বেদখল রেলের ৭শ আবাসিক কোয়ার্টারে রাতে বসে মাদকের হাট
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৩:৩৬
বেদখল রেলের ৭শ আবাসিক কোয়ার্টারে রাতে বসে মাদকের হাট
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের ৭শ আবাসিক কোয়ার্টার এখন বেদখল ও ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের ছাদ এবং ওয়ালে ফাটল, জানালা-দরজা নেই, পাকা ছাদ বিধ্বস্ত, ইটের ফাঁকে ফাঁকে আগাছা। তারপরও কিছু কোয়ার্টারে অবৈধভাবে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে দখলদাররা। রাতে চলে বেআইনি কাজ, মাদকের হাট। দেখে মনে হয় ভুতুড়ে বাড়ি।


সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ১০০ বছরের পুরনো ৭শ আবাসিক কোয়ার্টারগুলোর মধ্যে কিছু কোয়ার্টারে অবৈধভাবে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে দখলদাররা। ১৯৩০ সালে নির্মাণ করা হয় লালমনিরহাটে রেলওয়ে কোয়ার্টারগুলো। অধিকাংশ ভবনের ছাদ এবং ওয়ালে ফাটল, জানালা-দরজা নেই, পাকা ছাদ বিধ্বস্ত, ইটের ফাঁকে ফাঁকে আগাছা, সর্বোপরি কোয়ার্টারগুলো মানুষ বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক কোয়ার্টারে সন্ধ‌্যা হলে মাদকের আসরও বসে। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা এলাকাবাসীর। একসময়ের রেলের শহর লালমনিরহাট। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য শহরের প্রাণকেন্দ্র স্টোরপাড়া, ড্রাইভারপাড়া, রামকৃষ্ণ মোড়, বাবুপাড়া, সাহেবপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছিল সহস্রাধিক স্টাফ কোয়ার্টার। প্রায় শত বছর আগের নির্মিত এসব কোয়ার্টার সংস্কারের অভাবে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে রেল কর্তৃপক্ষের কেউ বসবাস না করলেও প্রায় ৪০ বছর ধরে অবৈধ দখলদাররা অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই বসবাস শুরু করে।


আবাসিক কোয়ার্টারগুলোতে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, মুহুরী, মুদি দোকানদার, বাস-ট্রাকচালক, হেলপার, হকার, এনজিও কর্মী, শ্রমিক ও দিনমজুররা দিব্যি বছরের পর বছর ধরে বসবাস করছেন। এসব বসবাসকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এক শ্রেণির রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে অলিখিতভাবে কোয়ার্টারগুলো মাসিক ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। যার ভাড়ার টাকা কোনো দিনই সরকারের ঘরে জমা হয় না। এদিকে শহরের বেশির ভাগ এলাকা রেলের আওতায় থাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়ছে পৌরসভা। এতে উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলা সদরের শহরবাসী।


স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পরিত্যক্ত ও বিধ্বস্ত এসব কোয়ার্টারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু অসহায় পরিবার জীবনযাপন করছেন। শুধু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লালমনিরহাট রেলওয়ের অধিকাংশ আবাসিক কোয়ার্টারের এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। লালমনিরহাটে রেলওয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টারের সংখ্যা ৯১০টি হলেও প্রায় ৭ শতাধিক কোয়ার্টার বেদখলে। পুরনো এবং জীর্ণ অধিকাংশ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি।


রেলস্টেশন সূত্র জানায়, লালমনিরহাট-বুড়িমারী রুটে জেলার সীমানা জুড়ে ১২টি স্টেশন রয়েছে। এসব স্টেশন সংলগ্ন আবাসিক কোয়ার্টারের স্টেশন মাস্টারসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর বসবাসের জন্য রেল বিভাগের রয়েছে অনেক আবাসিক কোয়ার্টার। বর্তমানে যেগুলোর অধিকাংশই রয়েছে বহিরাগতদের দখলে। লাল রংয়ের এই ভবনগুলো ব্রিটিশ আমলের তৈরি। এখন জীর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এই ভবনগুলোতে রেলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা না থাকায় যে যার মতো দখল করে রেখেছে। এসব ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি মাথায় নিয়েই বসবাস করছেন বহিরাগতরা। সেই সঙ্গে চুরি হয়ে যাচ্ছে ভবনের ইটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। বহিরাগতদের দখলে থাকা এসব আবাসিক কোয়ার্টারে মাদক ব্যবসাসহ নানান অনৈতিক কাজের অভিযোগ অনেক পুরনো হলেও দেখার নেই কেউ। বহিরাগতদের বারবার উচ্ছেদ করা হলেও বেদখল হওয়া কোয়ার্টারগুলো দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ভবনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণকারী কর্মকর্তা। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় কোয়ার্টারগুলো এখন সাধারণ মানুষের কাছে মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কোয়ার্টারে রাতের আঁধারে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকা যুবকরা কোয়ার্টারের ইট, রড, কাঠ, দরজা-জানালা অবাধে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার সম্পদ খোয়া যাচ্ছে।


লালমনিরহাট সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম‌্যান একেএম মমিনুল হক বলেন, রেলের যে পরিত্যক্ত ভবনগুলো রয়েছে যে ভবনগুলোতে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করে। সেই ভবনগুলো এতটাই ভঙ্গুর যে, যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এখানে অনেক মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে। এই ব্যাপারে আমাদের যে সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে কর্মকর্তা রয়েছেন বা জেলা প্রশাসক রয়েছেন তাদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।


লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার মোহাম্মদ তসলিম আহমেদ খান বলেন, রেলওয়ের জমি ও আবাসিক কোয়ার্টারগুলো দখলমুক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে বিধ্বস্ত কোয়ার্টারগুলো মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকারি এই ভবনের সঠিক তদারক এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করে নতুন ভবন নির্মাণ করবে কর্তৃপক্ষ-এমনটিই প্রত্যাশা তার।


বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com