কাদির মিয়ার জঙ্গল থেকে জাতীয় উদ্যান—কাদিগড়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:২০
কাদির মিয়ার জঙ্গল থেকে জাতীয় উদ্যান—কাদিগড়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য
ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

ময়মনসিংহ বন বিভাগের অধীন ভালুকা রেঞ্জের কাদিগড় বিট আজ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। প্রাকৃতিক বন ও মানুষের হাতে গড়া বনের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই এলাকা যেন সবুজের এক জীবন্ত পাঠশালা। চোখজুড়ানো মনমোহিনী গজারী বাগান, সেগুন বাগান আর ঘন সবুজের আবরণ যে কাউকে মুহূর্তেই প্রকৃতির গভীরে টেনে নেয়।


বহু বছর আগে পরিকল্পিতভাবে সৃজিত মিনজিরি, অর্জুন ও সেগুনের বাগানগুলো সময়ের প্রবাহে আজ প্রায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বনের রূপ নিয়েছে। উঁচু উঁচু গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো, বাতাসে পাতার মর্মর আর পাখির অবিরাম কিচিরমিচির মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক মোহময় পরিবেশ। প্রকৃতির একান্ত সান্নিধ্যে এসে এই সবুজের সমারোহ আর মনভোলানো পাখির কলতান প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে করে তোলে বিমোহিত।


কাদিগড় জাতীয় উদ্যানে নিয়মিত দেখা মেলে হনুমান ও বানরের দল। ভাগ্য ভালো থাকলে গাছের ডালে ডালে তাদের লাফালাফি চোখে পড়ে। এছাড়া প্রাণীকুলের মধ্যে রয়েছে শিয়াল, শজারু, মেছো বিড়াল, বনবিড়াল, বাগডাশ ও বেজী। বনের ভেতরে বিচরণ করে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, ব্যাঙ, তক্ষক ও গুঁইসাপ। রঙিন প্রজাপতির উড়াউড়ি আর হরেক রকম পাখির কিচিরমিচির এই বনকে করে তুলেছে আরও জীবন্ত।


অবস্থানগত দিক থেকে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার দক্ষিণে, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে এবং ভালুকা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।


যোগাযোগ ব্যবস্থাও তুলনামূলক সহজ। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী বাসে সিডস্টোর বাজারে নেমে সেখান থেকে সিএনজি যোগে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ১৫০ টাকা ভাড়ায় কাদিগড় জাতীয় উদ্যানে পৌঁছানো যায়। তবে বর্ষাকালে কাঁচা রাস্তার কারণে চলাচলে কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয়।


শুষ্ক মৌসুমে কাদিগড় বিট হয়ে ওঠে বনভোজনপ্রেমীদের মিলনকেন্দ্র। পরিবার, বন্ধু ও বিভিন্ন সংগঠনের মানুষ এখানে এসে প্রকৃতির কোলে সময় কাটান। সবুজই যে প্রাণের স্পন্দন, বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র, এই উপলব্ধিই যেন নতুন করে জাগে কাদিগড়ের বনে এসে।


লোকমুখে প্রচলিত আছে, একসময় এই জঙ্গলের কাঠ ও গাছ সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে কাদির মিয়া নামে এক কাঠ ব্যবসায়ী কিনতেন। তার একক আধিপত্যের কারণে অন্য কেউ এই টেন্ডারে অংশ নিতে পারতেন না। দাপুটে এই প্রভাবের কারণেই এলাকাটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘কাদির মিয়ার জঙ্গল’ নামে, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে আজ কাদিগড় জাতীয় উদ্যান হিসেবে পরিচিত।


প্রায় ৯৫০ একর আয়তনের এই জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার, দুটি ইকো কটেজ, দুটি গোলঘর, পিকনিক স্পট এবং পুকুরপাড়। পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হলে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান ভবিষ্যতে হতে পারে ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্য।


সবুজের মাঝে নিজেকে হারিয়ে দিতে চাইলে, প্রকৃতির কাছে একটু নিশ্বাস নিতে চাইলে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান হতে পারে সেই নিখুঁত ঠিকানা।


বিবার্তা/সাজ্জাদুল/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com