
আজও চোখে ভাসে সেই ঝড়ের সন্ধ্যা। প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে আমি বাসায় ফিরতে পারিনি। হলের অফিস রুমে বসে জড়সড় হয়ে কাঁদছিলাম। হঠাৎ কেউ বললো, “আরে, তুমি এ সময় এখানে?” মুখ তুলে তাকাতেই মনে হলো, কিছুদিন আগে হলের সিটের জন্য আমি আপুকে বলেছিলাম।
আপুর নাম লিলি আপা। সে তখন এমন আন্তরিকতার সঙ্গে বললো, “কেঁদো না, রুমে চলো।” মুহূর্তেই মনে হলো, মানুষটি কত আপন, কত দিনের চেনা। পরের দিনই তিনি আমাকে তার রুমে সিট করে দিলেন। রুমে তখন আমাদের ব্যাচের তারা— হ্যাপি, শাম্মী, সুমি—সহ আমরা অনেকেই একসাথে থাকতাম। আমরা সবাই একেক অঞ্চলের, কেউ বরিশাল থেকে, কেউ কুষ্টিয়া থেকে, আবার কেউ খুলনা থেকে এসেছিলাম।
লিলি আপা সবসময় আমাদের ছোট বোনের মতো স্নেহ করতেন। হলে থাকাকালীন সময়েই আমরা দেখেছি, তার মেয়েদের প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা অসীম। সবাই তাকে বিশ্বাস করত, তানজীন চৌধুরীর নাম ছিল আমাদের জন্য আস্থা এবং নির্ভরতার প্রতীক।
আমি তাকে শুধু একজন দয়ালু আপা হিসেবে দেখিনি। রাজনীতি, খেলাধুলা, পড়াশোনা— সবকিছুর সঙ্গে তিনি সামঞ্জস্য রেখে এক অসাধারণ ভারসাম্য রাখতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ হিসেবে তার সাফল্য ছিল নজিরবিহীন। তৎকালীন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ তাকে ঢাবির ‘মৌলভি আব্দুল মতিন স্বর্ণপদক’ দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। এই স্বর্ণপদক কেবল তার ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতীক নয়, বরং আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।
তার জীবন আমাদের শেখায় যে সফলতা শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও দায়িত্ববান থাকা এবং পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই আসে। তিনি শুধু নিজের শিক্ষাই নয়, ভাইবোনদেরও শিক্ষিত করেছেন। তার ছোট বোন এমবিবিএস চিকিৎসক, ছোট ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগের অনার্স ও মাস্টার্স কমপ্লিট করেছেন, আর সবচেয়ে ছোট ভাইও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করেছেন। শিক্ষা নিয়ে লিলি আপার সিরিয়াসনেস এবং ভাইবোনদের প্রতি দায়িত্ববোধ সত্যিই প্রশংসনীয়।
লিলি আপা কেবল এক নেতা বা শিক্ষিকা নন— তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, কীভাবে সাহস, সততা, সহানুভূতি এবং দায়িত্ববোধ একসাথে জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে। তার আচরণ, অন্তর্দৃষ্টি ও নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত আজও আমাদের পথ দেখায়। আমি চাই, আমাদের দেশের রাজনীতি এবং সমাজে আরও অনেক নারী তার মতো হোক— যারা সংকটের সময় সাহস দেখাতে জানে, অন্যকে সহানুভূতিতে ভালোবাসে, এবং কাজের মাধ্যমে নেতৃত্ব প্রদর্শন করে। এমন নেত্রীরা দেশের নারীদের জন্য এক নতুন দিগন্তের প্রতীক, যাদের কাছ থেকে আমরা সবাই অনুপ্রেরণা নিতে পারি। লিলি আপা আমাদের দেখিয়েছেন—যে-কোনো বাধা, ঝড় বা চ্যালেঞ্জই যখন সাহস এবং দৃঢ় মনোবলের সঙ্গে মোকাবিলা করা হয়, তখন তার পথে আলোকিত করে দিতেই পারে।
২০০৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ হিসেবে ৪২তম সমাবর্তনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির বিন মোহাম্মাদ হাত থেকে তানজীন চৌধুরী লিলি ‘মৌলভী আব্দুল মতিন স্বর্ণপদক’ গ্রহণ করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি লিলি নানাবিধ সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য ২০২৪ সালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার শ্রেষ্ঠ জয়িতা পদক অর্জন করেন তিনি।
দেশজুড়ে সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য নিয়ে চলছে আলোচনার ঝড়! ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই তাকে নিয়ে কেন্দ্র থেকে গ্রামগঞ্জে এ আলোচনা শুরু হয়েছে।
এ আলোচনায় রয়েছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্যতম নারী নেত্রী তানজীন চৌধুরী লিলি। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ময়মনসিংহ উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর থেকে রাজনীতিতে বেড়ে ওঠা এই নেত্রী রাজপথে ছিলেন সক্রিয়।
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোক্তার উদ্দিন চৌধুরী ও মরিয়ম আক্তারের কন্যা তিনি। তার স্বামী শাহ্ নাসিরউদ্দিন রুমন যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক। নারী নেত্রী লিলি বিগত সরকারের বিরুদ্ধে দলীয় কর্মসূচি পালনে ছিলেন সরব।
ছাত্রজীবনেই তিনি ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৯৬ সালে গৌরীপুর সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০০৪ সালে অনার্স ও ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শামসুননাহার হল শাখার আহ্বায়ক ও পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১/১১ ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলনে সম্মুখসারিতে আন্দোলন করতে গিয়ে দীর্ঘদিন মামলায় অভিযুক্ত আসামি ছিলেন। বিগত সরকারের আমলে অসংখ্য মামলা এবং হামলার শিকার হয়েছেন।
তানজীন চৌধুরী লিলি ২০০৯ সালে গৌরীপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এরপর থেকে কেন্দ্রীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন।
ময়মনসিংহ উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতির পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুননাহার হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এছাড়াও তিনি গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ময়মনসিংহ জেলার আসনগুলোতে ধানের শীষ প্রতীকের প্রচারণায় নেমে নারীদের সঙ্গে উঠান বৈঠক ও গণসংযোগ করে বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
তানজীন চৌধুরী লিলি বিবার্তাকে বলেন, দলের সংগ্রামে ছিলাম, দুঃসময়ে প্রতিটি কর্মসূচি পালন করেছি। নিজেরাও কর্মসূচি দিয়ে কাজ করেছি। দলের জন্য নিবেদিত ছিলাম। দলের আন্দোলন-সংগ্রামে এবং জিয়া পরিবারের দুঃসময়ে পাশে থেকেছি স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে। আমার ৬ বছরের একমাত্র শিশু কন্যা সন্তান শাহ্ রুফাইদা লুবাবা লোহার খাঁচায় বন্দী প্রতীকী খালেদা জিয়া সেজে ১ অক্টোবর ২০২৩ সালে "ময়মনসিংহ টু কিশোরগঞ্জ রোডমার্চ" প্রোগ্রামে অংশ গ্রহণ করে। দলের নেতৃত্বের প্রতি অনুগত ছিলাম। কাজের মূল্যায়ন দল করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
স্থানীয়রা জানান, তানজীন চৌধুরী লিলি সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেয়ে সংসদে গেলে ময়মনসিংহ অঞ্চলসহ দেশের নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারী ক্ষমতায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন।
লেখক: সেলিনা আমিন (সদস্য, শামসুননাহার হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন)।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]