
দুনিয়াতে দুই ধরনের মানুষ আছে। অধিকাংশ মানুষ ইতিহাসের সাক্ষী হন, আর কিছু মানুষ ইতিহাস তৈরি করেন। প্রথম দলের মানুষ সময়ের স্রোতে ভেসে যান, দ্বিতীয় দলের মানুষ সময়কে বদলে দেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সেই বিরল ক্ষণজন্মাদের একজন, যিনি ইতিহাসের দর্শক ছিলেন না; ছিলেন ইতিহাসের নির্মাতা।
তাঁর মৃত্যুতে একজন রাজনৈতিক নেতার প্রস্থান ঘটেছে, এভাবে বললে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ তোফায়েল আহমেদ শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য একটি অধ্যায়। তিনি ছিলেন উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মহানায়ক, বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম নির্মাতা।
আজ তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে শুধু একজন মানুষের কথা মনে পড়ে না; মনে পড়ে একটি সময়ের কথা। মনে পড়ে সেই উত্তাল রাজপথ, যেখানে তরুণেরা বুকের রক্ত দিয়ে ইতিহাস লিখেছিল। মনে পড়ে পাকিস্তানি অপশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে সেই স্বপ্নের কথা, যে স্বপ্নের নাম ছিল ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’।
তোফায়েল আহমেদের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, তিনি ক্ষমতার রাজনীতির আগেই ইতিহাসের রাজনীতির মানুষ ছিলেন। তিনি মন্ত্রী হওয়ার আগে নেতা ছিলেন, নেতা হওয়ার আগে সংগ্রামী ছিলেন, আর সংগ্রামী হওয়ার আগে ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা তরুণ। যে তরুণ বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেই আন্দোলন না হলে হয়তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পথও এত দ্রুত তৈরি হতো না। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ। তিনি শুধু মিছিলের সামনে ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের সাহসের প্রতীক।
ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়। কিন্তু কিছু নাম কখনও মুছে যায় না। কারণ সেই নামগুলো একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়। তোফায়েল আহমেদ তেমনই একটি নাম।
আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, পাকিস্তানি সামরিক শাসনের সেই ভয়ংকর সময় কেমন ছিল। তখন সত্য বলা ছিল অপরাধ। প্রতিবাদ করা ছিল অপরাধ। বাঙালি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো ছিল অপরাধ। কিন্তু সেই ভয়ংকর সময়েই কিছু তরুণ ভয়কে অস্বীকার করেছিলেন। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তাদের একজন।
জীবিত তোফায়েল আহমেদকে ভয় পেত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। কারণ তারা জানত, এই মানুষটিকে কারাগারে রাখা যায়, কিন্তু তার বিশ্বাসকে বন্দি করা যায় না। তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করা যায়, কিন্তু তার স্বপ্নকে হত্যা করা যায় না। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। ইতিহাস কখনও বন্দি হয় না।
আজ যখন তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসে। কেন ইতিহাসের কিছু মানুষকে মৃত্যুর পরও ভয় পায় তাদের বিরোধীরা? এর উত্তর খুঁজতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ঘাতকেরা শুধু একজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করেনি; তারা একটি আদর্শকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ মানুষকে হত্যা করা যায়, আদর্শকে নয়। শরীরকে মাটির নিচে শুইয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু স্মৃতিকে নয়। তোফায়েল আহমেদের ক্ষেত্রেও সেই একই সত্য প্রযোজ্য।
কারণ তিনি শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একজন ধারক। তিনি ছিলেন এমন এক ইতিহাসের প্রতিনিধি, যে ইতিহাস বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি করেছে।
আজকের বাংলাদেশকে দেখলে কখনও কখনও প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি? যে বাংলাদেশে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করা হবে না। যে বাংলাদেশে আইন হবে সবার জন্য সমান। যে বাংলাদেশে শিশু নিরাপদ থাকবে, নারী নিরাপদ থাকবে, মানুষ নিরাপদ থাকবে।
আমরা কি সেই পথে এগোচ্ছি?
নাকি আমরা ক্রমশ এমন একটি সমাজ নির্মাণ করছি, যেখানে মানুষ ভয়ে ভয়ে কথা বলে, ভয় নিয়ে লেখে, ভয় নিয়েই প্রতিবাদ করে? গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ভয়। কারণ ভয় মানুষকে নীরব করে দেয়। আর যখন মানুষ নীরব হয়ে যায়, তখন অন্যায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তোফায়েল আহমেদের প্রজন্ম আমাদের শিখিয়েছিল—ভয়কে জয় করতে হয়। তাঁরা জানতেন, প্রতিবাদের মূল্য আছে, সংগ্রামের মূল্য আছে, কারাগারের মূল্য আছে। তাঁরা পিছিয়ে যাননি। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন স্বাধীন বাতাসে শ্বাস নেবে।
আজ সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমরা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই দায়িত্ব পালন করছি? আমরা কি ইতিহাসকে শুধু স্মরণ করছি, নাকি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছি? কারণ ইতিহাস মুখস্থ করার বিষয় নয়। ইতিহাস হলো দায়িত্ব গ্রহণ করার বিষয়। তোফায়েল আহমেদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। তিনি কখনও নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে থাকেননি। যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয়েছে, তিনি দাঁড়িয়েছেন। যখন জনগণের পাশে থাকার প্রয়োজন হয়েছে, তিনি থেকেছেন। এই কারণেই তাঁর জীবন রাজনৈতিক জীবনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
আজ তাঁর মৃত্যুর পর লাখো মানুষ কাঁদছে। কিন্তু প্রকৃত শ্রদ্ধা চোখের জল দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। প্রকৃত শ্রদ্ধা হলো সেই মূল্যবোধগুলোকে ধারণ করা, যেগুলোর জন্য তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন।
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের প্রতি আজ তাই সবচেয়ে বড় আহ্বান হলো, ইতিহাসকে জানো। কারণ ইতিহাস না জানলে মানুষ সহজেই প্রতারণার শিকার হয়। ইতিহাস না জানলে মানুষ স্বাধীনতার মূল্য বুঝতে পারে না। ইতিহাস না জানলে মানুষ বারবার একই ভুল করে।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কোনো দুর্ঘটনার ফল নয়। এই দেশ লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। এই রাষ্ট্রের পেছনে আছে অগণিত মানুষের ত্যাগ, সংগ্রাম এবং স্বপ্ন। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সেই স্বপ্নের একজন বাহক। আজ তিনি নেই। কিন্তু ইতিহাসের কিছু মানুষ কখনও সত্যিকার অর্থে চলে যান না। তারা থেকে যান মানুষের স্মৃতিতে। থেকে যান জাতির চেতনায়। থেকে যান সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে। তোফায়েল আহমেদও সেভাবেই বেঁচে থাকবেন।
যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন তাঁর নাম উচ্চারিত হবে। যতদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা হবে, ততদিন তাঁর অবদান স্মরণ করা হবে। যতদিন উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের কথা বলা হবে, ততদিন তাঁর নেতৃত্বের কথা বলা হবে। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাবানদের মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে যারা জাতির জন্য অবদান রাখে তাদের। আজ তাই গভীর বেদনায়, কিন্তু একই সঙ্গে গভীর গর্ব নিয়ে বলতে চাই—বিদায়, তোফায়েল আহমেদ। আপনি চলে গেছেন, কিন্তু আপনার সময় শেষ হয়নি। আপনার কণ্ঠ থেমে গেছে, কিন্তু আপনার ইতিহাস এখনও কথা বলে। আপনার শরীর মাটির নিচে শায়িত হবে, কিন্তু আপনার সংগ্রাম বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবে। আর হয়তো এটাই একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা—মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম নির্মাতা তোফায়েল আহমেদ—আপনাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা এবং শেষ বিদায়। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, স্বাধীনতার ইতিহাস যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে আপনার নাম।
বিদায়, ইতিহাসের এক নির্মাতা।
বিদায়, তোফায়েল আহমেদ।
লেখক : এফ এম শাহীন, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]