
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়ের করা ভুয়া মামলার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। একটি মামলায় দাবি করা হয় ৪০টি গুলি করার কথা। অথচ তদন্তে মেলেনি একটি গুলিরও প্রমাণ। এমনকি জীবিত ব্যক্তিকেও দেখানো হয় মৃত। তবে ভুয়া মামলাগুলো শনাক্তে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে দাবি করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতন হয় আওয়ামী সরকারের। ৩৬ দিনের গণআন্দোলনের পর ৫ আগস্ট পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় হাজারের বেশি মানুষ, স্থায়ী পঙ্গু হয় আরও ২০ হাজারের বেশি জনতা।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর শুরু হয় জুলাই গণহত্যার বিচারের প্রক্রিয়া। কিন্তু সেইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে হতে থাকে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যক্তি পর্যায়ের মামলা। যেসব মামলা নিয়ে এরইমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে ব্যাপকভাবে।
ওই বছর ৪ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনে আহত হন রিমন। এমন অভিযোগে অভ্যুথানের পর মামলা করেন তার বাবা। অভিযোগ ছিল ৪০টি গুলি করা হয় তার ছেলে রিমনকে। কিন্তু তদন্তে মেলেনি একটি গুলিরও প্রমাণ। ধানমন্ডি এলাকায় জুলাই আন্দোলনের আরেক মামলায় অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি আহত ব্যক্তির। যাত্রাবাড়ীতে এক মামলায় জীবিত ব্যক্তিকে দেখানো হয়েছে মৃত। এসব তথ্য উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন বলেন, মামলার বাদী আদালতে এসে হলফনামা দিয়েছেন যে, তাকে আসামি করা হয়নি। তাহলে আসামি করেছেন কে, সেটারও কোনো হদিস পাচ্ছি না। বাদীই জানেন না আসামি কে দিয়েছেন! এমনকি আসামিকে পর্যন্ত বাদী চেনেন না।
আসামিপক্ষের আইনজীবী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে অনেককে এ মামলাগুলোতে জড়ানো হয়েছে। একই বিষয় নিয়ে একাধিক থানায় যেসব মামলার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো চার্জশিটে ফুটে উঠছে।’
শুধু পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তেই ১৬৫ মামলার মধ্যে ভুয়া শনাক্ত হয়েছে ৩১টি। বাকি ১১১টি মামলার ৯ হাজার ৬৯১ আসামির মধ্যে অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে ৩ হাজার ৭৭০ জনের বিরুদ্ধে। তবে প্রমাণ ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে দাবি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকীর। রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, ন্যায় বিচারের স্বার্থে বর্তমান সরকার ভুয়া মামলা শনাক্তে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
‘থানার কর্মকর্তাদের বলে দেয়া হয়েছে, অভিযোগের স্পষ্টতা না থাকলে তাকে গ্রেফতার করা যাবে না। যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাদেরকেই অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে’, যোগ করেন তিনি।
সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবাহ্ বলেন,নিরীহ মানুষকে ঢালাওভাবে গ্রেফতার করা এবং মামলা করলেই একটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা-- এই দুইটার কারণেই মামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে এটাকে একটা ব্যবসাও বানিয়ে নিয়েছে।
এদিকে, দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের প্রত্যাশায় যে জুলাই গণ-অভ্যুথান, সেই চেতনাই প্রশ্নবিদ্ধ হয় এসব ভুয়া মামলার মধ্য দিয়ে। এ ছাড়া, অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় প্রশাসন ও বিচার বিভাগ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি বলেও অভিযোগ তাদের।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘কোনো পুলিশের পক্ষে জুলাইয়ের মামলায় কাউকে অব্যাহতি দেয়া তার জন্য কঠিন হয়ে যায়। কারণ এখানে মবের একটা বিষয় আছে। থানায় আক্রমণ করা হয়, আদালতে আক্রমণ করা হয়।’
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]