ঘড়ির দু'টো কাঁটার মতো
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৭:৩৫
ঘড়ির দু'টো কাঁটার মতো
প্রিন্ট অ-অ+

কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, আমরা যখন ঘড়ির দু'টো কাঁটার মতো/ মিলি রাতের গভীর যামে/তখন জেনো জ্বলছে নাপাম/পড়ছে বোমা ভিয়েতনামে


কী গভীর জীবনবোধ! সংসারের অমোঘ বাস্তবতার কী সরল প্রকাশ!


কবি এই পংক্তি-ক'টি রচনা করেছিলেন অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় আগে। আজ কবি শামসুর রাহমান নেই। ভিয়েতনামেও কেউ এখন আর বোমা ফেলে না। বরং সেদিনের বোমাবাজরাই আজ দেশটির বন্ধু ও উন্নয়নসহযোগী। সময় কতো কিছুকেই না বদলে দেয়!


তবে অনেক কিছু বদলে গেলেও সবকিছু বদলায় না। সময়ের ঘূর্ণি হাওয়ার মধ্যেও সেসব বদলায় না - হোক তা ভালো বা মন্দ। নইলে পৃথিবীজুড়ে এতো পরিবর্তনের মধ্যেও আমরা কীভাবে নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব জীবনযাপন করি! কিভাবে ঘড়ির দু'টো কাঁটার মতো মিলি রাতের গভীর যামে!


আরেক কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান লিখেছিলেন, প্রতিদিন কতো খবর আসে যে কাগজের পাতা ভরে...। হ্যাঁ, আসে। কিন্তু আমাদের চেতনাকে বুঝি তা আর আঘাত করে না।


প্রতিদিন ভোরে কাগজ এলেই দেখি অসংখ্য দুঃসংবাদ। মিয়ানমার থেকে ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক, প্যালেস্টাইন - কোথায় নয়? আমরা কাগজ খুলে ওসব দেশের মানুষের দুর্দশার খবর পড়ি, নারী ও শিশুদের আর্তনাদ শুনে হয়তো ঈষৎ কেঁপেও উঠি, তারপর সব ভুলে যাই। এবং তারপর কাগজের পাতা উল্টিয়ে অন্য খবরে চলে যাই।


সেখানে দেখি, বলিউডের ক্ষীণতনু জনপ্রিয় অভিনেত্রী শ্রদ্ধা কাপুর নাকি আরও স্লিম হওয়ার জন্য মাসে খাবারের পিছনে খরচ করছেন দেড় লাখ টাকা! অপর দুই অভিনেত্রী কারিনা কাপুর ও পরিণীতি চোপড়া তো নাকি ফিটনেস মেকওভারের আগে প্রায় হরিমটর খেয়েই থাকতেন! সম্প্রতি সেদেশের অভিনেত্রী আলিয়া ভাট বলেছেন, বলিউড বাদশা নামে পরিচিত অভিনেতা শাহরুখ খান সারাদিন কফি ছাড়া কিচ্ছু খান না।


কী আশ্চর্য! যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনের পাঁচ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত শিশু যখন খাদ্যের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে কিংবা মরতে শুরু করেছে, পুরো দেশের অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং দেশটির অর্ধেক জনগোষ্ঠীই টিকে থাকবার অবলম্বন হারিয়ে ফেলেছে, তার পাশাপাশি কেউবা আবার স্লিম হওয়ার প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় লিপ্ত।


মিয়ানমারের পাহাড়ি নদীর পাড়ে মুখ থুবড়ে মরে পড়ে থাকা ১০ মাস বয়সী রোহিঙ্গা মুসলিম শিশু মোহাম্মদ তোয়াহার অকালে করুণ মৃত্যুও আমাদের রুদ্ধ বিবেকে ঝড় তোলে না। আমরা খাচ্ছিদাচ্ছি, ধারালো ব্লেডে শেভ করছি, তারপর ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি।


জানি, এটাই বাস্তবতা। হয়তো জীবন এমনই। আইলান-তোয়াহারা মরবে, নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ হতে থাকবে ফিলিস্তিনি ও রোহিঙ্গারা, জ্বলে-পুড়ে ছারখার হতে থাকবে ইয়েমেন ইরাক সিরিয়া। আর তারই পাশাপাশি শত কোটি টাকার মালিক হয়েও স্লিম হওয়ার জন্য না খেয়ে থাকবেন তারকারা। দু'টোই না-খেয়ে থাকা। কিন্তু দু'টোর মাঝে কী দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধান!


কাউকে দোষ দিই না। হয়তো এটাই জীবন। তারপরও চোখ ফেটে দু'ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে কেন? তবে কি আমাদের শরীরের ভেতর কোথাও এখনো মনুষ্যত্ব ধুকপুক করে?

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com