
“Early to bed and early to rise, makes a man healthy, wealthy and wise”—বহুল প্রচলিত এই প্রবাদটি কেবল ব্যক্তিগত জীবনের শৃঙ্খলার কথাই বলে না; এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সময় ব্যবস্থাপনা, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের এক গভীর দর্শন। ইসলামের দৃষ্টিতেও দিনের শুরুতে কাজ করাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনে বর্ণিত আছে-“আমি তোমাদের ঘুমকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী এবং রাতকে করেছি আবরণস্বরূপ। আর দিনকে করেছি জীবিকা অর্জনের সময়।” (সূরা নাবা, আয়াত: ৯–১১)। অর্থাৎ মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা এমন হওয়া উচিত যেখানে রাত বিশ্রামের জন্য এবং দিন কর্মের জন্য। আসলে সকালকে বরকতময় সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় আধুনিক নগরজীবনের প্রভাবে এই চর্চা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। গ্রাম হোক বা শহর, সবখানেই এখন দেরিতে ঘুমানো এবং দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার প্রবণতা বাড়ছে। অথচ বিশ্বের বহু উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে উঠে দিনের কাজ শুরু করে।
জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে যেমন সকালবেলা অফিস শুরু করার প্রচলন রয়েছে, তেমনি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেপাল, চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশেও দিনের কাজ শুরু হয় বেশ সকালে।
প্রায় দুই দশক আগে বাংলাদেশের মানুষও সকালে তাদের দৈনন্দিন কাজ শুরু করত। কিন্তু বিদ্যুৎসংযোগের বিস্তার, ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং রাতকেন্দ্রিক নগর সংস্কৃতির প্রসারের ফলে এখন গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের জেগে থাকার প্রবণতা বেড়েছে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত এবং বিশেষ করে দোকানপাট ও বিপণিকেন্দ্রগুলো দেরিতে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ফলশ্রুতিতে, প্রাকৃতিক আলো থাকা সত্ত্বেও দিনের একটি বড় অংশ আমরা কার্যত অপচয় করি এবং রাত্রে বিদ্যুতের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করি। অনেক সময়উৎসব বা বাণিজ্যিক প্রচারণার নামে বিপণিকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত আলোকসজ্জাও করা হয়, যা বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতিতে এই অভ্যাস পরিবর্তন করা সময়ের দাবি। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সংঘাত, বিশেষ করে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ- বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হলো জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস। সংঘাত ও হামলা-পাল্টা হামলার কারণে অনেক তেল ও গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উৎপাদন পুনরুদ্ধারে সময় লাগছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ বেড়েই চলছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক, কারণ দেশের জ্বালানির বড় একটি অংশই আমদানিনির্ভর এবং তার উল্লেখযোগ্য অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশ থেকে।
এই বাস্তবতায় “ডে-লাইট সেভিং” বা দিনের আলো সঞ্চয়ের ধারণা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশ গ্রীষ্ম ও বসন্তকালে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দিয়ে দিনের আলোকে বেশি ব্যবহার করার ব্যবস্থা চালু রাখে। সাধারণত মার্চ বা এপ্রিল মাসে ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়ে নেয় এবং অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে আবার এক ঘণ্টা পিছিয়ে দিয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশের মানুষের জন্য হঠাৎ করে ঘড়ির সময় পরিবর্তন করে সময় ব্যবস্থাপনা সহজে গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু ঘড়ির সময় পরিবর্তন না করেও আমরা একই লক্ষ্য অর্জন করতে পারি। যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত এবং দোকানপাট এক থেকে দেড় ঘণ্টা আগে তাদের কার্যক্রম শুরু করে, তবে তা সহজেই বাস্তবায়নযোগ্য হতে পারে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে সকালে আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত শীতল থাকে, ফলে সকালবেলা কাজ শুরু করা মানুষের জন্য আরও সুবিধাজনক হতে পারে। এ ধরনের সময়সূচি পরিবর্তন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশে শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮,৯১৯ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে পিক সময়ে উৎপাদনের পরিমাণ সাধারণত প্রায় ১৪,০০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি থাকে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়ে যায়।
এক দিনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ দেশের মোট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৩,৬২১ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে উৎপাদন করা হয়েছিল প্রায় ১৩,৬০০ মেগাওয়াট। এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি উৎসের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি ছিল ৪২.৭৯ শতাংশ, কয়লা ২৬.৭৭ শতাংশ, তেল ২২.৪৭ শতাংশএবং নবায়নযোগ্য উৎস (যেমন- সৌর, জলবিদ্যুৎ ও বায়ু) ছিল মাত্র ৩.৭৬ শতাংশ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে হিসাব করলে দেখা যায়, ওই দিনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৮৯ কোটি টাকা। উৎসভিত্তিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে কয়লার জন্য প্রায় ৬৭.২৩ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে তেলের জন্য প্রায় ৪৬.০৬ কোটি টাকা। এছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৬.৮ কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎ আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৩.১১ কোটি টাকা।
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি, কয়লা এবং তেলই প্রধান জ্বালানি উৎস হিসেবেব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে তেল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর এবং কয়লার বড় অংশও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তার সরাসরি প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির উপর বর্তাবে।
এই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপচয় রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। দিনের প্রাকৃতিক আলোকে বেশি কাজে লাগিয়ে এবং রাতের কৃত্রিম আলোর ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে আনতে পারলে বিদ্যুৎ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব। সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবহারে যদি মাত্র ১০ শতাংশ সাশ্রয় করা যায়, তবে বছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে- যা বিদ্যুৎ খাতে পুনর্বিনিয়োগ অথবা ভর্তুকি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে শুধু সরকারি নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জনসচেতনতা এবং সক্রিয় সামাজিক অংশগ্রহণ। জনগণের মধ্যে যদি এই বিশ্বাস তৈরি করা যায় যে সাশ্রয়কৃত অর্থ আবার জনগণের কল্যাণেই ব্যবহৃত হবে, যেমন বিদ্যুতের ভর্তুকি, অবকাঠামো উন্নয়ন বা মূল্য স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে তাহলে মানুষ আরও দায়িত্বশীলভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে। তবে এইলক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য নিচের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে—
১. দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরুর সময় সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
২. দোকানপাট, বিপণিকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার নীতিমালা গ্রহণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা সীমিত করা যেতে
পারে।
৩. বিদ্যুৎ সাশ্রয় বিষয়ে জাতীয় সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করে গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
৪. নতুন ভবনের নকশায় প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং সৌর প্যানেল স্থাপনকে উৎসাহিত বা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
৫. নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধান জোরদার করতে হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নয়; বরং বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার এবং সময় ব্যবস্থাপনার মধ্যেও এর গুরুত্বপূর্ণ সমাধান নিহিত রয়েছে। দিনের প্রাকৃতিক আলোকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে যদি শিক্ষা, বাণিজ্য ও সামাজিক কার্যক্রমের সময়সূচিতে সামান্য পরিবর্তন আনা যায়, তবে তা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি জাতীয়অর্থনীতিকেও সহায়তা করবে। তাই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় দিনের আলো সঞ্চয় কার্যক্রমে সর্বসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত।
লেখক: মো. ওয়াকিলুর রহমান (প্রফেসর, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]