এগিয়ে চলেছে নারী
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০১৭, ১৬:১২
এগিয়ে চলেছে নারী
মোহাম্মদ সালেহীন রেজা
প্রিন্ট অ-অ+

নারী আন্দোলনের অগ্রদূত মহীয়সী বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, ‘তোমাদের কন্যাদেরকে শিক্ষা দিয়া ছাড়িয়া দাও, তাহারা নিজেরাই নিজেদের অন্নের সংস্থান করুক।’


তাঁর এ আহ্বানে নারীর অধিকার অর্জনের পন্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।


বাংলাদেশের নারীরা যুগ যুগ ধরে শোষিত ও অবহেলিত হয়ে আসছে। পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার, কূপমণ্ডুকতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বেড়াজালে তাকে সর্বদা রাখা হয়েছে অবদমিত। তার মেধা ও শ্রমশক্তিকে শুধু সাংসারিক কাজেই ব্যয় করা হয়েছে, সমাজ ও দেশ গঠনের কাজে তাকে কখনো সম্পৃক্ত করা হয়নি।


ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এ দেশের নারীজাগরণে সাড়া পড়েছিল সাধারণত শিক্ষাগ্রহণকে কেন্দ্র করে। এছাড়া, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে নারী তার অধিকার আদায়ে সচেতন হয়ে ওঠে। পাকিস্তান আমলে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধিকার আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।



১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ দীর্ঘপ্রত্যাশিত স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতাযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অসামান্য অবদান রাখে। যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াও বিভিন্নভাবে সহায়তা প্রদান এবং স্বামী ও সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়ে আমাদের মায়েরা এক বিশাল দেশশ্রেম ও আত্মত্যাগের নিদর্শন রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে আমাদের দুই লক্ষাধিক মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই জঘন্য অপরাধ কখনই ভুলবার নয়।


মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে এদেশের নারীরা আত্মনির্ভরশীল ও সচেতন হয়ে ওঠে। শিক্ষাগ্রহণ ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় নারীসমাজের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগে। গ্রামের নিরক্ষর নারীসমাজও কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য আগ্রহ দেখায়। জাতীয় উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণ আবশ্যক হয়ে ওঠে। নারী উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।


দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নারীসংগঠনগুলোও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। ফলে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং দেশে নারী উন্নয়নে এক বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।


বর্তমান সরকার দেশের বৃহত্তর নারীসমাজের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটিয়ে তাদের পশ্চাৎপদ অবস্থা থেকে তুলে আনতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।



নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা পরিলক্ষিত হয়। সংবিধানের ২৭ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ ২৮১ ধারায় রয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না।’ ২৮২ ধারায় আছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ ২৮৩ ধারায় আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ নারী-পুরুষ ভেদে বা বিশ্রামের কারণে জনসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনোরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।’


২৮৪ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের কোনো অনগ্রসর অংশের প্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’


৬৫(৩) ধারায় নারীর জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষিত হয়েছে এবং ধারার অধীনে স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। সত্তর দশকের প্রথমভাগ থেকেই তৎকালীন সরকার নারী উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৭৫ সালে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলনে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। ফলে দেশের বাইরে নারী উন্নয়নের যে আন্দোলন চলছিল তার মূলস্রোতধারায় বাংলাদেশ যুক্ত হয়ে পড়ে।


বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই নারীর ক্ষমতায়নের দিকে নজর দিয়েছিলেন। যে কারণে প্রথম জাতীয় সংসদেই নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন রাখা হয়। সে সময় নারী আন্দোলন এতটা শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সঙ্গে প্রথম থেকেই কিছু নারী নেতৃত্বের নাম লক্ষণীয়। যেমন বেগম বদরুন্নেছা, আমেনা বেগম, জোহরা তাজউদ্দীন প্রমুখ। বঙ্গবন্ধুর সময়ে যারা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, দলের ভেতরে তাদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। অধিকাংশ নারী নেতৃত্ব বাম দল দ্বারা পরিচালিত হলেও পরবর্তীতে তারা আওয়ামী লীগের মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।



স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু নির্যাতিত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবে ভূষিত করেছিলেন। ‘বীরাঙ্গনা’ অর্থ ‘বীর নারী’। তিনি এভাবে নারীদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’। নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন এবং আবাসনের জন্য এ বোর্ড গঠিত হয়। নারী পুনর্বাসন বোর্ডের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৭৪ সালে বোর্ডকে পুনর্গঠিত করে সংসদের একটি অ্যাক্টের মাধ্যমে নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তর করা হয়। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ প্রতিষ্ঠিত হয়।


এ সময় নারী উন্নয়নের জন্য জেলা ও মহকুমায় ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা, নারীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান, নারীকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করে প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা, উৎপাদন ও প্রশিক্ষণ খাতে নিয়োজিত নারীদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের চিকিৎসা এবং তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বৃত্তিপ্রথা চালু করা হয়। এ কর্মসূচিগুলো বর্তমানে মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের অধীনে ‘দুস্থ মহিলা ও শিশুকল্যাণ তহবিল’ নামে পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলার নারীদের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম নারী সংগঠন মহিলা সংস্থার ভিত্তি রচনা করেন। শিশু ও কিশোরীদের আত্মমর্যাদাবোধ প্রতিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও নৈতিকতার শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তান গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশনকে ঢেলে সাজান। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনকে পুনর্গঠিত করার জন্য সে সময় বঙ্গবন্ধু সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে দায়িত্ব দেন। যিনি বর্তমান সংসদ উপনেতা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য।


বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলে গৃহীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারীদের অর্থকরী কাজে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম আন্তঃ খাত উদ্যোগ নেওয়া হয়। মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রথম পঞ্চবার্ষিক (১৯৭৩-৭৮) পরিকল্পনায় স্বাধীনতাযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গৃহীত হয়। নারী উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর সরকার এই খাতে অর্থ বরাদ্দ দেয়।


জরিপের মাধ্যমে সঠিক তথ্য আহরণ করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা, বীরাঙ্গনা নারীসহ যেসব পরিবারের উপার্জনক্ষম পুরুষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন সেসব পরিবারের নারীদের চাকরি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।


রাজনীতি ও প্রশাসনে নারীর ক্ষমতায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার প্রথম উদ্যোগ ১৯৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু সরকার গ্রহণ করে। সরকারি চাকরিতে মেয়েদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে দিয়ে সব ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ অবারিত করে ১০ ভাগ কোটা সংরক্ষণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে দুজন নারীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ১৯৭৪ সালে একজন নারীকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়।


আধুনিক বাংলাদেশে নারীর অগ্রযাত্রার অগ্রদূত জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। আজ সরকারপ্রধান, সংসদ নেতা, সংসদ উপনেতা, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদের স্পিকার - সবাই নারী। এটা সম্ভব হয়েছে তাঁরই জন্য। জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্হান আজ ষষ্ঠ। নারীরা এখন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ সমাজের সব স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।


লেখক : রাজনীতিবিদ


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com