
আজ ২৬ জুন। দেশের আলোচিত লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলাধীন দহগ্রামআঙ্গরপোতাবাসীর জন্য একটি ঐতিহাসিক ও আনন্দের দিন। এই দিনে দহগ্রাম- আঙ্গরপোতা ছিটমহলের মানুষের চলাচলের জন্য তিনবিঘা করিডোর খুলে দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ ৩৪ বছর পরও করিডোরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ১৯৭৪ সালের চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
পাটগ্রাম উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তিনবিঘা করিডোর। স্বাধীনতার পর ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ছিটমহল ছিল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথ ছিল এই করিডোর, যা ব্যবহারে দীর্ঘদিন নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়েছে স্থানীয়দের।
১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী তিনবিঘা করিডোরের দৈর্ঘ্য ১৭৮ মিটার ও প্রস্থ ৮৫ মিটার হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দহগ্রামবাসী ব্যবহার করতে পারেন মাত্র ৯ ফুট প্রশস্ত একটি সড়ক। প্রায় ২২ হাজার মানুষের যাতায়াত এই সরু পথের ওপর নির্ভরশীল।
করিডোরজুড়ে রয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিএসএফের চেকপোস্ট, সিসিটিভি ক্যামেরা, অবজারভেশন টাওয়ার ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে দিয়েই চলাচল করতে হয় স্থানীয়দের।
বর্তমান ৯ ফুট প্রশস্ত সড়কে চার বা ছয় চাকার যানবাহন প্রবেশ করলে অন্য সব যানবাহনকে দহগ্রাম বা পানবাড়ী পোস্টে অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া করিডোরের দুই পাশে লাইটপোস্ট ও ফুলের টব বসানোর কারণে সড়কটি আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে যানবাহনের সঙ্গে ভারতীয় স্থাপনার সামান্য ক্ষতি হলেও বাংলাদেশিদের নানা ধরনের হয়রানি ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তর করলেও তিনবিঘা করিডোরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আজও বাংলাদেশের হাতে আসেনি। রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক জটিলতার কারণে ভারত এখনো করিডোরের মালিকানা হস্তান্তর করেনি।
পরবর্তীতে ২০১১ সালে দুই দেশের চুক্তির মাধ্যমে করিডোরটি ২৪ ঘণ্টা চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এর আগে প্রতিদিন মাত্র ১২ ঘণ্টা করিডোর ব্যবহার করা যেত। যদিও বর্তমানে সার্বক্ষণিক চলাচলের সুযোগ রয়েছে, তবুও করিডোরের গেট ও নিয়ন্ত্রণ এখনো ভারতের অধীনেই রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক রেজানুর রহমান রেজা বলেন, ‘১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতকে দেওয়া হলেও আমরা তিনবিঘা করিডোরের পূর্ণ অধিকার পাইনি। দীর্ঘ আন্দোলনের পরও চুক্তির বাস্তবায়ন হয়নি। কৃষি ও পশুপালননির্ভর মানুষের চলাচলেও এখনো নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। আমরা পূর্ণ স্বাধীনতা চাই।’
দহগ্রামের বাসিন্দা আব্বাস আলী বলেন, ‘আগে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত করিডোর খোলা থাকত। রাতের বেলায় মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হতো না। এখন ২৪ ঘণ্টা চলাচলের সুযোগ থাকলেও করিডোর এখনো ভারতের নিয়ন্ত্রণে। আমরা চুক্তি অনুযায়ী এর পূর্ণ স্বাধীনতা চাই।’
দহগ্রামের বাসিন্দা রুনা আখতার বলেন, ‘বিএসএফের কোনো ভিআইপি এলে তিনবিঘা করিডোরের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এভাবে দহগ্রামবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
প্রতিবছরের মতো এবারও ২৬ জুন দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা মুক্ত দিবস উপলক্ষে সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে র্যালি, আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহ:রাশেদুল হক প্রধান জানান, বর্তমান সরকার পিছিয়ে পড়া জনপদগুলোর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। নানা ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে এসব এলাকায় কি কি ঘাটতি রয়েছে তা পূরণ করা হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতকে বার্ষিক এক টাকা খাজনা দেওয়ার শর্তে ৯৯ বছরের জন্য তিনবিঘা করিডোর ইজারা নেয়। পরে সেই খাজনা আড়াই টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে শুরু থেকেই বাংলাদেশিরা মাত্র ৯ ফুট প্রশস্ত একটি সড়ক ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। চুক্তি অনুযায়ী করিডোরের ভেতরে কোনো পক্ষ স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। কিন্তু বিএসএফ করিডোরের দুই প্রান্তে চেকপোস্ট নির্মাণ করেছে। স্থানীয়দের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী করিডোরের নিয়ন্ত্রণ বিজিবির হাতে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটি কার্যকর হয়নি।
বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]