
২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তখন ছাত্রদলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে ছাত্রলীগ। এমন এক দমবন্ধ পরিস্থিতিতে ছাত্রদলের মিছিলে ২০-৩০ জনের বেশি কর্মী জড়ো হতো না। তবু থেমে থাকেননি নেতাকর্মীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি প্রয়াত মনির হোসেন ও প্রয়াত মোস্তাফিজুল ইসলাম মামুনের নেতৃত্বে প্রতিদিনই বের হতো ঝটিকা মিছিল। তেমনি এক মিছিলের সামনের সারিতে জিন্স ও টি-শার্ট পরা, দীপ্ত, সাহসী, যুদ্ধংদেহি এক তরুণীকে দেখেছিলাম—তার নাম লিলি। তখনও ছাত্রদলের কোনো আনুষ্ঠানিক পদ-পদবি তার ছিল না, কিন্তু সক্রিয় কর্মসূচিতে তার সেই বলিষ্ঠ উপস্থিতি আজও স্মৃতির মণিকোঠায় দীপ্যমান।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন, যারা কেবল পদ-পদবির রাজনীতি করেন না; বরং সংগ্রাম, ত্যাগ, আদর্শ, সাহস এবং মানুষের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার নিয়ে সামনে এগিয়ে আসেন। তানজীন চৌধুরী লিলি সেই ধরনেরই একজন পরীক্ষিত, সাহসী ও নিবেদিতপ্রাণ নেত্রী—যার জীবনপথ ছাত্ররাজনীতি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সাংগঠনিক দায়িত্ব, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং ক্রীড়া-সাফল্যের এক অনন্য সমন্বয়।
আমার ছাত্রজীবনের সহপাঠী হিসেবে তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেই সময় থেকেই তার মধ্যে ছিল নেতৃত্বের স্বাভাবিক দীপ্তি। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী, আত্মবিশ্বাসী, সাহসী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোশহীন। ভিড়ের রাজনীতিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি; বরং নিজের যোগ্যতা, দৃঢ়তা এবং কর্মতৎপরতার মাধ্যমে আলাদা একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন। ছাত্রদলের রাজনীতিতে তার সক্রিয় ভূমিকা এবং নেতৃত্বের সাহস তখনই প্রমাণ করেছিল— তিনি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এক সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
তানজীন চৌধুরী লিলির পথচলা কেবল রাজনীতির পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি একজন কৃতী ক্রীড়াবিদও। খেলাধুলার মাঠ তাকে শিখিয়েছে শৃঙ্খলা, অধ্যবসায়, সহনশীলতা, লড়াইয়ের মানসিকতা এবং বিজয় ছিনিয়ে আনার সাহস। একজন ক্রীড়াবিদের দৃঢ় মনোবল এবং একজন রাজনৈতিক কর্মীর আপোশহীন অবস্থান তার চরিত্রে একাকার হয়ে গেছে। এ কারণেই তার ব্যক্তিত্বে আমরা একসঙ্গে পাই মমতা ও দৃঢ়তা, মানবিকতা ও নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও সংগ্রামের এক অনন্য মেলবন্ধন।
তিনি যে রাজনীতি করেন, তা কেবল বক্তৃতার রাজনীতি নয়; এটি মাঠের রাজনীতি, মানুষের রাজনীতি, দুঃসময়ের রাজনীতি। প্রতিকূল সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তিনি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন—সুবিধার রাজনীতি নয়, বিশ্বাসের রাজনীতিই তার আসল শক্তি। যারা ঝড়ের দিনে পতাকা ধরে রাখতে পারেন, যারা ভয়কে জয় করে মানুষের পক্ষে দাঁড়ান, তারাই প্রকৃত নেতৃত্বের দাবিদার। তানজীন চৌধুরী লিলি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক সংগ্রামী নেত্রী।
নারী নেতৃত্বের প্রশ্নে তিনি আজ একটি শক্তিশালী নাম। তিনি শুধু নারীর প্রতিনিধিত্বের দাবিদার নন; তিনি নারীর সক্ষমতা, আত্মমর্যাদা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এক বাস্তব প্রতীক। দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক নিষ্ঠা, জনসম্পৃক্ততা এবং নেতৃত্বদানের সামর্থ্য তাকে জাতীয় সংসদে মহিলা এমপি হিসেবে মনোনয়নের জন্য একজন যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আজকের রাজনীতিতে প্রয়োজন শিক্ষিত, মাঠ ঘেঁষা, পরীক্ষিত, ত্যাগী এবং জনমুখী নেতৃত্ব। তানজীন চৌধুরী লিলির মধ্যে সেই সব গুণ বিদ্যমান। তিনি জানেন সংগঠন কীভাবে গড়ে তুলতে হয়, জানেন দুঃসময়ে কর্মীদের পাশে কীভাবে দাঁড়াতে হয়, জানেন জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে কীভাবে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হয়। তিনি শুধু একজন প্রার্থী নন; তিনি একটি প্রত্যাশা, একটি আস্থা, একটি সম্ভাবনার নাম।
আমি বিশ্বাস করি, তানজীন চৌধুরী লিলির মতো সাহসী, দক্ষ, রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব এবং সংগ্রামে পরীক্ষিত নারী নেতৃত্ব জাতীয় সংসদে গেলে নারীর ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্রের বিকাশ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জনকল্যাণের রাজনীতি আরও শক্তিশালী হবে। তার কণ্ঠস্বর হবে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর, তার অবস্থান হবে জনগণের পক্ষে, তার পথচলা হবে উন্নয়ন, মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পক্ষে।
তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, ছাত্রজীবনের নেতৃত্ব, ক্রীড়াবিদের মনোবল, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততা আজ তাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে এসেছে, যেখানে তাকে শুধু একজন নেত্রী হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের জন্য এক নির্ভরতার প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়।
তানজীন চৌধুরী লিলির জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা। তিনি যেন জাতীয় সংসদে মহিলা এমপি হিসেবে মনোনয়ন লাভ করেন, মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা নিয়ে আরও এগিয়ে যান, এবং রাজনীতি, সমাজ ও নারী জাগরণের ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন—এই প্রত্যাশাই করি।
লেখক : অনি আলমগীর-সাবেক ছাত্র, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]