
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্কিনকেয়ার বিষয়ক কনটেন্টের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিশোরী ও শিশুদের মধ্যে নতুন এক প্রবণতা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা এ প্রবণতার নাম দিয়েছেন ‘কসমেটিকোরেক্সিয়া’। এর ফলে অল্প বয়সি মেয়েরা নিখুঁত ত্বকের আশায় অতিরিক্ত স্কিনকেয়ার পণ্যের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা তাদের ত্বক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কসমেটিকোরেক্সিয়া এমন একটি অবস্থা, যেখানে শিশু, বিশেষ করে মেয়েরা, খুব অল্প বয়স থেকেই স্কিনকেয়ার পণ্যের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ বা আসক্তি তৈরি করে। নিখুঁত ও দাগহীন ত্বক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই এ প্রবণতার জন্ম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার ভিডিওতে দেখা যায়, কিশোরীরা বিভিন্ন ধরনের ক্রিম, সিরাম, টোনার ও মেকআপ পণ্য ব্যবহার করে দীর্ঘ স্কিনকেয়ার রুটিন অনুসরণ করছে। অনেকেই প্রতিদিন একাধিক পণ্য ব্যবহার করছে, এমনকি বিভিন্ন সৌন্দর্যবর্ধক ব্র্যান্ডের প্রচারণাতেও অংশ নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা মূলত ব্রণ বা ত্বক পরিষ্কারের পণ্যের বিজ্ঞাপনের সংস্পর্শে আসত। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে অ্যান্টি এজিং ট্রিটমেন্ট ও ‘ফ্ললেস স্কিন’-এর ধারণা খুব অল্প বয়সীদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।
তাদের মতে, এ পরিবর্তন শিশুদের সৌন্দর্যবোধ ও আত্মমূল্যায়নের ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে বয়সের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় প্রাপ্তবয়স্কদের স্কিনকেয়ার রুটিন অনুসরণে উৎসাহিত হচ্ছে তারা।
শিশুদের মধ্যে এ প্রবণতা কতটা বিস্তৃত, তা নিয়ে বিভিন্ন দাবি থাকলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, প্রচলিত অনেক পরিসংখ্যান সীমিত জরিপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড ‘পাই’-এর পরিচালিত ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী ১ হাজার ৫০০ শিশুর ওপর এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক শিশু সপ্তাহে একাধিক স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার করে। অনেকেই নিজেদের ত্বকের তথাকথিত ‘ত্রুটি’ দূর করার জন্য এসব পণ্য ব্যবহার করে বলে জানিয়েছে।
ইতালির চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিওভান্নি দামিয়ানি বলেন, কসমেটিকোরেক্সিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌন্দর্যবিষয়ক কনটেন্ট অতিরিক্ত দেখা। আক্রান্ত শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্কিনকেয়ার ভিডিও দেখে এবং প্রতিদিন একাধিক পণ্য ব্যবহার করে। কেউ কেউ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, মেকআপ বা স্কিনকেয়ার পণ্য ছাড়া বাইরে যেতে বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বস্তি বোধ করে।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শিশুদের ত্বক স্বাভাবিকভাবেই কোমল ও সংবেদনশীল। তাই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি অনেক স্কিনকেয়ার পণ্য তাদের জন্য প্রয়োজনীয় নয়, বরং ক্ষতিকর হতে পারে।
ব্রিটিশ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জেন আইরের মতে, অনেক প্রসাধনী পণ্যে এমন সক্রিয় উপাদান থাকে, যা ত্বকের কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে রেটিনল অন্যতম, যা বলিরেখা কমানোর জন্য ব্যবহৃত হলেও শিশুদের ত্বকের জন্য উপযোগী নয়। অতিরিক্ত ব্যবহারে ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং চুলকানি, জ্বালাপোড়া, সংবেদনশীলতা ও একজিমার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, শিশুদের মধ্যে ক্রিম ও সিরামের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ‘কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস’ বা ত্বকের অ্যালার্জিজনিত সমস্যার ঘটনাও বাড়ছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বিষয়টি শুধু শারীরিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিখুঁত ত্বক পাওয়ার চাপ শিশুদের আত্মবিশ্বাস, শরীর সম্পর্কে ধারণা এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের সতর্কবার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ডের সঙ্গে নিয়মিত পরিচিতি অল্প বয়স থেকেই উদ্বেগ, হতাশা এবং নিজের চেহারা নিয়ে অসন্তুষ্টি তৈরি করতে পারে।
বিবার্তা/এসএম
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]