
‘ওই যে...ওই জানালা বন্ধ রুমটা দেখছ না? ওটাতে তুমি কালকে উঠে যাবা।’
একটু বয়কাট করে কাটা চুল, প্যান্ট-টিশার্ট পরা বড় আপুটি যখন বলল আমার তখন বিশ্বাস হচ্ছিল না।
আসলেই কী পরদিন আমি হলে উঠতে পারব? কিন্তু অবাক হলাম। পৃথিবী ভালো মানুষের। আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথমেই আমি পেয়ে গেলাম এমন এক ভালো মানুষের দেখা। যেখানে মফস্বলের মেয়েরা মাসের পর মাস হলের একটা সিটের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে। সেখানে সপ্তাহখানেকের মধ্যে আমার হলে সিট ম্যানেজ হয়ে যায়। হলে সিট না পেলে আমার আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই হতো না। নার্গিস আপা যতদিন হলে ছিলেন, আমাকে ছোটোবোনের মতই দেখাশোনা করতেন। এটা শুধু আমি না, হলের প্রতিটি মেয়ের ক্ষেত্রে তিনি একই ছিলেন। ২৫ বছর পর নার্গিস আপা আমাদের একইরকম প্রিয়। খুব পছন্দের মানুষ।”এমনটাই বললেন একটি প্রকাশনা সংস্থায় উচ্চপদে কর্মরত ইশরাত জাহান। তাঁর এবং তাঁর বন্ধুদের সবার সঙ্গেই এখনও নার্গিস আপা মানে শাহিনূর নার্গিসের সম্পর্ক চমৎকার।
আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন তাদের কাছে নার্গিস আপা এক অনন্য নাম নার্গিস আপা (শাহিনূর নার্গিস)। দীর্ঘদিন যাবৎ করে আসছেন বিএনপির রাজনীতি। ৩১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে শাহিনূর নার্গিসের পথচলা শুরু ১৯৯৫ সালে নরসিংদীর পলাশ শিল্পাঞ্চল কলেজ ছাত্রদলের মাধ্যমে। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এই কলেজ কমিটির ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন তিনি।
এর পর তার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যাত্রা। ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। ২০০২ সালে রোকেয়া হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও ২০০৪ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন শাহিনূর নার্গিস। ২০১০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সদস্য পদে দায়িত্ব পান। ২০১২ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক ও ২০১৫ সালে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন তিনি।
৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ ও এক-এগারো সরকারের প্রায় ১৭ বছরের শাসনামলে ৩৫টির বেশি মামলার আসামি হন শাহিনূর নার্গিস। এসব মামলায় তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সঙ্গে সব মামলার আসামি হন। ৭ মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ঢাবি ক্যাম্পাসে মামলার ভুক্তভোগী একমাত্র ছাত্রী শাহিনূর নার্গিস।
বর্তমানে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন শাহিনূর নার্গিস। এর আগে সর্বশেষ ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ মহিলা দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, সদস্য সচিব ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্ররাজনীতি ছেড়ে ২০২০ সালে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন নার্গিস।
‘আমি রাজনীতি করেছি যখন ছাত্র ছিলাম তখন ছাত্রদের জন্য। এখন আমার রাজনীতিতে সেবা প্রদান হবে দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য।’- নিজের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে নার্গিস সোজাসাপটা এভাবেই বলেন।
তিনি আরও বলেন,‘ছাত্ররাজনীতি করার সময় সবসময় মামলা-হামলার শিকার হয়েছি, এক-এগারোর আর্মি শাসনে রাজপথে জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করে নেত্রীকে মুক্ত করেছিলাম, তারেক রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর গর্জে উঠেছিলাম, অসংখ্য রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার আসামি হয়ে পালিয়ে ছিলাম দীর্ঘদিন ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি। দেশের ভালোর জন্য, দেশের মানুষের ভালোর জন্য কখনো পিছিয়ে যাইনি।’
এত ত্যাগ, এত নিবেদিত প্রাণ নেতা কী প্রতিদান পেয়েছেন কখনো? এই প্রশ্নে মুচকি হাসেন নার্গিস। কিন্তু রাষ্ট্রের তো দায়িত্ব তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা। এবং এখন যেহেতু তার দলের সরকার, সময় তো এখনই এই নেত্রীকে মূল্যায়ন করার।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৫০ সদস্যের সরকার গঠন করেছেন। এই সময়ে এসে রাজনীতি ও জনপরিসরে আলোচনার সামনে থাকছে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের বিষয়টি।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, দলের প্রতি আনুগত্য এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা- এসব যাচাই-বাছাই হবে প্রার্থী মনোনয়নে। তো যাচাই-বাছাইয়ের সব ক্যাটাগরিই তো পূরণ করে নার্গিসের কর্মযজ্ঞ।
সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত হয়ে সবসময়ের মত তিনি কাজ করবেন নারীদের জন্য। দেশের আপামর মানুষের জন্য। ‘আজীবন দলের জন্য কাজ করেছি। দলের নেতৃত্বের প্রতি অনুগত ছিলাম। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের সব আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে সক্রিয় ছিলাম। সংরক্ষিত আসনের এমপি হিসেবে মনোনয়ন পেলে দেশের জন্য আমি আরও ভালো করে কাজ করতে পারব।’- দেশ-দেশের মানুষের জন্য কাজ করার স্বপ্নের কথা এভাবেই বলেন শাহিনূর নার্গিস।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]