ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ম্যুরাল ও কিছু কথা
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৭, ১৬:১১
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ম্যুরাল ও কিছু কথা
খন্দকার হাবীব আহসান
প্রিন্ট অ-অ+

জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতার মহানায়ক হওয়ার পরও অতি দুঃখের বিষয়, শেখ মুজিবুর রহমান আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক স্মৃতিগুলো আন্দোলন -সংগ্রামের হলেও সুখের নয় বরং বড়ই কষ্টের।


শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকা কালে ১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় তাঁকেসহ কয়েকজনকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে অবৈধভাবে বহিষ্কার করে। বাকিরা জরিমানা আর মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব ফিরিয়ে নিলেও বঙ্গবন্ধু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। পরবর্তীতে ৬১ বছর পর ২০১০ সালের আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জাতির পিতার ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে যে, এই অবৈধ বহিষ্কার তুলে বঙ্গবন্ধুকে অনেক আগেই ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয়া উচিত ছিলো।


পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক থাকাকালে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি আবদুল আউয়াল ও সাধারন সম্পাদক আবদুল মোমিন তালুকদারের আমন্ত্রণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে তৎকালীন ডাকসুর ভিপি একরামুল হক বলেন, ঐতিহ্য অনুসারে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্রসংসদের আমন্ত্রণে এই প্রতিষ্ঠানে আসতে পারবেন। পরে বঙ্গবন্ধু ফিরে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে একরামুল হক আমন্ত্রণ জানালেও বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার সময় করে উঠতে পারেননি।


১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালে নিমন্ত্রণে আসলে তাঁকে বাধা দেয়, তাঁরই স্নেহের পরশে বেড়ে ওঠা কয়েক শিক্ষার্থী, যারা পরবর্তীতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছে।


বঙ্গবন্ধুর জীবনের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস মেলালে সেটা বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস, বাংলাদেশের গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তা বাঙ্গালী জাতির ঐক্যবদ্ধতার ভিত্তি। বাঙ্গালীর এক বর্নাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাসের স্মৃতি। কিন্তু তাঁর সেই রাজনৈতিক দিনগুলোর স্মৃতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ততটা ধরে রাখতে পারেনি।


শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন,ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, সহ সকল আন্দোলন সংগ্রামের শুরুটা এখান থেকেই করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেয়ার সূত্রপাতটাও এখানেই। যদিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সহ সাধারণ জনতা যেমন শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছে, তেমনি বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব কেড়ে নিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কুচক্রী প্রশাসন ।


এই উদার মানুষটি পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী সকলের বিপদেই ছুটে এসেছেন আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক সব ভাবেই। ১৯৭২ সালের ৬ মে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে তাঁকে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী সকলে সংবর্ধনা দেন, সকলের ভালবাসায় সিক্ত হন শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধুর সামনেই তাঁর বহিষ্কারের কপির কাগজটি সেদিন ছিড়ে ফেলা হয়। ১৯৭২ সালের শেষের দিকে ছাত্ররা অটোপ্রোমোশনের শিক্ষকদের ঘেরাও করে আটক রাখলে বঙ্গবন্ধু এসে সমস্যার সমাধান করে যান এবং পরবর্তীতে ছাত্ররা হলের ডাইনিং এ রুটির পরিবর্তে ভাতের দাবীতে আন্দোলন করে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে রাখলে বঙ্গবন্ধু এসে ছাত্রদের আশ্বাস দিলে তারা আন্দোলন তুলে নেয়।


১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কথা ছিলো, সেদিন তাঁকে সন্মানসূচক ডক্টর অফ ল ডিগ্রী পাবার কথা ছিলো এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, তখন তিনি রাষ্ট্রপতি পদাধিকার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। সেই আসা আর কোনদিনই হল না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সূর্য সন্তানের। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেজেছিলো তার গর্ভে বেড়ে ওঠা জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানে বরন করার জন্য কিন্তু সে সুভাগ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতির খাতাটার কপালে লেখা নেই, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করল ঘৃণ্য কাপুরুষেরা, জাতি হারলো তার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে,বাঙ্গালীরা হারালো পিতাকে,নির্যাতিত অসহায় গরীব-দুঃখীরা হারালো তাদের সহায়কে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও আর হলো না জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাথে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের দেখা, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেই সন্তান একটি দেশের জন্ম দিয়েছে তার গর্ভে থেকেই, তাঁর সাথে সুখস্মৃতি অধরাই রয়ে গেল, যার অভাব আজকের তরুণ প্রজন্ম বোধ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী বুঝতে পারে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ইতিহাসের স্মৃতি নিয়ে একটি একক সংগ্রহশালা আর টিএসসির মতো প্রাণকেন্দ্রে সন্মানসূচক একটি ম্যুরাল হয়ত বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসকে সর্বদা দৃশ্যমান রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুকে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানের যায়গা দেয়া সম্ভব। যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্তান বরনের চির আক্ষেপের ভারী বসতাসকে যেমন মুক্ত করবে তেমনি বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিরদিনের স্মৃতির স্মারক হয়ে থাকবে।


লেখক -শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com