শেখ হাসিনাও নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দাবি রাখেন
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৬, ১৬:২০
শেখ হাসিনাও নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দাবি রাখেন
ফরিদুন্নাহার লাইলী
প্রিন্ট অ-অ+

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোসকে এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। কলম্বিয়ার গৃহযুদ্ধ অবসানে কমিউনিস্ট ফার্ক (রেভ্যুলুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া) বিদ্রোহীদের সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সম্পাদনের জন্যে তাকে এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে।


দীর্ঘ্ চার বছর আলোচনার পর সম্পাদিত ওই চুক্তির মাধ্যমে অর্ধশতাধিক বছর ধরে চলা এ গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে।ফার্ক বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তিচুক্তির ব্যাপারে দেশের ভিতর থেকেই শক্ত বিরোধিতা থাকলেও এ চুক্তির ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন প্রেসিডেন্ট সন্তোস।


কলম্বিয়ার শান্তিচুক্তির সঙ্গে আমি আমাদের একটি শান্তিচুক্তির সাদৃশ্য খুঁজে পাই। তাই ওই ঘটনার বিবরণে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করছি।


বাংলাদেশের তিনটি জেলা পার্বত্য চট্টগ্রাম হিসাবে পরিচিত। জেলাগুলো হলো- খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান। একসময় ছিলো এই এলাকাগুলিতে মানবাধিকার বলে কিছুই ছিলো না। ওই এলাকার নাগরিকদের সকল মৌলিক অধিকার ছিলো উপেক্ষিত। স্বাভাবিকভাবেই এই এলাকাগুলোতে বিস্তার ঘটতে থাকে সামাজিক বিশৃংখলা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সামরিক জান্তাদের অদূরদর্শি সিদ্ধান্তের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিষিদ্ধ এলাকায় পরিণত হয়েছিলো। দুই দশক স্বাভাবিক জীবনযাত্রার চাকা বন্ধ ছিলো। তাই এই পার্বত্য এলাকায় শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্যে সর্বদা মনোযোগী ছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।


১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রথম সরকার গঠন করে এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা পার্বত্য এ অঞ্চলগুলিতে শান্তি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। দেশরত্ন শেখ হাসিনার এই উদ্যোগে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই সময় পার্বত্য এই এলাকাগুলিতে প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস ছিলো।প্রতি মুহূর্তে অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুকিতে থাকা এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ঞ্জীবন-জীবীকা নিরাপদ হয়েছে শুধু একটি শান্তিচুক্তির মধ্যদিয়ে।


এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পার্বত্য এলাকা তার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পায়। সমসাময়িক সময়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সফল রাজনৈতিক পরিসমাপ্তি আমাদের দেশের এ্ক বিরল অর্জন হিসাবে গণ্য হয়। একারণে শেখ হাসিনার ইউনেস্কো পুরস্কার প্রাপ্তি ছিলো শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি।



চুক্তির পর পার্বত্য অঞ্চলজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিকাশ যথেষ্ট বেগবান হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বজথেস্ট, এই চুক্তির ফলে পার্বত্য অঞ্চলে মানুষগুলো বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন খুঁজে পায়।



শান্তি ও মানবাধিকার সুরক্ষায় শেখ হাসিনার আরো একটি বড় অর্জন না উল্লেখ করলেই নয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের গত মেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় চুক্তি ছিলো মানবাধিকার সুরক্ষার আরো একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ৬৮ বছর দেশের পরিচয়বিহীন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ দেশের নাগরিক পরিচয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছে শুধু শেখ হাসিনার দূরদর্শী কূটনৈতিক সফলতার মাধ্যমে। এই চুক্তি সম্পাদনের পূর্ব পর্যন্ত বিশ্বমানব গণনায় এই অঞ্চলে্র মানুষগুলির নাম অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। তারা জানতোই না, আসলে তারা কোন দেশের নাগরিক। যেন আপন বসতভূমিতে পরবাসী তারা। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় চুক্তির ফলে এই মানুষগুলো ফিরে পেয়েছে আপন দেশ, বিশাল আকাশ, বিস্তীর্ণ প্রান্তর, আপন পরিচয়, বাঁচার মৌলিক অধিকার।


এছাড়াও অতীতে দেখা গেছে দারিদ্র দূরীকরণের জন্যে শান্তিতে নোবেল দেয়া হয়েছে। অথচ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই দেশ দারিদ্র্য থেকে কিভাবে বেরিয়ে এসেছে তার রেফারেন্স টানলে পরিষ্কার হওয়া যায়। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১২ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক অগ্রগতি এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বাংলাদেশের এই অর্জন দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, পাকিস্তান কিংবা ভুটানের চেয়েও প্রশংসনীয়।


বিশ্বব্যাংকের আরো একটি প্রতিবেদন আমাদের আশা জাগায়। গত বছরের পহেলা জুলাই বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ১,৩১৪ ডলার। এই হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে।


তাই বলছি, আজ যদি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস তাঁর দেশের একটি সংঘাত দূর করার জন্যে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান, তাহলে আমাদের রাষ্ট্রনায়ক, শান্তিকন্যা শেখ হাসিনাও নোবেল পুরস্কারপাওয়ার দাবি রাখেন। কারণ তিনি তৎকালীন নানান দলও মতকে উপেক্ষা করে পার্বত্য শান্তিচুক্তি করে দশ লক্ষাধিক মানুষকে নিরাপদে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছেন। ক্ষুধা ও দারিদ্র দূরীকরনের মাধ্যমে ১৬ কোটি মানুষের ছোট এই দেশকে শান্তিতে রেখেছেন। যদিও কে না জানে, নোবেল কমিটির একান্ত আস্থাভাজন না হলে, তাদের গলায় সুর মিলিয়ে না চললে যোগ্যতা যতই থাকুক পুরস্কার জোটে না। তারপরও বাংলার মানুষ প্রত্যাশা করে, শান্তিকন্যা শেখ হাসিনা শান্তিতে নোবেল পাবেন, পাওয়ার দাবি রাখেন।


লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com