বজ্রপাত এখন মৃত্যুর দূত
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০১
বজ্রপাত এখন মৃত্যুর দূত
আবেদ হোসাইন
প্রিন্ট অ-অ+

কালো মেঘ জমলেই এখন গ্রামবাংলার আকাশে শুধু বৃষ্টির পূর্বাভাস নয়, নেমে আসে মৃত্যুর শঙ্কা। দূরে বিদ্যুতের ঝলকানি, সঙ্গে বজ্রের প্রচণ্ড গর্জন—আর মুহূর্তেই মাঠের মাঝখানে লুটিয়ে পড়ে কৃষক, নদীর বুকে নিথর হয়ে যান জেলে, বাড়ি ফেরার পথে থেমে যায় কোনো স্কুলছাত্রের জীবন।


বজ্রপাত এখন আর কেবল প্রকৃতির স্বাভাবিক ঘটনা নয়; এটি পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের এক ভয়ংকর নীরব ঘাতকে। ঝড়-বন্যা-নদীভাঙনের দেশে নতুন করে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম—বজ্রপাত।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা, বায়ুদূষণ, বনাঞ্চল ধ্বংস, বড় গাছ কেটে ফেলা, প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং আগাম সতর্কতার অভাব—সব মিলিয়ে বজ্রপাত এখন জাতীয় দুর্যোগের রূপ নিয়েছে।


কেন বাড়ছে বজ্রপাত?


বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানই বজ্রপাতের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে আসে গরম ও আর্দ্র বাতাস, আর উত্তরে হিমালয় ও পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নামে ঠান্ডা বাতাস। এই দুই বিপরীত প্রকৃতির বাতাসের সংঘর্ষে তৈরি হয় বজ্রমেঘ।


এক মেঘের সঙ্গে আরেক মেঘের ঘর্ষণে সৃষ্টি হয় উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ, যা মুহূর্তে মাটিতে নেমে এসে সবচেয়ে কাছের বস্তুতে আঘাত হানে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা মাত্র ১ ডিগ্রি বাড়লেই বজ্রপাতের সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সেই বিপদকে আরও তীব্র করছে।


এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বায়ুদূষণ। বাতাসে কার্বন-ডাই অক্সাইডের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি মেঘে রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য বাড়িয়ে দেয়, ফলে বজ্রপাতও বৃদ্ধি পায়।



গড়ে ৩০০ প্রাণহানি


জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০০ জন মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান। ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বজ্রপাতে মারা গেছেন ১ হাজার ৮৭৮ জন। ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় দুই হাজার ছাড়িয়েছে। বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।


সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—মৃতদের প্রায় ৭০ শতাংশই কৃষক, যারা খোলা মাঠে কাজ করেন। এছাড়া বাড়ি ফেরার পথে ১৪ শতাংশ এবং গোসল, মাছ ধরা বা নদীপথে চলাচলের সময় আরও ১৩ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারান।


অর্থাৎ বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন দেশের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ।


এপ্রিল থেকে জুন: মৃত্যুর ঋতু


আবহাওয়াবিদদের মতে, মার্চ থেকে মে মাসে প্রায় ৫৯ শতাংশ বজ্রপাত হয়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ মোট বজ্রপাতের প্রায় ৭০ শতাংশই এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ঘটে।


গবেষণায় দেখা গেছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে বজ্রপাতের হার প্রায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ।


এই সময়টিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন“বজ্রপাতের মৃত্যুমৌসুম”।



গাছ কেটে নিজেরাই ডেকে আনছি মৃত্যু


একসময় তালগাছ, নারিকেল গাছ, বটগাছ কিংবা বড় বড় বৃক্ষ বজ্রনিরোধকের মতো কাজ করত। এখন উন্নয়নের নামে সেই প্রাকৃতিক ঢালগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে।


ফলে খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ সরাসরি বজ্রপাতের শিকার হচ্ছেন।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “গাছ কাটা মানে শুধু পরিবেশ ধ্বংস নয়, জীবনরক্ষার প্রাকৃতিক সুরক্ষা ভেঙে ফেলা।”


সরকার তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নিলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনো আশানুরূপ নয়।


উন্নত দেশগুলো পারলে আমরা কেন নয়?


যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন বজ্রপাত হলেও মারা যায় মাত্র ৪০ থেকে ৫০ জন। কারণ সেখানে রয়েছে আধুনিক আগাম সতর্কবার্তা, বজ্রনিরোধক খুঁটি, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা।


ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এমন যন্ত্র বসানো হয়েছে, যা ৪৫ মিনিট আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেয়। অন্ধ্র প্রদেশে টিভি সেট টপ বক্স ও এসএমএসের মাধ্যমে মানুষকে আগাম সতর্ক করা হয়।


বাংলাদেশেও পরীক্ষামূলকভাবে লাইটনিং ডিটেক্টর বসানো হয়েছে, কিন্তু তা এখনো মানুষের জীবনে কার্যকর সুরক্ষা হয়ে উঠতে পারেনি।


সতর্ক থাকলেই বাঁচতে পারে জীবন


বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে বড় ভুল হলো গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া। নিরাপদ আশ্রয় হলো পাকা ঘর বা ভবন।


মোবাইল, কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক যন্ত্র, ধাতব বস্তু, পানির উৎস, দরজা-জানালা থেকে দূরে থাকতে হবে। বাইরে থাকলে খোলা মাঠ, নদী, পুকুর, টাওয়ার, বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং একা বড় গাছের নিচে দাঁড়ানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।


যদি বজ্রপাত দেখা ও শব্দ শোনার ব্যবধান ৩০ সেকেন্ডের কম হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। শেষ বজ্রধ্বনি শোনার পর অন্তত ৩০ মিনিট নিরাপদ স্থানে থাকতে হবে।



আবহাওয়াবিদ উইং কমান্ডার মো. মোমেনুল ইসলাম (অব.) বলেন, এপ্রিল থেকে জুন এর মধ্যেই বেশি বজ্রপাত বেশি হয়ে থাকে। বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার সঙ্গে বজ্রপাতের সম্পর্ক রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হলে বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে, তাই বেশি বজ্রঝড় তৈরি হতে পারে। বনায়ন কমে গেলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।


বিবার্তা/আবেদ/এসএম

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com