ভারত কার্ড : সেই খেলোয়াড়রা মাঠেই আছে
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৭, ২১:১০
ভারত কার্ড : সেই খেলোয়াড়রা মাঠেই আছে
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে দেশটি আশ্রয় দিয়েছিল এক কোটি শরণার্থীকে, মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় যে দেশটি ছিলো সবচেয়ে বড় সুহৃদ, ভারত নামের সেই দেশটি গত ৪৫ বছরের বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড। বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনেই সবচয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ভারতের নাম। ভারতবিদ্বেষের কার্ডটি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত ও বিভ্রান্ত দুটোই করা হয়েছে সমান অনুপাতে।


১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় বারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় আওয়ামী লীগ। সেই দফাতেই তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক দশকের রক্তক্ষয় বন্ধ করতে সম্পাদন করে পার্বত্য শান্তি চুক্তি। সেই সময় বিরোধীদের প্রচারণা ছিল, শান্তি চুক্তি হলে বাংলাদেশের ফেনী জেলা পর্যন্ত ভারতের অধীনে চলে যাবে। সেই প্রচারণা বাজারে ছড়াতে ডানপন্থীদের সাথে মাঠে নেমেছিলো সেই সময়ের সংসদের বিরোধী দলও।


এই বিষয়ে গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি সংসদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, "যখন চুক্তি হয় বিএনপি-জামায়াত তার বিরোধিতা করেছিল। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। উনি (খালেদা) তখন ফেনীর সংসদ সদস্য। উনাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ফেনী যদি ভারত হয়ে যায়, তাহলে কি উনি ভারতে সংসদে গিয়ে বসবেন? তিনি বলেন, যেদিন পাহাড়ী বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ করে, সেদিন বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় হরতাল-অবরোধ ডেকেছিল, যাতে অস্ত্র সমর্পণ না হয়। সকল বাধা উপেক্ষা করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম।"


২০১৩ সালের ৪ মার্চ ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময় তাঁর সঙ্গে সেই সময়ের সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার দেখা করার কর্মসূচি থাকলেও বিএনপির শরীক, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াত হরতাল ডাকে সেদিন। হরতাল ডাকার পরপরই বিএনপির সে সময়ের সহসভাপতি ও প্রাক্তন পররাষ্ট্রসচিব শমসের মবিন চৌধুরী সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেন, "আগামীকাল বিকেল সাড়ে চারটায় প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সৌজন্য সাক্ষাতের সময় ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে হরতাল থাকবে। হরতালের কারণে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে বিরোধীদলীয় নেতার হোটেল সোনারগাঁওয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।"


২০১৩ সালে বিএনপির সেই সময়ের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, "আন্তর্জাতিক মাস্টার‌প্ল্যানে একতরফা নির্বাচনের পাঁয়তারা করছে আওয়ামী লীগ।"


পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে সময় এবং পরে ভারতের দিকে আঙুল তুলেছেন দলটির অনেক নেতাই। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা আব্বাস বলেছিলেন, “এই সরকারের ওপর আজ ভারতীয় সিন্দাবাদের দৈত্য চেপে বসেছে।” বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায়ও ''ভারতের উসকানি’' রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন এই বিএনপি নেতা।


বিএনপি যখন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দেয়, সেই সময়ে বিজেপির নেতা অমিত শাহ খালেদা জিয়াকে ফোন করেছেন - এ প্রচারণাটি বিএনপি সামনে আনে। পরে অমিত শাহ বাংলাদেশের একাত্তর টেলিভিশনে এক সাক্ষাত্কারে বিষয়টিকে অপপ্রচার ("বাকোয়াজি") বলে উড়িয়ে দেন। এখনো বিএনপি সেই প্রচারণার সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি।


আবার উল্টো ভারতের গত সাধারণ নির্বাচনের আগে বিজেপির প্রতি বেশ আগ্রহী ছিলো বিএনপি। বিজেপির বিপুল বিজয়ে দলটির নেতাদের দেখা গেছে হাসিমুখ। বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গত সফরের আগে সাংবাদিক সম্মেলনে সেই সময়ের বিএনপির মুখপাত্রের দায়িত্বে থাকা ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেছিলেন, “বিএনপি কখনও ভারতবিরোধী রাজনীতি করেনি, এখনও করে না, ভবিষ্যতেও করবে না।”


বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর বিষয়ে বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জনগণের কাছে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ভারতের সঙ্গে কী কী চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে যাচ্ছে, তা আগেই জানানোর দাবি করেছেন। আলমগীরের দাবি, “দেশ ও জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এ সব চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানার ও মতপ্রকাশ করার অধিকার তাদের (জনগণ) রয়েছে।”


জবাবে "শেখ হাসিনার সরকার দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি করবে না" এই কথা বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, "ভারতের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর তার সবগুলোই প্রকাশ করা হবে।"


বিএনপির এই ভারত বিষয়ক বক্তব্যগুলোর জবাবে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহম্মদ নাসিম বলেছেন, "প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। তা ছাড়া এই সফরে বেশ কয়েকটি বিষয়ের শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে। বিএনপির স্বভাব সব কাজেরই বিরোধিতা করা। এরই ধারাবাহিকতায় তারা প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে ঘিরে নানা ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে।''


নাসিমের বক্তব্য, "আওয়ামী লীগ সব সময় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান করে। এর আগে ছিটমহল সমস্যা সমাধান, সমুদ্রসীমা উদ্ধারসহ অনেক বিষয়ই শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়েছে। এবারও তার অন্যথা হবে না।'' তিনি আরও বলেন, ''বিএনপি ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালীন কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। তারা শুধু তাঁবেদারি করে গেছে।"


সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের পতনের পরও বাংলাদেশ রাজনীতিতে জনপ্রিয় স্লোগান - "রুশ- ভারতের দালালরা, হুঁশিয়ার, সাবধান!'' সাধারণ মানুষকে ভারতবিদ্বেষী করে ভারত কার্ড নিয়ে খেলাটা চার দশকের বেশি সময় চলছে। শেখ হাসিনার এবারের সফরেও সেই খেলোয়াড়রা মাঠেই রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, বহু ব্যবহারে কার্ডটি জৌলুস ও বিশ্বস্ততা দুটোই হারিয়েছে। তবে কার্ডটির খেলোয়াড়-সমর্থক-দর্শকরা এখনো আছেন গ্যালারিতে। তারা দেখছেন, হাততালি দিয়ে উৎসাহও দিয়ে চলেছেন।


বিবার্তা/হুমায়ুন/পলাশ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com