ইরান : এক মার্কিন ব্যবসায়ী নেতার অভিজ্ঞতা
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৮:৩৭
ইরান : এক মার্কিন ব্যবসায়ী নেতার অভিজ্ঞতা
ডিক সাইমন/ভাষান্তর : হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী
প্রিন্ট অ-অ+

গত তিন বছরে আমি তিনবার ইরান সফর করি। প্রত্যেকবারই যাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে। প্রথমবার যাই ২০১৩ সালে, ইরানের প্রেসিডেন্ট তখন আহমাদিনেজাদ। এরপর যাই ২০১৪ ও ২০১৫ সালে, যখন ইরান শাসন করছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট রুহানি।


তিনবারের সফরকালে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হয় ব্যবসায়ী নেতা, তরুণ উদ্যোক্তা, ধর্মীয় নেতা, ছাত্র, শিল্পী এবং একেবারে সাধারণ মানুষ। আমরা তাদের দেখা পাই এবং কথা বলি বিভিন্ন মার্কেটে ও রাস্তায়।


আমাদের সফরগুলো ছিল নানা কারণে ব্যতিক্রমী। ইরানে ইসলামি বিপ্লব হয় ১৯৭৯ সালে এবং পরের বছর জিম্মিসঙ্কট। একদল ইরানি ছাত্র তখন তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল ও দূতাবাস কর্মী ও কর্মকর্তাদের জিম্মি করে। ওই ঘটনার পর দু’দেশের সম্পর্কে শীতলতা নেমে আসে। এ অবস্থায় আমরাই হই প্রথম মার্কিন নাগরিক, ওই সঙ্কটের পর যাদেরকে সেই দূতাবাস ভবনে যেতে দেয়া হয়। এ ছাড়া ইসলামি বিপ্লব ও জিম্মি সঙ্কটের পর আমরাই প্রথম মার্কিনি, যারা একজন ইরানি মন্ত্রীর সাক্ষাৎ লাভে সমর্থ হয়।


এসবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, এই তিনবারের সফরে ইরান সম্বন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে প্রচলিত অনেকগুলো মিথ বা কল্পকথা, যা আমরাও বিশ্বাস করতাম, সেসব ভেঙে যায়। আমরা ভাবতাম, ইরানিদের সম্বন্ধে সবকিছুই আমাদের জানা। এরকম ভাবার কারণও আছে। আর্গো, হোমল্যান্ড ও মাইরিয়াদ এবং অন্যান্য মিডিয়া বিরতিহীনভাবে প্রচার করতে করতে আমাদের মনে এ ধারণা বদ্ধমূলভাবে পুঁতে দিয়েছে যে, ইরানি মানেই ‘ভয়ঙ্কর’।


কিন্তু তিন-তিনবারের ইরান সফর আমার ওই ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। স্বীকার করছি, দেশটিতে অনেক জটিল-কুটিল ব্যাপার আছে। কিন্তু পাশাপাশি এমন অনেক কিছু আছে, যা আমেরিকান ও পশ্চিমা দুনিয়ার অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। নিচে ইরান সম্বন্ধে এরকম কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা তুলে ধরা হলো। আমি মনে করি, এসব ভুল ধারণার অবসান হওয়া উচিত।


পশ্চিমা অবরোধ ইরানের শ্বাসরুদ্ধ করতে পেরেছে


পাশ্চাত্যে এরকম একটি ভুল ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে, পশ্চিমা অবরোধ ইরানকে একেবারে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে এবং অবরোধের ফলে দেশটি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।


তাই কি? আমি এখন আর সেরকম মনে করতে পারি না। পশ্চিমা অবরোধ ইরানের গলা টিপে ধরেছে বটে, কিন্তু তার শ্বাসরোধ করতে পারেনি। তার শ্বাসপ্রশ্বাস পুরোপুরি না হলেও মোটামুটি স্বাভাবিক।


এটা সত্যি এবং আমি নিজেও দেখেছি, অবরোধের কারণে ইরানের বেশ কিছু প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে কিংবা তার গতি শ্লথ হয়ে গেছে। যেমন, তেহরানে অনেকগুলো নির্মাণাধীন ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে আছে। অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সুইফট সিস্টেম বন্ধ হওয়ার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে দেশটির তেল, পেট্রোকেমিক্যাল ও বৃহদায়তন বাণিজ্যের ওপর।


কিন্তু এসব সত্ত্বেও থেমে যায়নি ইরান। তারা পথ বের করে এগিয়ে গেছে। যেমন, তারা পণ্যবিনিময় বাণিজ্য করেছে, যেসব পণ্য ও সেবা আমদানির ক্ষেত্রে অবরোধ শিথিল করা হয়েছে তার সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। এ ছাড়া ছিল ‘ফ্লাইং মানি’ বা স্যুটকেসভর্তি নগদ অর্থ। এ অর্থ দিয়ে ইরানিরা ৬৫ লাখ আইফোনের মালিক হয়েছে এবং অনেক রকম পশ্চিমা পণ্য কিনেছে। এগুলো এসেছে দুবাই, ইস্তাম্বুল ও অন্যান্য স্থান হয়ে। ফলে ইরান নামের এই দেশটিতে অত্যন্ত অভিজাত ও বিশ্বমানের দোকানপাট ও শপিংমলের কোনো কমতি নেই। রাজধানী তেহরানের বেলায় কথাটি আরো সত্য। এই কসমোপলিটন নগরীটি বিশ্বমানের রেস্তোরাঁ, প্রশস্ত রাজপথ, সমকালীন শিল্পজাদুঘর ও গ্যালারিতে পূর্ণ।


একবার আমরা তেহরানে মঁ ব্লাঁ স্টোর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যাই। সেখানে দেখি অ্যাপল পণ্য বিক্রয়ের অনেকগুলো দোকান এবং হরেক রকম বিলবোর্ড। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাপল কেয়ারের মতো সেবা দেয়ার জন্য একটি কোম্পানিও আছে।


ইরানে তৈরি হচ্ছে ইরান মল নামে একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। চালু হলে এটি হবে বিশ্বের বৃহত্তম শপিংমল। ইতোমধ্যেই এতে এক শ’ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে। এই অর্থের পুরোটাই এসেছে দেশীয় উৎস থেকে। মলটির নির্মাণকাজ শেষ করতে আরো কয়েক শ’ কোটি ডলার লাগবে।


ইরানের তরুণ জনগোষ্ঠীকে আমরা কাছ থেকে দেখেছি। তাদের পরনে পশ্চিমা পোশাক, তাতে লাগানো আছে মার্কিন লোগো। এরা মার্কিন সঙ্গীত ও সংস্কৃতির ভক্ত। তাদের অনেকে মার্কিন সঙ্গীত পরিবেশনেও দক্ষ।


ইরানের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর বেশ কিছুর মালিক সেদেশের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। কাজেই পশ্চিমা অবরোধ প্রত্যাহার হলে তারাও লাভবান হবে। কেননা এতে দেশের দরজা খুলে যাবে এবং তৈরি হবে বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুযোগ।


ইরানের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর বেশ কিছুর মালিক সেদেশের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। কাজেই পশ্চিমা অবরোধ প্রত্যাহার হলে তারাও লাভবান হবে। কেননা এতে দেশের দরজা খুলে যাবে এবং তৈরি হবে বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুযোগ।


বিশ্বে কী ঘটছে, জানে না ইরানিরা
ইরান সম্বন্ধে পাশ্চাত্যে এটিও একটি বহুল প্রচলিত ধারণা। আমরা দেখেছি, ইরানে ফিল্টার ও সেন্সরশিপ আছে বটে, তবে তা তেমন কাজ করে না। ফেসবুক ও টুইটারের মতো কিছু ওয়েবসাইটকে ঠেকাতে সরকার ফিল্টারিং বা ব্লকিং করে ঠিকই, তবে ব্যবহারকারীরা ভিপিএন (ভারচুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্কস) ব্যবহার করে ওসব ওয়েবসাইটে ঠিকই ঢুকে যায়। এভাবে বেশির ভাগ ইরানিই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, আমেকিরান টিভিতে সিনেমা দেখে, খবর ও গান শোনে। আমেরিকান ব্র্যান্ড পরিধানের কথা তো আগেই বলেছি।


ইরানের দেড় কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে। এটা আমার কথা নয়, একটি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপমন্ত্রী স্বয়ং এ কথা বলেছেন। কথাটি অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কারণ একবার আমরা একজন গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহর সাক্ষাতে গেলে কথায় কথায় ফেসবুক-টুইটার প্রসঙ্গ ওঠে। আয়াতুল্লাহ জানান যে, তিনি ফেসবুক ব্যবহার করেন না। কারণ তাকে খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে তার ছেলেমেয়েরা ফেসবুক ব্যবহার করে।


আমেরিকা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাসিভ ওপেন অনলাইন কোর্স ইরানে সুলভ। ফলে কোনো অসুবিধা নেই সারা বিশ্বের সাথে যুক্ত থাকার প্রযুক্তি শিখতে ও প্রয়োগ করতে।


সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি পাশ্চাত্যের চোখে পড়ে না তা হলো, ইরানে শিক্ষিতের হার ৯৮ শতাংশ। দেশটির স্কুলগুলোতে ইংরেজি ব্যাপকভাবে পড়ানো হয়। বিভিন্ন কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) অনেকেই পিএইচডি ডিগ্রিধারী। ইরানে যেসব সিইওর সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছে, তারা প্রায় সবাই পিএইচডি ডিগ্রিধারী।


প্রযুক্তিবিদ্যায় পিছিয়ে ইরানিরা
পাশ্চাত্যে এ ধারণাটি কিভাবে তৈরি হলো, আমার মাথায় আসে না। যে দেশকে তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযুক্ত করে এবং সেই অভিযোগে আরোপ করে অর্থনৈতিক অবরোধ, সেই দেশের মানুষ প্রযুক্তি ক্ষেত্রে পিছিয়ে?


আমরা এ ক্ষেত্রে স্টাক্সনেট ভাইরাসের কথা মনে করতে পারি। এই কম্পিউটার ভাইরাসটি ইরানের পরমাণু সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস করে দিলে ইরান সরকারে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। তবে আতঙ্কিত হয়ে বসে থাকেনি তারা, বরং সফটওয়্যার উদ্ভাবনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে।


যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির মতো বৃহৎ না হলেও ইরানে এরকম অনেকগুলো সরকারি-বেসরকারি প্রযুক্তিকেন্দ্র আছে। এগুলো চালায় দেশটির তরুণ প্রজন্ম। এখানে বলে রাখি, ইরানের দুই-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর বয়স ৩৫-এর কম। তারা ইসলামি বিপ্লব দেখেনি, জিম্মিসঙ্কটও না। তারাই এসব প্রযুক্তি কেন্দ্র চালায়। তরুণ প্রযুক্তি-উদ্যোক্তাদের সাথে নিয়ে আমরা পরিদর্শন করি অ্যাভাটেক। এটি একটি বেসরকারি প্রযুক্তিকেন্দ্র। তারা শুধু প্রযুক্তি শেখায় না, প্রযুক্তিক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগও করে। আমরা ইসফাহান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পার্কও দেখতে যাই। ইরানে সরকারি বা বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোগে যে ৩২টি প্রযুক্তিকেন্দ্র আছে, এটি তার একটি।


সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাহীন নারী
ইরান সম্পর্কে যে ধারণাটি পশ্চিমারা বিনাবাক্য ব্যয়ে গ্রহণ করবে, সেটি হলো, ইরানি নারীরা হচ্ছে নিপীড়িত। না সমাজে, না অর্থনীতিতে তাদের কোনো ভূমিকা নেই।


এটা সবার জানা কথা যে, ইরানে নারীদের মাথায় ওড়না পরতে হয়। তবে আগে ওড়না দিয়ে পুরো মাথা ঢেকে রাখতে হতো, এখন হয় না বা নারীরা করে না। আমরা দেখেছি, ইরানি নারীদের মাথার অর্ধেকটা খোলা, যাতে তাদের উজ্জ্বল রঙমাখা চুল দেখা যাচ্ছে। আর ওড়না? সেটা এখন তাদের ফ্যাশনের অংশ।


ইসফাহান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পার্কে একদল ইরানি নারীর সাথে আমাদের দেখা হয়। তারা জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কোম্পানি ইরানের সবচেয়ে বড় দু’টি শহরের বাস কোম্পানিগুলোর কাছে যানবাহন চলাচল ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক তথ্য সরবরাহ করে।


এবার আরেক তরুণীর কথা বলি। তিনি মার্কিন ই-কমার্স মার্কেটপ্লেস গ্রুপের মতো একটি ‘ইরানি গ্রুপ’ তৈরি করেছেন। যেহেতু তিনি একজন তরুণী, তাই শুরুর দিকে ব্যবসাসংক্রান্ত বৈঠকগুলোতে তাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হতো না। অনন্যোপায় তরুণী এবার তার বাবার শরণাপন্ন হলেন। তার বাবা ওই কোম্পানির ম্যানেজার, যে কোম্পানিতে পাঁচ শ’ লোক কাজ করে। তরুণী তার বাবাকে চাপাচাপি করলেন যেন তিনি মেয়ের সাথে এক দিন বৈঠকে যোগ দেন। তা-ই হলো। মেয়েটির বাবা বললেন, ‘আমি ইন্টারনেটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করছি। আমার মেয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আপনাদের জানাবে।’


এবার পুরো বৈঠক মেয়েটির দিকে ঘুরে গেল। অপেক্ষাকৃত বয়সী পুরুষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সম্ভাব্য গ্রাহকেরা মেয়েটির বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং বৈঠক শেষে কোম্পানির সাথে চুক্তি করলেন। এক বছর পর দেখা গেল, মেয়েটি কোম্পানির ব্যবসাকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়িয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন।


পশ্চিমা ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে ইরানি মেয়েদের অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও সক্রিয় দেখতে পেয়েছি। যেমন তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের বেশির ভাগ ফ্লোর ট্রেডার এবং ম্যানেজমেন্টের অনেকেই নারী। এ ছাড়া ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীই নারী।


ইরানি নারীদের ‘পিনীড়িত ও অনগ্রসর’ বলবে কে?



ইরানে মার্কিন প্রভাবই সবচেয়ে বেশি
এটাও একটা ভুল ধারণা। ইরানের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য শুধু আমেরিকা করে না, অন্য অনেক দেশই করে। যেমন বর্তমানে ইরানে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার চীনা আছে, যারা ব্যবসা করছে কিংবা ব্যবসার সুযোগ খুঁজছে। ফ্রান্স ও জার্মানির বড় বড় কোম্পানির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা প্রায়ই ইরান সফর করছেন এবং অবরোধ-পরবর্তী ব্যবসার সুযোগ খুঁজছেন। এসব দেশের ধাক্কায় আমেরিকা যে ইরানে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে না, তা খুব জোরগলায় বলা চলে না।


ইরান ভ্রমণ বিপজ্জনক ও জটিল
এটি আরেকটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা। যথাযথভাবে ভিসা নিয়ে এবং তাদের নিয়মকানুন মেনে চললে ইরান ভ্রমণ অত্যন্ত নিরাপদ। হাজার হাজার পশ্চিমা নাগরিক প্রতি বছর কোনো অঘটন ছাড়াই ইরান ভ্রমণ করছে।


আমেরিকা বা অন্য যেকোনো দেশের নাগরিককেই ভ্রমণ ভিসা দিয়ে থাকে ইরান। ব্যতিক্রম শুধু ইসরাইল। ইসরাইলিরা ইরানি ভিসা পায় না। ইরানে ভ্রমণকারীকে একজন গাইড দেয়া হয়। সাধারণ গাইডের সব কাজই তিনি করেন, পাশাপাশি তিনি আপনাকে জানিয়ে দেন আপনি কোথায় যেতে পারবেন এবং কোথায় যেতে পারবেন না।


কোনো আমেরিকান ইরান যেতে চাইলে তাকে তার সরকারের বিশেষ অনুমতি নিতে হয় না। তবে যদি তার পাসপোর্টে ইসরাইলের সিল থাকে, সেক্ষেত্রে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ তাকে দ্বিতীয় একটি পাসপোর্ট ইস্যু করে, যা দিয়ে পাসপোর্ট মালিক মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য যে দেশে ইসরাইলবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা আছে, সেসব দেশে যেতে পারেন।


ইরান সফরকালে আমেরিকা ও ব্রিটেনের নাগরিকদের সাথে সবসময় একজন গাইড থাকেন, যিনি সফরকারীকে জানিয়ে দেন কোথায় যাওয়া যাবে আর কোথায় নয়। তবে এসব নিয়মকানুন আসলে খুব বেশি কঠিন নয়। বিধিনিষেধ সত্ত্বেও পর্যটকেরা প্রায় সবখানে যেতে পারেন ও যান। আমাদের কথাই বলি। পথচলার সময় এবং দোকানপাটে কেনাকাটার সময় আমরা অসংখ্য লোকের সাক্ষাৎ পেয়েছি এবং কথা বলেছি। তারা আমাদেরকে অনেক প্রশ্ন করেছে। অনেক বিষয়ে অনেক কথা হয়েছে। এমনকি রাজনীতি নিয়ে আলাপও বাদ যায়নি। অবিশ্বাস্য শোনায়, কিন্তু এটাই সত্য।


এক দিনের কথা বলি। আমরা হাঁটছিলাম তেহরানের বড় বাজারে। হঠাৎ এক প্রবীণ আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং জানতে চাইলেন আমি কোন দেশ থেকে এসেছি। যেই না আমি বলেছি ‘আমেরিকা’ অমনি তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। ধরলেন তো ধরলেনই, আর ছাড়েন না। শুধু বলছেন, ‘আমেরিকা, আমরা তোমার জন্য ৩০ বছর ধরে অপেক্ষা করছি।’


ইরান ও মার্কিন সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আছে, কিন্তু ইরানে গেলে কোনো আমেরিকান সেটা বুঝতেই পারেন না। কেননা ইরানের সাধারণ মানুষ মার্কিনিদের উষ্ণ আন্তরিকতায় বুকে টেনে নেয়। সেটা ইরানে প্রবেশের সময় যেমন দেখেছি, দেশটিতে থাকাকালেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ইরানে প্রবেশকালে এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশানে কর্তব্যরত বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যরা আমাদের মার্কিন পাসপোর্ট দেখেই বলেছে, ‘স্বাগতম! আল্লাহ তোমাদের রহমত করুন।!’


আর ইরান ভ্রমণকালে কেনাকাটা করে দাম দিতে গিয়ে পড়েছি আরেক বিপত্তিতে। অনেক দোকানই আমাদের কাছ থেকে জিনিসের দাম নেয়নি। কারণ, আমরা তাদের অতিথি। অতিথির কাছ থেকে সামান্য ক’টা জিনিসের দাম নেবে? কক্ষনো নয়!


বিবার্তা/হুমায়ুন/পলাশ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com