, সন্দ্বীপ টিলা ও মিরসরাই হাউসিং প্রকল্পকে ঘিরে শুরু হওয়া বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রসঙ্গে।


বক্তারা বলেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে মিরসরাইয়ের অর্থনীতির গতি। উঠে আসে বিদ্যুৎ ও গ্রামীণ সড়কের বেহালদশার কথা। এ জন্য মিরসরাই থেকে নির্বাচিত এমপি-মন্ত্রীদের ব্যর্থতাকে দায়ী করা হয়। তারা বলেন, রাষ্ট্রের অগ্রগতির সঙ্গে মিরসরাই কেন পিছিয়ে থাকবে। এ ব্যর্থতার দায় কার। ৪৫ বছরে জনপ্রতিনিধিরা মিরসরাইয়ের উন্নয়নে কে কি অবদান রেখেছেন সে বিশ্লেষণ এখন সময়োপযোগী। একটি জনপদের উন্নয়ন, জনগণের প্রত্যাশা-প্রাপ্তি ও চিন্তার প্রতিফলন ঘটে গণমাধ্যমের মাধ্যমে। গণমাধ্যম সে দায়িত্ব শতভাগ পালন করে যাচ্ছে। উন্নয়ন, সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। তার কতটুকু বাস্তবায়ন করেছে সরকার গণমাধ্যমের আয়নায় জনগণ তা দেখতে চায়।


আজ মিডিয়া বা গণমাধ্যমের কল্যাণে পুরো পৃথিবী একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা একে অন্যের জীবনযাত্রা, সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানতে পারছি। লেখাটি শেষ করব মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ১৭৮৭ সালে এডওয়ার্ড ক্যারিংটনকে লেখা গণমাধ্যম সম্পর্কিত বিখ্যাত একটি উক্তি দিয়ে। তিনি লিখেছেন, ‘আমাকে যদি সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়, গণমাধ্যমবিহীন সরকার ব্যবস্থা না কি সরকারবিহীন গণমাধ্যম। এক্ষেত্রে আমি দ্বিতীয়টি গ্রহণ করতে এক মুহূর্তও দেরি করব না।’


লেখক: সাধারণ সম্পাদক, মিরসরাই প্রেসক্লাব


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com