আশুরার ফজিলতপূর্ণ হওয়ার কারণ
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ১১:১২
আশুরার ফজিলতপূর্ণ হওয়ার কারণ
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহাররম। এটি আল্লাহ তাআলার সম্মানিত চার মাসের অন্যতম। এ মাসের ১০ তারিখ, যা ইয়াওমু আশুরা নামে পরিচিত, ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ একটি দিন। এ দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আল্লাহর সাহায্য, সত্যের বিজয়, জুলুমের পরাজয়, কৃতজ্ঞতার শিক্ষা এবং ইবাদতের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।


রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার দিনের রোজাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এর জন্য মহান প্রতিদানের সুসংবাদ দিয়েছেন। ফলে আশুরা মুসলিম উম্মাহর কাছে শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিবাহী দিন নয়; বরং এটি শিক্ষা, উপলব্ধি এবং আত্মশুদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।


মুহাররম একটি সম্মানিত মাস


আল্লাহ তাআলা বলেন,إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ ... مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি। তার মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। (সুরা তাওবা:৩৬) أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা। (সহিহ মুসলিম:১১৬৩) এ হাদিসে মুহাররমকে শাহরুল্লাহ বা আল্লাহর মাস বলে অভিহিত করা হয়েছে, যা এর বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ।


আশুরা কী?


আশুরা শব্দটি আরবি থেকে উদ্ভূত। মুহাররম মাসের দশম দিনকে আশুরা বলা হয়। ইসলামের আগেও এ দিনটি পরিচিত ছিল এবং বিভিন্ন নবীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ঐতিহ্যগতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সহিহ সূত্রে যে ঘটনাটি সর্বাধিক প্রতিষ্ঠিত, তা হলো মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মুক্তি।
মুসা আ.এর মুক্তি ও ফেরাউনের ধ্বংস


আশুরার দিনের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ঘটনা হলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুসা আ.ও তার অনুসারীদের মুক্তি এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীর ধ্বংস।


আল্লাহ তাআলা বলেন, فَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ مُوسَىٰ أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ ۖ فَانفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ আমি মুসার প্রতি ওহি করলাম, তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত করো।তখন সমুদ্র বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং প্রতিটি অংশ বিশাল পর্বতের মতো হয়ে গেল। (সুরা শুআরা:৬৩)


আল্লাহ তাআলা বলেন, فَأَنْجَيْنَا مُوسَىٰ وَمَنْ مَعَهُ أَجْمَعِينَ ۝ ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآخَرِينَ অতঃপর আমি মুসা ও তার সঙ্গীদের সবাইকে রক্ষা করলাম। তারপর অন্যদের ডুবিয়ে দিলাম। (সুরা শুআরা:৬৫-৬৬) এই ঘটনা মানবজাতিকে শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর সাহায্যের সামনে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জালিমও অসহায়।


আশুরার রোজা ও রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম


রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন তিনি ইহুদিদের আশুরার দিনে রোজা রাখতে দেখেন। কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, هَذَا يَوْمٌ عَظِيمٌ، أَنْجَى اللَّهُ فِيهِ مُوسَى وَقَوْمَهُ، وَغَرَّقَ فِرْعَوْنَ وَقَوْمَهُ، فَصَامَهُ مُوسَى شُكْرًا এটি এক মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ মুসা ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়কে ডুবিয়েছেন। তাই মুসা আ. কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা রেখেছিলেন। তখন রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْهُمْ মুসার সঙ্গে তাদের চেয়ে আমার সম্পর্ক অধিক ঘনিষ্ঠ। এরপর তিনি রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (সহিহবুখারি:২০০৪)


আশুরার রোজার ফজিলত


আশুরার দিনের রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের (সগিরা) গুনাহের কাফফারা হবে। (সহিহ মুসলিম:১১৬২) এ হাদিস আশুরার দিনের বিশেষ মর্যাদা ও আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের প্রমাণ বহন করে।


আশুরার দিনের শিক্ষাসমূহ
১.সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী, ফেরাউনের ছিল ক্ষমতা, বাহিনী ও প্রভাব; কিন্তু সত্যের সামনে সবকিছু পরাজিত হয়েছে। ২.আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা
মুসা আ.-এর ভাষায়, كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ কখনো নয়; নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে আমার রব আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন। (সুরা শুআরা: ৬২) ৩. কৃতজ্ঞতার গুরুত্ব মুসা আ. মুক্তির জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ে রোজা রেখেছিলেন। এটি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা শুধু মুখে নয়, আমলের মাধ্যমেও প্রকাশ করতে হয়। ৪. জুলুমের পরিণতি ধ্বংস ফেরাউনের করুণ পরিণতি মানব ইতিহাসে অত্যাচারীদের জন্য এক স্থায়ী সতর্কবার্তা। ৫. নবীদের ঐক্যবদ্ধ দাওয়াত আশুরা প্রমাণ করে যে সকল নবীর দাওয়াত ছিল এক তাওহিদ, আল্লাহর আনুগত্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান।


১০ মুহাররম বা ইয়াওমু আশুরা ইসলামের ইতিহাসে এক মহিমান্বিত দিন। এ দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা আ. ও তার অনুসারীদের মুক্তি দিয়েছিলেন, ফেরাউনকে ধ্বংস করেছিলেন এবং কৃতজ্ঞতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। রসুলুল্লাহ সা.এই দিনের রোজাকে সুন্নত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং এক বছরের গুনাহ মাফের সুসংবাদ দিয়েছেন।


তাই আশুরা ঈমান, তাওয়াক্কুল, কৃতজ্ঞতা, ধৈর্য এবং সত্যের বিজয়ের এক চিরন্তন বার্তা। মুসলমানদের উচিত এ দিনের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা এবং সুন্নত অনুযায়ী এর মর্যাদা রক্ষা করা।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com