
হজ মুসলিমের সংহতি এবং আল্লাহর কাছে তাদের আত্মসমর্পণের একটি বাহ্যিক প্রকাশ। ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ করা হয়েছে। তবে কারো হজে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তাকে হজের খরচ উপহার হিসেবে দেয়, তাহলে ওই হজ তার ফরজ হজ গণ্য হবে। সামর্থ্য হওয়ার পর নতুন করে হজ করা জরুরি নয়। একইভাবে সামর্থ্য থাকার পরও রাষ্ট্র, কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া টাকায় হজ করলে ফরজ হজ আদায় হয়ে যাবে। নিজের উপার্জিত টাকায় নতুন করে হজ করা জরুরি নয়।
তবে যদি কেউ ইচ্ছা করে ইহরাম বাঁধার সময় নফল হজ আদায়ের নিয়ত করে, তাহলে তার ফরজ হজ আদায় হবে না। তবে সাধারণ হজের নিয়তে করলে ফরজ হজই আদায় হবে।
হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিধানের অন্যতম। হজের মৌসুমে মক্কায় গিয়ে হজ করার আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য রয়েছে, এমন মুসলমানদের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা হজকে আবশ্যক ঘোষণা করে বলেছেন—
اِنَّ اَوَّلَ بَیۡتٍ وُّضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِیۡ بِبَكَّۃَ مُبٰرَكًا وَّ هُدًی لِّلۡعٰلَمِیۡنَ فِیۡهِ اٰیٰتٌۢ بَیِّنٰتٌ مَّقَامُ اِبۡرٰهِیۡمَ ۬ۚ وَ مَنۡ دَخَلَهٗ كَانَ اٰمِنًا ؕ وَ لِلّٰهِ عَلَی النَّاسِ حِجُّ الۡبَیۡتِ مَنِ اسۡتَطَاعَ اِلَیۡهِ سَبِیۡلًا ؕ وَ مَنۡ كَفَرَ فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِیٌّ عَنِ الۡعٰلَمِیۡنَ
‘নিশ্চয় প্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, তা মক্কায়। যা বরকতময় ও হেদায়াত বিশ্ববাসীর জন্য। তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহিম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ। আর যে কুফরি করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৯৬-৯৭)
হজে বিলম্ব নয়: সামর্থ্য থাকলে দ্রুত হজ পালনের তাগিদ
যাদের হজ পালনের সামর্থ্য রয়েছে, তাদের জন্য অযথা দেরি না করে দ্রুত হজ আদায় করা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। কারণ জীবন অনিশ্চিত—কখনো অসুস্থতা, কখনো আর্থিক বা পারিবারিক সমস্যা মানুষকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই হাদিসে হজ দ্রুত আদায়ের ব্যাপারে বিশেষভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
১. হজে বিলম্ব না করার নির্দেশ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ أَرَادَ الْحَجَّ فَلْيُعَجِّلْ فَإِنَّهُ قَدْ يَمْرَضُ الْمَرِيضُ وَتَضِلُّ الضَّالَّةُ وَتَعْرِضُ الْحَاجَةُ
‘যে ব্যক্তি হজের সংকল্প করে, সে যেন দ্রুত তা আদায় করে নেয়। কারণ সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে, প্রয়োজনীয় জিনিস হারিয়ে ফেলতে পারে বা কোনো জরুরি প্রয়োজন এসে যেতে পারে।’ (ইবনে মাজাহ ২৮৮৩)
২. পাঁচ বছর হজ না করলে গাফেল বান্দা
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُولُ إِنَّ عَبْدًا صَحَّحْتُ لَهُ جَسَدَهُ وَوَسَّعْتُ عَلَيْهِ فِي رِزْقِهِ يَمْضِي عَلَيْهِ خَمْسَةُ أَعْوَامٍ لَا يَأْتِينِي يَحُجُّ فَهُوَ مَحْرُومٌ
‘আমি যার শরীর সুস্থ রেখেছি এবং তার রিজিকে প্রশস্ততা দিয়েছি, সে যদি পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমার ঘরে হজ করতে না আসে, তবে সে বঞ্চিত ও হতভাগ্য।’ (ইবনে হিব্বান ৩৬৯৫)
৩. হজ না করে মৃত্যুবরণ করার ভয়াবহ পরিণতি
হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ لَمْ يَمْنَعْهُ مِنَ الْحَجِّ حَاجَةٌ ظَاهِرَةٌ أَوْ سُلْطَانٌ جَائِرٌ أَوْ مَرَضٌ حَابِسٌ فَمَاتَ وَلَمْ يَحُجَّ فَلْيَمُتْ إِنْ شَاءَ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا
‘যার সামনে কোনো সুস্পষ্ট প্রয়োজন, জালিম শাসকের বাধা বা অক্ষমতাজনিত রোগ ছিল না, তবুও সে হজ না করে মারা যায়—সে চাইলে ইহুদি হয়ে মরুক, চাইলে খ্রিস্টান হয়ে মরুক।’ (দারেমি ১৮২৬)
উল্লিখিত হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট যে, হজের সামর্থ্য অর্জনের পর তা বিলম্ব করা উচিত নয়। কারণ মৃত্যু, অসুস্থতা বা বিভিন্ন বাধা যেকোনো সময় এসে যেতে পারে। তাই একজন মুসলমানের উচিত সামর্থ্য অর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই হজ পালনের প্রস্তুতি নেওয়া এবং আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া। হজ শুধু একটি ইবাদত নয়—এটি জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]