
বান্দরবানের লামা বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ, মাসোহারা, বদলি বাণিজ্য, সংরক্ষিত বন ধ্বংস এবং টাকার বিনিময়ে মামলা গায়েবসহ নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিজেই অবৈধ অর্থের বিনিময়ে বনজ সম্পদ পাচার ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন।
বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ী, করাতকল মালিক, ইটভাটা ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মোস্তাফিজুর রহমান লামা বনবিভাগকে অবৈধ আয়ের কেন্দ্রে পরিণত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বনবিভাগের আঞ্চলিক কর্মকর্তা (সিএফ) মোল্লা রেজাউল করিমের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব খাটিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে রাঙামাটিতে দায়িত্ব পালনকালে সংরক্ষিত বন ধ্বংসের ঘটনায় তাঁকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে।
লামা বনবিভাগের অধীনে চারটি সংরক্ষিত বন রয়েছে। এর মধ্যে মাতামুহুরি সংরক্ষিত বন থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৫ লাখ টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫ লাখ টাকার বাঁশ মহাল নিলাম দিয়েছিল বন বিভাগ। তবে মোস্তাফিজুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাঁশ মহালের নিলাম বন্ধ হলেও চলছে পাচার গোপনে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারি নিলাম বন্ধ থাকলেও কমিশনের বিনিময়ে রাতের আঁধারে গাড়ি ও নদীপথে বাঁশ পাচারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, আর ব্যক্তিগতভাবে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বাঁশ ব্যবসায়ী আমির হোসেন বলেন, লামারমুখে টাকা দিলে বাঁশ পার করা যায়। টিপি ছাড়া প্রতি বাঁশে ৫ টাকা করে দিতে হয়। প্রতিটি বাঁশ গুণে টাকা নেওয়া হয়। নিলাম বন্ধ থাকায় সরকার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় সংবাদকর্মী তানজিমুল হক মাহিম বলেন, বমু বিলছড়ি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মোস্তাফিজুর রহমানের আমলেই সবচেয়ে বেশি গাছ কেটে পাচার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, রাতের আঁধারে বমু রিজার্ভ থেকে গাছ কেটে ফাইতং সড়ক হয়ে বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হয়। প্রতি কাঠবোঝাই গাড়ি থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। ফলে পথে কেউ গাড়ি আটকায় না।
তাঁর অভিযোগ, পাচারের তথ্য ডিএফওকে জানালে উলটো সেই তথ্য দ্রুত পাচারকারীদের কাছেই পৌঁছে দেন ডিএফও নিজে।
ঝাড়ুফুল ও ফার্নিচারবাহী গাড়ির পরিবহন অনুমোদন (টিপি) দেওয়ার নামে ২ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। টাকা না দিলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে ফার্নিচারের টিপি না দিলেও প্রতি রাতে গাড়ী যায়।
এ ছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন গাছ বিক্রির জন্য জোত পারমিট দেওয়ার ক্ষেত্রেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। খাড়া মার্কিং ও সাইজলিস্ট দেওয়ার নামে প্রতি ঘনফুট কাঠে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
চলতি অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ঘনফুট কাঠের জোত পারমিট দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতি ঘনফুটে ৬০ টাকা করে মাত্র ছয় মাসেই প্রায় ১ কোটি টাকার বেশি ঘুষ আদায় করেন ডিএফও ।
এক জোত মালিক সমিতির নেতা বলেন, অতিরিক্ত ঘুষের কারণে অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে জোত পারমিট নিতে আগ্রহ হারাচ্ছে ফলেও সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।
এদিকে একাধিক করাতকল মালিক জানান, প্রতি করাতকল থেকে মাসে ৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। লামায় ৩৫টি করাতকল থেকে মাসে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান ।
অন্যদিকে, ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি কাঠ জব্দের ভয় দেখিয়ে প্রতি ইটভাটা থেকে ১০ হাজার টাকা করে মাসোহারা নেওয়া হয়। বন বিভাগের আওতাধীন ৪০টি ইটভাটা থেকে মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া প্রতি লাকড়ি ও কাঠবোঝাই গাড়ি থেকে ৩ হাজার টাকা এবং গাড়ি ভেদে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
ডিএফওর আয়ের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে পরিচিত লামারমুখ চেকস্টেশন। অভিযোগ রয়েছে, এখান থেকে মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা আদায় করা হয়।
বন বিভাগের এক সাবেক রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ বাঁশ ও কাঠ পরিবহন থেকে আদায় করা অর্থ দিয়েই বাসা ও অতিথি আপ্যায়নের ব্যয় করেন ডিএফও ।
বদলি বাণিজ্যে লাখ লাখ টাকা
মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জে বদলির জন্য ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা কম গুরুত্বপূর্ণ বিট ও রেঞ্জে ৫ লাখ টাকা এবং ফরেস্ট গার্ড ও বাগান মালিদের বদলিতে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করে করেছে ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আলতাফ হোসেনকে ৮ লাখ টাকায় লামা সদর রেঞ্জ, পরে বমু বিট ও লামারমুখ চেকস্টেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আব্দুল মালেককে ৩ লাখ টাকায় মাতামুহুরি রেঞ্জ, পরে আরও ৬ লাখ টাকায় অতিরিক্ত লামা সদর রেঞ্জে দায়িত্ব দেওয়া হয়, রনি পারভেজকে ৬ লক্ষ টাকায় স্পেশালের ওসির দায়িত্ব দেন ডিএফও।
ফরেস্ট গার্ড লতিফ ও বাগান মালি করিমকে ডিএফওর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
তাঁদের অভিযোগ, কাঠ বা লাকড়িবাহী গাড়ি চলাচলের আগে তাঁদের মাধ্যমে ‘লাইন’ নিতে হয়। অনুমতি ছাড়া গাড়ি চললে তা আটক করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়।
তবে বাগান মালি করিম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি ছোট পদে চাকরি করি। আমার কাজ রেস্টহাউস দেখাশোনা করা। ডিএফওর ক্যাশিয়ার এটা সঠিক নয়।’ গত ২৫ সালের জুনে সেনাবাহিনী ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে এক কাঠ ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে সেগুন কাঠ জব্দ করেন । ওই ঘটনায় তিনজনকে আসামি করে মামলা করে বনবিভাগ সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা আলফাত হোসেন।
অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেলিম নামের এক ব্যবসায়ীকে বাঁচাতে মামলার নথি আদালতে জমা দিতে দেননি। বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, রেজিস্টার ও মাসিক প্রতিবেদনে মামলার তথ্য ছিল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার প্রায় ছয় মাস পর কৌশলে আদালতে কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়।
মামলার এক আসামি মাহাবুব বলেন, আমার কাঠ জব্দ করে মামলা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন আদালতে ঘুরেও মামলার কোনো হদিস পাইনি। পরে প্রায় ছয় মাস পর মামলাটি আদালতে পাওয়া যায়।
বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ডিএফওর যোগসাজশে তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন নথি গায়েব করেন।
মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেন, বাঁশ মহাল বন্ধ থাকায় সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে এটা সত্য। তবে সীমিত জনবল নিয়েও আমরা বাঁশ পাচার বন্ধে টহল জোরদার করেছি এবং বাঁশ মহাল নিলামের জন্য কাজ করছি।
এ বিষয়ে লামা বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে নেটওয়ার্ক সমস্যার কথা বলে পরে কথা বলবেন জানান।
পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বক্তব্য চেয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম বন আঞ্চলিক কর্মকর্তা (সিএফ) মিহির কুমার দে জানান, লামা বনবিভাগের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিবার্তা/জয়দেব/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]