ছোট খবর, বড় সম্ভাবনা
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৭:২৩
ছোট খবর, বড় সম্ভাবনা
প্রিন্ট অ-অ+

আমরা কতো কিছুই না আমদানি করি! সুঁই থেকে বিমান - কিছুই বাদ নেই ওই তালিকায়। কিন্তু যদি বলি, আমাদের আবর্জনা বা বর্জ্যও আমদানি করা দরকার, তাহলে সবাই নিশ্চয়ই রে রে করে তেড়ে আসবেন।


আসাই স্বাভাবিক। কারণ, আমাদের যতো কিছুর অভাবই থাকুক না কেন, বর্জ্য বা ময়লা-আবর্জনার অভাব অন্তত নেই। ও জিনিস সৃষ্টিতে আমাদের কুশলতাও তর্কাতীত। আমাদের পথে-ঘাটে, অফিস-আদালতে, হাসপাতালে, ট্রেন স্টেশনে, বাস টার্মিনালে হরেক রকম বর্জ্য সতত শোভাবর্ধন করে চলেছে আর বিলিয়ে চলেছে উৎকট গন্ধ। আমরা এসব কিছুর সঙ্গে দিব্যি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে শিখে গেছি।


অথচ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো ইতিমধ্যেই বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতি উদ্ভাবন ও ব্যবহার করে চলেছে। আর আমরা ওসবের কোনো খবরই রাখি না, কেবল আবর্জনার মাঝে হাবুডুবু খেয়েই চলেছি।


এই হাবুডুবুর মাঝখানেই একটি ছোট খবর বিশাল সম্ভাবনার বার্তা (যদি আমরা কাজে লাগাতে চাই) নিয়ে এলো আমাদের জন্য।


খবরে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশ বলে পরিচিত সুইডেন আবর্জনা বা বর্জ্য আমদানি করছে। নতুন কোনো উদ্ভাবন কিংবা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য নয়, নিতান্ত বাধ্য হয়েই।


খবরে বলা হয়, সুইডেনে প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সুইডেন বিশ্বে এক নম্বর। এই বিদ্যুৎ দিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেনের ৯৮ লাখ মানুষ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা থেকে নিজেদের বাঁচায়। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে পরিমাণ আবর্জনা পোড়ানোর দরকার, সেই পরিমাণ আবর্জনা সুইডেনে আর মিলছে না। এর ফলে সমস্যায় পড়েছে দেশটির ময়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। আবর্জনার অভাবে দেশটির প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে।


খুব ছোট খবর, কিন্তু এর মাঝেই লুকিয়ে আছে বিশাল সম্ভাবনা। সুইডেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরাও গড়ে তুলতে পারি অসংখ্য বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। তাতে আমাদের বর্জ্য ও বিদ্যুৎ - উভয় সমস্যারই সমাধান হবে।


এই প্রযুক্তিটি বাংলাদেশে চালু করা কি খুব কঠিন কিছু?


এরই মধ্যে আরেকটি ছোট খবর আমাদের আলোড়িত করেছে। সহযোগী এক অনলাইন দৈনিকে প্রকাশিত এই খবরে বলা হয়, মালয়শিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশী বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. শহীদুল ইসলাম দাবি করেছেন, ট্যানারির পানি সুপেয় করে মানুষকে খাওয়াবেন তিনি। টেক্সটাইলের বর্জ্যও বিশুদ্ধ করবেন। টেক্সটাইল বর্জ্য রিসাইকেল করে ইন্ডাস্ট্রিকে ফিরিয়ে দেবেন লবণ। রান্নাঘরের দূষিত পানি ও বর্জ্য পরিশোধন করে পানি তো ফেরত দেবেনই, সঙ্গে দেবেন শিল্পকারখানায় ব্যবহারউপযোগী মিথেন গ্যাস আর হাই কোয়ালিটির অর্গানিক সার। প্রতিদিন ঢাকা শহরে যতো বর্জ্য ফেলা হয় তা দিয়েই তিনি মিটিয়ে দেবেন গোটা ঢাকার বিদ্যুতের চাহিদা।


বাংলাদেশি এই বিজ্ঞানী ড. শহীদুল ইসলাম বোর্নিও দ্বীপের ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া সারাওয়াকের একজন স্কলার। ১৯৯৪ সালে ঢাকায় ট্যানারি প্রসেস শুরু হয় তার তত্ত্বাবধানেই। এছাড়া তিনি ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের রিসার্চ ডাইরেক্টর।


তিনি বলেন, যতো ট্যানারি আছে সবগুলোর সব পানিই বিশুদ্ধ করা সম্ভব। রিসাইকেল করে ফিরে পাওয়া সম্ভব ৮০ শতাংশ পানি। চামড়ার পানিতে যে বর্জ্য থাকে সেটাকে শতভাগ মিথেন গ্যাসে পরিণত করা যাবে। ১ লিটার পানিতে গ্যাস পাওয়া যাবে .৩১ ঘনফুট। এই পানি বিশুদ্ধ করলে ডাবল লাভ। ১ টাকা খরচ করলে ৩ টাকা ফেরত আসবে।


তিনি বলেন, টেক্সটাইলের পানিও রিসাইকেল হবে। একটা টেক্সটাইল ঘণ্টায় ১শ’ ঘনমিটার পানি নদীতে ফেলে। এই পানি থেকে ঘণ্টায় ৫২ ঘনমিটার মিথেন গ্যাস তৈরি সম্ভব, একই সঙ্গে ৯০ ঘনমিটার পানিও ফেরত আসবে। রান্নাঘরের বর্জ্য, গোসলের পানি আর ইউরিনও রিসাইকেল করে বিশুদ্ধ পানি, গ্যাস ও সার পাওয়া সম্ভব।


তিনি বলেন, মাছের কাঁটা আর মুরগির হাড়ও শতভাগ সার্কুলেট করা সম্ভব। প্রতিদিন রান্নাঘরের যে ময়লা ফেলা হয় তার পানি রিসাইকেল করে পাওয়া যাবে গ্যাস এবং হাই কোয়ালিটির অর্গানিক সার। ঢাকা শহরে প্রতিদিন যে পরিমাণ ময়লা ফেলা হয় তা থেকে ঢাকা শহরেরই প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে।


প্রবাসী বিজ্ঞানীর কথা শুনলে আকাশকুসুম বলেই মনে হবে। সব বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের আগেই মানুষ সন্দেহ করেছে, পাশাপাশি কেউ কেউ এগিয়েও এসেছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে।


আমরা কি এই বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারি না যে তিনি যা বলছেন তা কি আদৌ বাস্তবায়ন সম্ভব? আলাপ-আলোচনা করা বা কথা বলা কি খুব কঠিন কিছু?


কবি বলেছেন, যেখানে দেখিবে ছাই/ উড়াইয়া দেখ তাই/পাইলে পাইতে পারো/অমূল্য রতন। দু'টি ছোট খবর অমূল্য রতনের সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের কাছে এসেছে। আমরা কি সে সম্ভাবনাকে ব্যবহারে উদ্যোগী হবো?

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com