
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেসংযুক্তি; নাকি বিচ্ছিন্নতা—কোনটি বেশি ফলপ্রসূ, সেই পুরোনো বিতর্কটিকে আবার উস্কে দিয়েছে একজন উপদেষ্টার ইন্ডিয়ান ওশান রিম (IOR) কনফারেন্সে যোগ না দেওয়ার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে । এই ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে বাস্তবসম্মত জাতীয় স্বার্থের চেয়ে কেবল প্রতীকী প্রতিবাদ বা আবেগকে বেশি প্রাধান্য দেয়াহচ্ছে কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে ।
ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একটি অবিবেচক সুলভ সিদ্ধান্তের কারনে ২০২৫ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। আসিফ নজ্রুলের সেই অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত লাখ লাখক্রিকেটপ্রেমীর আবেগ এবং বিশ্বমঞ্চে লড়ার জন্য খেলোয়াড়দের স্বপ্ন টাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলো । খেলাধুলা, অ্যাকাডেমিক অঙ্গন বা কূটনীতি—ক্ষেত্র যেখানেই হোক না কেন, মূল প্রশ্নটা কিন্তু একই: অংশগ্রহণ না করে মুখ ফিরিয়ে নিলে কি দেশের অবস্থান শক্তিশালী হয়, নাকি আন্তর্জাতিক দরবারে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগটাই হাতছাড়া হয়?
বয়কটের মাশুল কিন্তু শুধু সরকার দেয় না, বরং দেয় সাধারণ মানুষ। অ্যাথলেটরা খেলার সুযোগ হারায়, গবেষকরা জ্ঞান বিনিময়ের প্ল্যাটফর্ম থেকে বঞ্চিত হন এবং রাষ্ট্র তার প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নষ্ট করে । কোনো আলোচনা, টুর্নামেন্ট বা সংলাপে অংশ নেওয়ার মানেই কিন্তু আয়োজক দেশের সব নীতিকে সমর্থন করা নয়। বরং এটি নিজের দেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থকে তুলে ধরার একটা বড় সুযোগ। ঠিক এই কারণেই আইওআর (IOR) কনফারেন্সে যোগ নাদেওয়ার সিদ্ধান্তটি কত টুকু সমীচীন হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য, যোগাযোগ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও জলবায়ু সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের এক টেবিলে আনতেই এই ফোরাম।
এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অংশীজন (stakeholder) হিসেবে বাংলাদেশের অবশ্যই উচিত ছিল এই আলোচনায় নিজের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরা।কূটনীতির মূল ভিত্তিই হলো সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখা। একজন কূটনীতিকের দায়িত্ব কেবল চটকদার সিদ্ধান্ত বা আবেগকে প্রতিফলিত করা নয়, বরং দেশের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বার্থ যেখানে লুকিয়ে আছে, সেই সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো।একটি জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিষয়টি বোঝানো যেত যে, আয়োজক দেশের সাথে মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশ নিলে নিজের নীতি বিসর্জন দেওয়া হয় না। বরং নিজের
অবস্থানের পক্ষে দৃঢ় যুক্তি দেওয়ার আত্মবিশ্বাসই প্রকাশ পায়। এই সম্মেলনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান তুলে ধরতে পারত, আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার করতে পারত এবং নিজের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে এমন আলোচনায় নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারত। এক্ষেত্রে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন এই বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের বোঝানোর ক্ষেত্রে কত টুকু সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে তা খতিয়ে দেখা যেতেই পারে।
এই কথাও অস্বীকারের যো নেই, ভারতীয় পক্ষও ডা. জাহেদ উর রহমানের বিষয়টি আরও সংবেদনশীলতার সাথে সামলাতে পারত। যদিও তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্টের পরিবর্তে ব্যক্তিগত পাসপোর্টে ভ্রমণ করছিলেন, তবুও তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা এবং সেই অনুযায়ী কিছুটা সৌজন্য ও সমীহ তার প্রাপ্য ছিলো ।
প্রশাসনিক ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া অবশ্যই মেনে চলতে হবে, তবে বিদেশি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে একটু বিচক্ষণতার পরিচয় দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো যায়। এটাও ঠিক যে, বিষয়টি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে আসার ১-২ ঘণ্টার মধ্যেই ইমিগ্রেশনের জটিলতা মিটে গিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে জল অনেক দূর গড়িয়েছে। শুরুতেই সমন্বয় ও সংবেদনশীলতার অভাব থাকলে কীভাবে ছোট প্রশাসনিক বিষয়ও বড় বিতর্কে রূপ নেয়—এটি তারই প্রমাণ।
যখন বাস্তবসম্মত সমাধানের চেয়ে ব্যক্তিগত জেদ বড় হয়ে ওঠে, তখন সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও বড় সংকটের রূপ নেয়। যে বিষয়টি খুব সহজেই মিটে যেতে পারত, তা এখন প্রকাশ্য বিতর্কের বিষয়। অথচ সমস্যাটি যেভাবে দ্রুত সমাধান করা হলো, তা প্রমাণ করে যে একটি গঠনমূলক সমাধান শুরু থেকেই সম্ভব ছিল। কূটনীতি ও পেশাদারিত্বের মূল চাবিকাঠি হলো যোগাযোগ ও নমনীয়তা; ব্যক্তিগত অহংকার বা মতভেদকে জাতীয় স্বার্থের ওপরে স্থান দেওয়া কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এক্ষেত্রে দুই দেশের মন্ত্রণালয় কেই আরো সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন ছিলো ।
ইতিহাসে আমরা অন্যরকম উদাহরণও দেখতে পাই । সাম্প্রতিক সময়ে নানামুখী আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান কিন্তু বড় বড় ক্রীড়া আসর থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়নি, বরং অংশগ্রহণকেই বেছে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে চলমানফিফা বিশ্বকাপেও ইরানের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, তারা বিশ্বমঞ্চ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার চেয়ে লড়াই করে টিকে থাকায় বিশ্বাসী। ইরানের এই সংকল্প বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। দেশটির রাজনীতির সাথে কেউ একমত হোন বা না হোন, অনুপস্থিতির চেয়ে মাঠের লড়াইকে বেছে নেওয়া ইরানি খেলোয়াড়দের সাহসিকতাকে সবাই সম্মান জানিয়েছে।
মাঠে নেমে তারা দেখিয়েছে যে, শত প্রতিকূলতা ও মতভেদের মাঝেও বিশ্বমঞ্চে লড়াই করার মতো আত্মবিশ্বাস ও যোগ্যতা তাদের আছে। ফুটবল মাঠের এই শিক্ষা বৈশ্বিক রাজনীতির জন্যও সমান সত্য। যেসব দেশ বৈশ্বিক ফোরাম, খেলাধুলা বা অ্যাকাডেমিক এক্সচেঞ্জে অংশ নেয়, তারা আসলে নিজেদের পরিপক্বতা ও আত্মবিশ্বাসই জানান দেয়। তারা আলোচনা আর যুক্তির টেবিলে নিজেদের স্বার্থরক্ষা করতে জানে। আর যারা মাঠ ছেড়ে পালায়, তারা প্রকারান্তরে নিজেদের প্রভাব ওদৃশ্যমানতা দুটোই হারায়।
পরিশেষে এই কথা বলা যায় যে সাহসিকতা মাঠ ছাড়ায় নয়, বরং মাঠে টিকে থেকে লড়াই করার মাঝেই বিদ্যমান মুখ ফিরিয়ে নেওয়াকে অনেক সময় নীতিগত অবস্থান বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু বাস্তবে এটা আলোচনার টেবিল থেকে পালিয়ে যাওয়ার শামিল। অংশগ্রহণের জন্য আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন হয়, আর বয়কটের জন্য প্রয়োজনকেবল মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। নিজের আদর্শ ও যুক্তিতে যারা অটল, তাদের অন্যের মুখোমুখি হতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি উন্মুক্ততা, বাস্তববাদিতা ও গঠনমূলক অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোতে অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা আর কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আজকের এই মর্যাদা। তাই যোগাযোগ ও অংশগ্রহণের সুযোগ হাতছাড়া করার মতো যেকোনো সিদ্ধান্ত দেশেরএই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। আজকের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করতে হলে মাঠে উপস্থিত থাকতে হয়, অংশ নিতে হয় এবং নিজের যুক্তি তুলে ধরতে হয়। খেলাধুলা, কূটনীতি বা শিক্ষা—ক্ষেত্র যাই হোক না কেন, নিজে থেকে অনুপস্থিত থাকার চেয়ে টেবিলে থাকাটাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও যারা লড়াই, বিতর্ক ও অবদান রাখা চালিয়ে যায়, তারা একটি চিরন্তন সত্যই মনে করিয়ে দেয়: মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার মধ্যে কোনো বীরত্ব নেই, বীরত্ব আছে মাঠে থেকে নিজের আওয়াজটা দুনিয়াকে শোনানোর মধ্যে।
(লেখক: কলামিস্ট ও অ্যাকটিভিস্ট)
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]