গাইবান্ধার তরুণের গড়া ব্যতিক্রমী ‘মিনি মিউজিয়াম’
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ২১:১৯
গাইবান্ধার তরুণের গড়া ব্যতিক্রমী ‘মিনি মিউজিয়াম’
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

গাইবান্ধা শহরের পশ্চিমপাড়া এলাকার একটি সাধারণ বাড়ি। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য জগৎ। নিজের শখ, আগ্রহ ও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে বাড়ির একটি অংশকে ছোট্ট জাদুঘরে রূপ দিয়েছেন তরুণ সংগ্রাহক ওয়াজেদ হোসেন জীম।


জীমের সংগ্রহশালায় প্রবেশ করলেই দর্শনার্থীরা যেন ফিরে যান অতীতের কোনো সময়ে। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন মুদ্রা, বিশ্বের নানা দেশের পুরোনো কয়েন, হ্যারিকেন, কুপি বাতি, গ্রামোফোন, অ্যানালগ ক্যামেরা, ক্যাসেট প্লেয়ার ও ল্যান্ডফোনসহ নানা দুর্লভ সামগ্রী। পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনে ব্যবহৃত কাঠ, মাটি ও লোহার তৈরি ঐতিহ্যবাহী তৈজসপত্রও রয়েছে সংগ্রহে। এছাড়া বিভিন্ন গুণীজনের ব্যবহৃত চশমা, কলম ও ঘড়ির মতো স্মৃতিচিহ্নও স্থান পেয়েছে এই ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালায়।


সংগ্রাহক ওয়াজেদ হোসেন জীম জানান, ছোটবেলা থেকেই পুরোনো ও ঐতিহাসিক জিনিসের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে। নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে এবং বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে তিনি এসব সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, ইতিহাসকে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে দেখার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে নতুন প্রজন্ম অতীত সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারে।


তিনি বলেন, “যেখানে কোনো পুরোনো বা ঐতিহাসিক জিনিসের খবর পেয়েছি, সেখানেই যাওয়ার চেষ্টা করেছি। অনেক কষ্ট করে একেকটি জিনিস সংগ্রহ করেছি। আমার স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এসব নিদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানুক।”


শুরুর দিকে পরিবারের সদস্যরা তাঁর এই উদ্যোগকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি বরং অনেকেই এটিকে অপ্রয়োজনীয় খরচ বলে মনে করতেন। তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা সংগ্রহশালাটি দেখতে আসায় পরিবারের সদস্যরাও উৎসাহিত হচ্ছেন।


জীমের বাবা এ টি এম ওবাইদুর রহমান বলেন, প্রথম দিকে ছেলের এই শখকে খুব একটা সমর্থন করা হয়নি। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সী মানুষ সংগ্রহশালাটি দেখতে আসছেন। এতে পরিবারের সদস্যরাও গর্ব অনুভব করছেন এবং তাঁকে সহযোগিতা করছেন।


একই অনুভূতির কথা জানিয়ে জীমের স্ত্রী মাকসুদা ইশরাত মিম বলেন, ঘরের অনেক জায়গাজুড়ে এখন এসব সংগ্রহ রাখা হয়েছে। শুরুতে কিছুটা অসুবিধা হলেও মানুষের আগ্রহ ও প্রশংসা দেখে এখন তাঁদেরও ভালো লাগে। পরিবারের সবাই জীমের এই কাজ নিয়ে গর্ববোধ করেন।


বর্তমানে প্রতিদিনই ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এই মিনি মিউজিয়াম দেখতে আসছেন। অতীতের নানা নিদর্শন কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাওয়ায় তরুণদের আগ্রহও বাড়ছে।


সম্প্রতি সংগ্রহশালাটি পরিদর্শন করেন গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী ও উন্নয়ন গবেষক এম. আবদুস সালামসহ এলাকার বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তারা জীমের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং সংগ্রহে থাকা সামগ্রী ঘুরে ঘুরে দেখেন।


এম. আবদুস সালাম বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে এত সমৃদ্ধ সংগ্রহ গড়ে তোলা সত্যিই প্রশংসনীয়। বাড়ির বিভিন্ন কক্ষজুড়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বহু মূল্যবান নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়।


নিজের সংগ্রহশালাকে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে জীম বলেন, সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে চান। তাঁর আশা, এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে মানুষ আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ পাবে।


বিবার্তা/রাকিবুল/এসএম

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com