
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে টাঙ্গাইলে কোরবানির পশুর অতিরিক্ত জোগান তৈরি হয়েছে। জেলার চাহিদা পূরণ করেও এবার প্রায় ৪০ হাজার গবাদি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। তবে এই সম্ভাবনাময় খাতকে ঘিরে খামারিদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। ভারতীয় গরুর অবৈধ অনুপ্রবেশ, পশুর হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়, হাইওয়ে ও হাটে চাঁদাবাজি, জাল টাকার দৌরাত্ম্য এবং অজ্ঞান পার্টির আতঙ্কে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন হাজারও খামারি ও সাধারণ ক্রেতা।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় গড়ে ওঠা ২৬ হাজার ৭৫৯টি ছোট-বড় খামারে এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে মোট ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৯৩টি পশু। এর মধ্যে রয়েছে ষাঁড়, বলদ, গাভী, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া। জেলার মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৭৮টি পশু। সে হিসাবে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পরও উদ্বৃত্ত থাকবে ৩৯ হাজার ৯৮৩টি পশু।
জেলায় পাঁচ শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে জমে উঠেছে ঈদবাজার। বিশেষ করে ভূঞাপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোবিন্দাসী গরুর হাট, টাঙ্গাইল শহরের বেবী স্ট্যান্ড পশুর হাট, করটিয়া, রসুলপুর ও তোরাপগঞ্জ হাটে প্রতিদিনই বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়।
এবার পশু কেনাবেচায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে অনলাইন হাট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং খামারিদের নিজস্ব উদ্যোগে ফেসবুক পেজ ও অনলাইন মাধ্যমে পশুর ছবি, ভিডিও, ওজন ও মূল্য প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে অনেক ক্রেতা ঘরে বসেই পছন্দের পশু কিনতে পারছেন। এতে হাটের অতিরিক্ত চাপ ও ভোগান্তিও কমছে।
তবে খামারিদের দাবি, বিপুল সম্ভাবনার এই খাত এখন নানা সংকটে পড়েছে। পশুখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। খড়, ভুষি ও খৈলের উচ্চমূল্যে দীর্ঘদিন পশু লালন-পালন করে অনেক খামারি আর্থিক চাপে রয়েছেন সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতীয় গরুর অবৈধ চোরাচালানের আশঙ্কা। খামারিদের অভিযোগ, সীমান্ত পথে ভারতীয় গরু প্রবেশ করলে দেশীয় পশুর বাজার ধসে পড়বে এবং হাজার হাজার খামারি লোকসানের মুখে পড়বেন।
এছাড়া পশুর হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়, পকেটমার ও মলম পার্টির উৎপাত, জাল টাকার চক্র এবং মহাসড়কে পশুবাহী ট্রাক থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে যমুনা সেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে পশুবাহী যানবাহন থেকে চাঁদা আদায় বন্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছেন খামারিরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খামারিদের সুরক্ষা ও বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে অন্তত ছয়টি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে— ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন, হাটে চিকিৎসা ক্যাম্প ও ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন, সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধে নজরদারি বৃদ্ধি, হাসিল আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জাল টাকা প্রতিরোধে ব্যাংকের বুথ স্থাপন এবং হাইওয়ে ও পশুর হাটে চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান পরিচালনা।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাতুলী ইউনিয়নের চৌ-বাড়িয়া এলাকার রহমান এগ্রো ফার্মের মালিক দেওয়ান সুমন আহমেদ বলেন, গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় খামারিরা চরম সংকটে আছেন। গত বছর ৩৮টি ষাঁড় বিক্রি করেছি। এবারও ৩৪টি ষাঁড় প্রস্তুত করেছি। আশা করছি ভালো দাম পাব।
কালিহাতী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু সাইম আল সালাউদ্দিন জানান, এ উপজেলায় ১ হাজার ৭০৩টি খামারে ২০ হাজার ৫৬৯টি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। চাহিদা রয়েছে ১৭ হাজার ৯৭১টি পশুর। ফলে উপজেলায় ২ হাজার ৫৯৮টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, “প্রান্তিক খামারিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পশুর হাটগুলোতে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পও চালু করা হয়েছে।
জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ডা. মো. শহীদুল আলম জানান, উন্নত জাতের গরু-ছাগল উৎপাদন ও খামার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে খামারিদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর সুফল হিসেবে উৎপাদনও বেড়েছে।
টাঙ্গাইল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হেলাল উদ্দিন খান বলেন,জেলায় কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটগুলোতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করছে। খামারি, পাইকার ও ক্রেতাদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিবার্তা/বাবু/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]