মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধার ফারাক
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ২১:৪৭
মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধার ফারাক
আল আমিন বাবু, উত্তর আমেরিকা থেকে
প্রিন্ট অ-অ+

আজ বিজয়ের এই আনন্দক্ষণে আপনি কি আপনার পরিচিত কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, বা কৃতজ্ঞতা ? শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কি আপনার পাড়ার সেই রিক্সাচালক বা আপনার গ্রামের সেই কৃষকটিকে অথবা গায়ে মাছের আঁশটে গন্ধযুক্ত জেলেকে, আপনাদের স্টেশনের লাল জামা পরা সেই কুলিকে অথবা আপনার গ্রামের মালুপল্লীর সেই কামারকে, যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতেই যুদ্ধে গিয়েছিলো, যার বিনিময় আজ আপনি স্বাধীন দেশের নাগরিক।


তাঁরা যদি শহীদ হয়ে যেতেন তবে আপনারা সেই শহীদকে সামনে রেখে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছুটা হলেও কিছু সুযোগ-সুবিধা পেতেন, যা আজ তারা জীবিত ফিরে আসার কারণে হয়তো পাচ্ছেন না।


আসলেই যারা ফিরে এসেছিলেন তাঁরা সত্যিই দুর্ভাগা। কারণ, তাদের কথা ক'জনই বা ভাবে ? তারা বেঁচে থেকে যে অবহেলা পেয়েছেন মরে গেলে অন্ততপক্ষে "শহীদ" নামক খেতাবটি তো পেতেন!


যে পেশীশক্তি দিয়ে,ধমনীর টগবগে রক্তের ধারায় বলীয়ান হয়ে ,বঙ্গবন্ধুর ডাকে, জয় বাংলা স্লোগানের হুঙ্কারে যারা আমাদেরকে পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর কিছু নির্লজ্জ বাঙালী রাজাকার, আলবদর, শান্তি বাহিনী, মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলাম নামক কিছু হিংস্র পশুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন,যারা উপহার দিয়েছেন আমাদের একটা মানচিত্র, লাল-সবুজ পতাকা, আজ তাঁরা বার্ধক্যে এসে দাঁড়িয়েছেন। আর কয়েকটা বছরের মধ্যেই এক এক করে যারা এই মাটি থেকে ঝরে পড়বেন। আপনারা এই মানুষগুলোকে কি নামে ডাকবেন ? জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান? নাকি শুধুই মুক্তিযোদ্ধা।


সুইডেনের স্টোকহোল্মে একবার ওয়াটার ফেষ্টিভেল দেখতে গিয়েছি, হঠাৎ খেয়াল করলাম এক জায়গায় একদল যন্ত্রী তাদের অর্কেস্ট্রা প্লে করছেন, সেখানে অনেক বৃদ্ধ মানুষ স্যুট ও মাথায় হ্যাট পরে খুবই গর্বের সাথে বসে রয়েছেন। তাদের সারা শরীর আর হ্যাটজুড়েই রয়েছে বিভিন্ন রকম ব্যাজ, যা প্রায় তাদের স্যুট আর হ্যাটের রঙকেই ঢেকে ফেলেছে। সেই সময়ের ছবিটা আমার মাথায় গেঁথে গেলো। কিন্তু তখন আমি সুইডেনে একদম নতুন, সেদেশের ভাষাও জানি না। তার ওপর বাঙালী স্বভাবসুলভ অযথা লজ্জাবোধের কারণে কাউকেই কিছু জিজ্ঞেস করা হলো না। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই সেই বৃদ্ধদেৱ একজনকে আবিষ্কার করলাম এক লাইব্রেরিতে। তখন আমি কিছুটা সুইডিশ ভাষা রপ্ত করেছি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "সেদিন তোমরা ওখানে কি করছিলে?" তিনি উত্তর দিলেন, আমরা সবাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের যোদ্ধা বা ভলান্টিয়ার। তাই সেদিন অর্কেস্ট্রা বাজিয়ে আমাদের সম্মানিত করা হচ্ছিলো।


শুধু তাই নয়, তাদেরকে দেশের যেকোনো উৎসবের সময়ই বিভিন্নভাবে সম্মানিত করা হয়, যে কারণে বিভিন্ন ব্যাজে তাদের স্যুট ও হ্যাট ঢেকে গিয়েছে। আরো অবাক হলাম যখন শুনলাম তার বয়স ৭২ এবং তিনি ওই লাইব্রেরিতে কাজ করেন। আমি বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করলাম ,"সুইডেনে তো ৬৫ বছরেই অবসরে যেতে হয়। তবে তুমি কি করে কাজ করছো? " তিনি জানালেন একজন মুক্তিযোদ্ধা সরকারের সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা পাবার পরও তিনি যতদিন চাইবেন ততদিন কাজ করতে পারবেন। এটাও তাদের জন্য দেশের দেয়া সম্মান।"


বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো। হায়রে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দূরে থাকে, যে সব মুক্তিযোদ্ধা চাকুরীজীবী ছিলেন তাদের সাথেও হয়েছে প্রহসন। তাদের চাকরির বয়স ৬০ থেকে ২ বছর বাড়িয়ে ৬২ করা হলো, তার কিছুদিন পরই সরকারের অনেক আমলা আর কর্মজীবীদের চাকরির বয়সও ৬২ করে দেয়া হলো। এই কি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পুরস্কার ? জামাত ঘারানার আমলার দুৰ্ব্যেবহার সহ্য করতে না পেরে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান চিঠি লিখে আত্মহত্যা করলেন, তার কি কোনো বিচার হলো ? জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানকে পাড়ার মাস্তানরা পিটিয়ে মেরে ফেললো, তার কি কোনো বিচার হলো ? ঘরের মধ্যে ঢুকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানকে কুপিয়ে মেরে ফেলা হলো, তার কি কোনো বিচার হলো ? জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা পথে-ঘাটে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যাচ্ছে, না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে - আমরা কি তার খবর রাখি ? অথচ ১৬ ডিসেম্বরে আমরা আনন্দ করি, উৎসব করি। ২৬ মার্চ সংসদ ভবনের সামনে বিশাল আয়োজনে বিশাল বাজেটে আলোকসজ্জা করি, সভা-সেমিনারে শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নামে বক্তৃতার তুবড়ি ছোটাই । কেন এই অসংগতি?


চলুন অসংগতিগুলো খুঁজি ! ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পক্ষের প্রত্যেকটি বাঙ্গালীরই মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদান রয়েছে! একজন দরিদ্র বৃদ্ধাও তার ক্ষেতের শেষ মুলো আর বেগুন তুলে এনে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। একজন ভিক্ষুক তার ভিক্ষার থলের ভিতর থেকে শেষ মুঠো চালটুকুও মুক্তিদের খাবারের জন্য বের করে দিতে দ্বিধা করেননি । এক গৃহস্থকে সপরিবারে হত্যা হয়েছে শুধু মাত্র ক'জন মুক্তি বাহিনীকে এক রাত আশ্রয় দেবার কারণে । এ ধরণের ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। কারণ তখন কিছু কুলাঙ্গার যুদ্ধপরাধী ছাড়া গোটা জাতিই ছিল এক মরণপণ যুদ্ধের মধ্যে। তাই এরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। তাহলে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা কারা ?


বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে গেরিলা যুদ্ধের স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। তিনি বলেছিলেন, "আমরা ওদের ভাতে মারবো, পানিতে মারবো।" এটি ছিল শত্রুপক্ষের খাদ্য পানি বা রসদ সরবরাহ বন্ধের একটা গেরিলা যুদ্ধের কৌশল। তিনি বলেছিলেন, ''তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।" এটা শত্রুপক্ষের ওপর চারিদিক থেকে হিট অ্যান্ড রান নামক গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অর্থাৎ শত্রুকে চারিদিক থেকে গোপন আক্রমণের মাধ্যমে দিকবিদিকজ্ঞানশূন্য করে ফেলা বা শত্রুর মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা । অতঃপর তিনি এই যুদ্ধকে একটা জনযুদ্ধে পরিণত করতে সক্ষম হলেন যখন তিনি বললেন ,"রক্ত যখন দিতে শিখেছি তখন রক্ত আরো দেবো, তবুও এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ!" এখানে ইনশাল্লাহ শব্দের ব্যবহারের মা্ধ্যমে বঙ্গবন্ধু ধর্মপ্রাণ মানুষদের বোঝাতে সক্ষম হলেন যে তিনি এই যুদ্ধে সৃষ্টিকর্তার কাছেও সাহায্য চেয়েছেন অর্থাৎ তিনি ধর্মনিরপেক্ষ বটে, তবে নাস্তিক নন। পরিশেষে তিনি বললেন "আওয়ামীলীগের প্রত্যেকটা কমিটির মাধ্যমে যুদ্ধের ট্রেনিং শুরু করতে অর্থাৎ যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী, তার জন্য উপযুক্ত দক্ষতা অর্জন করা। এই উপযুক্ত দক্ষতা অর্জনে সেদিন যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারাই ছিল মুক্তিবাহিনী ।


পাঠক, আমি বোধহয় এখানে মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধার মাঝের পার্থক্যটি একটু পরিষ্কার করতে পেরেছি। সেদিন এই মুক্তিবাহিনীতে যুক্ত হয়েছিল ছাত্র, শিক্ষক, চাষী, জেলে, কামার, কুমার, রিক্সাওয়ালা, কুলি মজুর তথা বাংলার সর্বশ্রেণীর জনগণ। যারা সরাসরি রণাঙ্গণে যুদ্ধ করেছেন স্বল্পমাত্রার ট্রেনিং নিয়েই তারা মরণপণ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন । এদের মধ্যে যারা রণাঙ্গণে মারা গেছেন তারাই আমাদের শহীদ আর যারা ফিরে এসেছিলেন তারা গাজী যাদেরকে আমি "বিজয়ী বীর " বলে আখ্যায়িত করতে চাই। স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বা দেশের ভেতর বিভিন্নভাবে যে সব কণ্ঠশিল্পী তাদের সংগীত দিয়ে যুদ্ধ করেছেন তারাও মুক্তিযোদ্ধা বা কণ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা, যে সব বুদ্ধিজীবী দেশের ভেতর থেকে কলমের বা বুদ্ধির যুদ্ধ করেছেন তারাও অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধা। দেশে ও প্রবাসে যে যেখানে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন তারা সবাই তার নিজ নিজ ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা। যদিও মুক্তির গান-এর কণ্ঠশিল্পীদের আমি একটু বেশি সম্মানের চোখেই দেখি। কারণ, তারা শুধু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেই নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে সরাসরি রণাঙ্গণে তাদের গানের দল নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছিলেন, সেটাই তাদের স্বকীয়তা।


মোট কথা সেদিন যারা বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ই পি আর, পুলিশ ,আনসার বাহিনী ছিলেন যারা পাকিস্তান বাহিনী থেকে বের হয়ে এসে জনতার কাতারে দাঁড়ালেন এবং বঙ্গবন্ধুর আহবানে যারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তারাই মুক্তি বাহিনী, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান।


নতুন প্রজন্ম তাদের ক'জনকে চেনে? যখনি মুক্তিযুদ্ধের কথা আসে আমরা বিভিন্ন মিডিয়াতে ঘুরে ফিরে অল্পকিছু চেনামুখই দেখতে পাই। বাকি শ্রেষ্ঠ সন্তানরা কোথায় গেলো ? যুদ্ধক্ষেত্রে জাতির হিরোদের নাম যখন আসে তখন আমরা মাত্র ৭ জনের ছবি দেখতে পাই যারা সবাই ছিলেন রেগুলার আর্মির সদস্য । অথচ সরকারি হিসাবে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার মুক্তিবাহিনীর মধ্যে ৭৫ হাজার ছিলেন রেগুলার আর্মি যারা জনতার কাতারে এসে দাঁড়ান এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অনুগত সেনাবাহিনী হিসাবে প্রকাশ পায়, যার সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল ওসমানী। তারা বিভিন্ন সেক্টরে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেন, কিন্তু এর বাইরে ১ লক্ষ ছিলেন মুক্তিফৌজ যারা বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার আর্মির হাতে স্বল্পকালীন ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধের রণাঙ্গণে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বা ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। এরা সবাই বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে রণাঙ্গণে মৃত্যুর জন্য তৈরী হচ্ছিলেন। এরাই মুক্তিবাহিনী, এরাই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, এরাই বিজয়ী বীর অর্থাৎ ১৯৭১ এ রণাঙ্গণের ১ লক্ষ ৭৫ হাজার জন মুক্তিবাহিনীই আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। এর বাইরে যারা তারা মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু মুক্তিবাহিনী নয়।


তাই আমাদের উচিত সেই মুক্তিবাহিনীকে তাদের সঠিক মূল্যায়ন করে তাদের ঋণ শোধ করা। ওই ১ লক্ষ ৭৫ হাজার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রত্যেকের নাম একটা নামফলকে থাকা উচিত, যা দেখে শতবছর পরের প্রজন্ম তাদের পূর্বপুরুষদের বীরগাথা জেনে এ দেশকে ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ হবে।


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com