দখিন হাওয়ায় কানন উচাটন
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৬, ১২:৫০
দখিন হাওয়ায় কানন উচাটন
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

উচাটন আর উচ্চাটনকে সমার্থক মনে হতে পারে। এ কারণে কেউ কেউ মারণ-উচাটনও লিখেন (যে লোক শুধু মারণ-উচাটন বিদ্যে শিখে মন্ত্র জপতে শুরু করেছে- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)। অথচ উচাটন বিশেষ্য ও বিশেষণ। কিন্তু উচ্চাটন শুধুই বিশেষ্য।


উচাটন মানে উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠিত, উদ্বিগ্ন, ব্যাকুল (কারে বলবো আমার মনের বেদনা, এমন ব্যথায় ব্যথিত মেলে না, যে দুখে আমার মন আছে সদায় উচাটন বললে সারে না- লালনগীতি; পান ক’রে ওই ঢুল্ছে নেশায়, দুল্ছে মহুল বন, ফুল-সৌখিন্ দখিন হাওয়ায় কানন উচাটন!- চৈতী হাওয়া, কাজী নজরুল ইসলাম; কি কারণে দুঃখোদয় কিসের স্মরণে, কিছুই বুঝি না তবু, উচাটন মনে- বাল্যরচনা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; প্রাণনাথ কেমন করিব আমি? তোমা বিনে মন করে উচাটন কে জানে কেমন তুমি- বসন্তবায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


অন্যদিকে উচ্চাটন অর্থ উচ্ছেদ, বিনাশ ও শত্রু পীড়নের জন্য অভিচার বা ক্রিয়াকর্ম। এ কারণে মারণ শব্দের সাথে উচ্চাটন বসে (মারণ-উচ্চাটন)।


এদিকে উজবুক শব্দের মূল ‘উজবেগ’। মধ্য-এশিয়ার উজবেকিস্তানের অধিবাসীরাই উজবেক। এ উজবেক থেকে এসেছে উজবুক। তারা মোগল-তুর্কি সৈন্য হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশে এসেছিল। বলা হয়ে থাকে, তারা বিচার বুদ্ধিহীনভাবে সেনাপতির আদেশ পালন করতো বলে ক্রমে ‘নির্বোধ’ ব্যক্তি অর্থে উজবুক শব্দটি চালু হয়ে যায়।


সংস্কৃত পণ্ডিত পরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য তার ‘ভাষাবিদ্যা পরিচয়’ গ্রন্থে উজবুক শব্দটি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বাংলা ‘অজ’ ও ‘বোকা’ শব্দ ও অনুষঙ্গও এতে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।’


জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর অভিধানে প্রাচীন বানান উজবককেই প্রাধান্য দিয়েছেন। বিশেষ্যে শব্দটি দিয়ে উজবক জাতীয় সৈন্যও বোঝায় (যবন কিরাত শক আগুদলে উজবক, খোরাসানি মোগল পাঠান- কবিকঙ্কণ চণ্ডী)। বিশেষণে নির্বোধ, আহাম্মক বোঝায় উজবক শব্দটি দিয়ে (শুয়োর-পাজি-ছুঁচো-উল্লুক-গাধা-ড্যাম-ব্লাডী-ফুল বেল্লিক-বেলেল্লা-উজবক- কাজী নজরুল ইসলাম)। অবশ্য বিশেষণে অশিক্ষিত বা আহাম্মক অর্থে উজবকের ব্যবহার নতুন নয় (উজবক জলবাশে ঘেরিয়াছে চারি পাশে- ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর)।


সৈয়দ মুজতবা আলী ‘উজবুক’ শব্দটি ব্যবহার করতেন (বাঙলা ভাষায় এদের বলে উজবুক, শবনম্; আমাকে উজবুক পেয়ে সে তার কর্তব্য শেয়ালদার কাপ্টেনদের মত তখনি স্থির করে নিয়েছে- দেশে বিদেশে)।


ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘ডমরু’ উপন্যাসে উজবুক বানানটি রেখেছেন (দেশের যত উজবুক যাহাতে তাহার গোঁড়া হয় সে জন্য আমি চেষ্টা করিতে লাগিলাম)। সুকুমার সেনও উজবুক শব্দটি ব্যবহার করতেন। তিনি তার ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে উজবুক শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘এই অর্থ পরিবর্তনে ‘অজ’ ও ‘বোকা’ শব্দের প্রভাবও আছে।’


আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বোকা অর্থে অজবুগ শব্দটি ব্যবহার করেছেন (আমি বলতুম, ওরা যে আমাদের অসভ্য অজবুক মনে করে যাবে- ঘরে বাইরে)। তিনি উজবুক শব্দটিও ব্যবহার করতেন (লোকেও তাঁহাকে একটা উজবুক-রকমের মনে করিত এবং লোকেরও দোষ দেওয়া যায় না- তারাপ্রসন্নের কীর্তি)।


হিন্দিতে বোকা, আহাম্মক ও বুনো অর্থে উজবুক শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ফারসিতে একই অর্থে উযবক শব্দটি চালু রয়েছে। ফারসিতে শব্দটি দিয়ে তাতার জাতির একটি শাখাও নির্দেশিত হয়।


জিয়াউদ্দিন সাইমুমের ব্লগ থেকে


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com