
হাসপাতালের করিডোরে তখনো মায়ের মৃত্যুর স্তব্ধতা কাটেনি। এক সন্তান তার প্রিয় মাকে চিরতরে হারিয়েছেন। কিন্তু সেই তীব্র শোক প্রকাশের সময়ই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশের চেনা মানবিকতা। মায়ের মৃতদেহটি বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য এক সন্তানকে গুণতে হলো চড়া মূল্য-সবার সামনে কান ধরে ওঠবস করার অপমান ! রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই অভাবনীয় ঘটনাটি এখন পুরো দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
ঘটনাটির শুরু রংপুর নগরীর নিউ জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নূরজাহান বেগমকে কেন্দ্র করে । অসুস্থ মাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর জরুরি চিকিৎসা বা অক্সিজেন দেওয়ার চেয়ে ভর্তির কাগজের ফর্মালিটি বড় হয়ে দাঁড়ায় বলে অভিযোগ পরিবারের । চোখের সামনে মায়ের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি ছেলে রিফাত হোসেন। চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ তুলে তিনি কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হন ।
চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনাটি নিশ্চিতভাবেই অনভিপ্রেত এবং বেআইনি। কিন্তু এর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা যে পথ বেছে নিলেন, তা আরও বড় প্রশ্ন চিহ্নের জন্ম দিয়েছে। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা প্রায় ১১ ঘণ্টা মায়ের মৃতদেহ আটকে রেখে ধর্মঘট শুরু করেন । দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত অসহায় রোগী যখন চিকিৎসার অভাবে ছটফট করছিলেন, তখন চিকিৎসকদের একমাত্র শর্ত ছিল-অভিযুক্ত ছেলেকে এসে ক্ষমা চাইতে হবে ।
অবশেষে হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষে বসে এক অদ্ভুত ‘সমঝোতা বৈঠক’ । যেখানে একদিকে ছিল মায়ের নিথর দেহ, আর অন্যদিকে চিকিৎসকদের জিদ। মায়ের লাশ বুঝে পাওয়ার আকুতিতে সবার সামনে কান ধরে ওঠবস করতে বাধ্য হন ছেলে রিফাত হোসেন । এই শাস্তির পরই কেবল চিকিৎসকদের মন গলে এবং তারা লাশটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চিকিৎসকদের নির্দোষ দাবি করলেও, লাশ আটকে রেখে একজন শোকগ্রস্ত মানুষকে এভাবে অপমান করার ঘটনাটিকে খোদ হাসপাতালের পরিচালকও নিন্দনীয় বলে স্বীকার করেছেন ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের ঝড় উঠেছে । সাধারণ মানুষ ও মানবাধিকার কর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন চিকিৎসকদের গায়ে হাত তোলা যদি অপরাধ হয়, তবে দেশের প্রচলিত আইন ও আদালত থাকতে হাসপাতাল কক্ষের ভেতরে লাশ আটকে রেখে এক সন্তানকে এভাবে অপমান করা কোন ধরনের পেশাদারিত্ব বা মানবিকতা?
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]