
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের এক মাস পূর্ণ হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই যুদ্ধ ও সংঘাত শুধু মাত্র ইরানে মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। এই এক মাসে পুরো অঞ্চলে কয়েক হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে একের পর এক এলাকা, হাজারো পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে বসেছে। যুদ্ধের এক মাস পূর্তিতে শুক্রবার জাতিসংঘের এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানি রেড ক্রিসেন্টের প্রতিনিধিদলের প্রধান মারিয়া মার্টিনেজ জানিয়েছেন, "ইরানজুড়ে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ধসে পড়া ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা চলাকালীন অনেক উদ্ধারকর্মী নিজের পরিবারের সদস্যদের নিথর দেহ দেখতে পান।"
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, "এক মাসের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে এমন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং নিহতের সংখ্যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের ওপর এর প্রভাব মারাত্মক।" সংঘাতের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিকাঠামোও ধ্বংসপ্রাপ্ত। স্কুল, হাসপাতাল, বাড়িঘর ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানালেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দালালরা এই বিষয়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নাই। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই সংঘাত ও যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও তেলের বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন হয়ে শুধু মাত্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছেন।
যুদ্ধকালীন অবস্থার চেয়ে যুদ্ধ–পরবর্তী পরিস্থিতি সকল সময়ই ভয়াবহ হয়ে উঠে। কেবল যুদ্ধে জড়ানো দেশের জন্যই নয়, সারা বিশ্বের জন্যই এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সভ্যতার সংকট সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখে এই যুদ্ধ। হয়ে ওঠে নীরব আততায়ী। ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধও এর থেকে আলাদা কোন বিষয় নয়। ইরানে চলমান এই সংঘাত কেবল সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বড় মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। শিশুদের মৃত্যু ও বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করছে। অথচ, আমাদের এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে, বিশ্ব কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই সংকট সমাধানে ভূমিকা পালন করে। সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রেড ক্রিসেন্ট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় ও এই ‘নগ্ন লঙ্ঘনের’ ঘটনায় নীরব না থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত আগ্রাসী বাহিনীর সাথে ইরানের সর্বাত্মক যুদ্ধ এক মাস অতিবাহিত হলেও এ রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক সংঘাত বন্ধে আন্তর্জাতিক কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যার ফলশ্রুতিতে এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যদি বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সত্যি সত্যি যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পুরো বিশ্বকেই এই যুদ্ধের ভয়াবহ ফলাফল ভোগ করতে হবে। তাই দ্রুততম সময়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কোন বিকল্প নাই।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জায়নবাদ (উগ্র ইহুদি মতবাদ) জাতীয়তাবাদ মুসলিম বিশ্বে অস্থিতিশীলতার চালিকাশক্তি এবং মানবতার জন্য হুমকি। তারাই ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। জায়নবাদী শক্তিই মুসলিম বিশ্বের অস্থিতিশীলতার মূল চালিকাশক্তি এবং ‘মানবতার জন্য হুমকি’। ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইসলামী বিশ্বের ওপর যে প্রতিটি বিপর্যয় নেমে এসেছে, যে প্রতিটি যুদ্ধ তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, সেসবের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জায়নবাদী মতাদর্শ ও রাষ্ট্রের মদদ রয়েছে এত কোন সন্দেহের অবকাশ নাই।
ফিলিস্তিনের গাজায় মার্কিন মদদে ইসরাইলী হামলায় সেখানকার মানুষ যখন দিশাহারা, যখন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে কাটছে তাদের মানবেতর জীবন। ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে শিশুরা। এরই মাঝে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ সৃষ্টি করেছে নতুন সংকটের। এই যুদ্ধের সম্ভাব্য বিস্তার শুধু দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না—এটা ইতিমধ্যে হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণ। ইতিহাস সাক্ষী, পারমাণবিক বা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারে ক্ষতির রেশ থেকে যায় শত বছর ধরে। তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আর যুদ্ধ নয়’ কবিতার শুরুর দুটো লাইন: ‘কার দিকে তুমি গুলি ছুঁড়ছো হে, এখানে সবাই মানুষ!/ তুমি কে, তুমি কি গ্রহান্তরের দলছুট?’
প্রশ্ন উঠেছে ইরানের উপর যে অনৈতিক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এই যুদ্ধে কি ইরান পরাজিত হবে ? স্পষ্ট উত্তর—না। তাহলে কি এই যুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরাইল পরাজিত হবে? তারও উত্তর কিন্তু—না। যুদ্ধটি অসম হলেও এই যুদ্ধে কোনো পক্ষেরই চূড়ান্ত বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে। সমরাস্ত্রের দিক থেকে আমেরিকা ও ইসরাইল অবশ্যই ইরানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও অগ্রসর। কিন্তু, তারপরও এটি সত্য যে, এই যুদ্ধে আমেরিকা বা ইসরাইল সহজে বিজয়ী হবার সম্ভাবনা নাই। এর প্রধান কারণ—তারা আক্রমণ করছে এমন একটি দেশকে, যার নাম ইরান। ইতিহাস বলে, এই ইরান বা পারস্য কখনো সহজে কারো কাছে মাথা নত করে না, পরাভূতও হয় না। পাঁচ সহস্রাধিক বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে ইরানের। পারস্যের বীরত্বগাঁথা সারা বিশ্বেই সমাদৃত। মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা এক আত্মমর্যাদাশীল জাতি হলো ইরান। আর এই যুদ্ধে সর্বশেষ ফলাফল হতে পারে, যুদ্ধে ইরানকে যদি পরাজিত করা না যায়, তবে খুব শিগ্গিরই ইরান পারমাণবিক শক্তি অর্জনের পথে আরও অগ্রসর হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে এটি মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হতে বাধ্য। আর ইরান যদি পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইসরাইলের প্রভাব-প্রতিপত্তি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে বাধ্য হবে।
এই সংঘাত ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোন সুযোগ নাই। বহু বছর ধরে চলা অবিশ্বাস, নিষেধাজ্ঞা, প্রক্সি যুদ্ধ, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার যে জমাট বাস্তবতা, সেটিই আজ বিস্ফোরণের রূপ নিয়েছে মাত্র। তাই প্রশ্ন হচ্ছে এ হামলা কি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, নাকি আরও গভীর অস্থিতিশীলতার সূচনা করবে? ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর ভয়াবহতা বিশ্বের প্রায় সকলবেই বহন করতে হবে। এই যুদ্ধ শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎকেও বিপর্যস্ত করে তুলবে। দূষিত পরিবেশ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও খাদ্যসংকটে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ থেমে যাবে। ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানী, লেখক, চিকিৎসক কিংবা কৃষক—সবই যেন এক অনিশ্চিত অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারে। চলমান এ সংঘাত আমাদের একটি মৌলিক সত্য আবার মনে করিয়ে দেয়, আর তা হলো- নিরাপত্তা কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জিত হয় না; বরং আস্থা, সংলাপ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যুদ্ধ কখনোই স্থায়ী সমাধান দেয় না; এটি কেবল নতুন সমস্যার জন্ম দেয়।
লেখক : মিতা রহমান (যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন)
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]