প্রচ্ছন্ন কুটীরে অশ্বত্থ ছায়ায়
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০১৬, ০৮:১৯
প্রচ্ছন্ন কুটীরে অশ্বত্থ ছায়ায়
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

সংস্কৃত ‘অশ্বত্থ’ শব্দের একাধিক ব্যুৎপত্তি চালু রয়েছে। এটা বট জাতীয় গাছ। এ গাছের তলে অশ্ব থাকতো বলে, এটার নাম হয়েছে অশ্বত্থ। গাছের মূলে জল থাকায়ও এটার নাম অশ্বত্থ হতে পারে। আবার গ্রীস্মকালে ধর্মার্থে লোকে জলসেক করার কারণেও এটার নাম অশ্বত্থ হতে পারে। বাতাসে এ গাছের পাতা নড়ে বলে এ গাছের আরেক নাম পিপ্পল ও চল-দল। পিপ্পল অর্থেও জল আছে। অশ্বত্থ গাছ হিন্দিতে পীপল, মরাঠিতে পিপল এবং ওড়িয়াতে অশ্বস্থ নামে পরিচিত।


জীবনানন্দ দাশের কবিতায় অশ্বত্থ গাছের কথা এসেছে: থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বত্থের ডালে বসে এসে, চোখ পাল্টায়ে কয় বুড়ী চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে। রবীন্দ্রনাথের কবিতায়ও শব্দটি সাবলীলভাবে এসেছে: নদীতীরে কোন এক গ্রাম প্রান্তে প্রচ্ছন্ন কুটীরে অশ্বত্থ ছায়ায়। আর কায়কোবাদ লিখেছেন, ‘শিখিবৃন্দ অশ্বত্থের সাথে নাচিছে শিখিনী সনে’।


কথিত আছে, এই তরুতলেই তপস্যা করে গৌরী তাঁর শোকতাপ মুক্ত হয়ে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। সেই থেকে নাকি এর নাম হয়েছে অশোক (অমরকোষ)। ভগবান বিষ্ণুরও এক নাম অশোক। আর মগধের রাজা অশোকের কীর্তি তো অক্ষয় হয়েই আছে ইতিহাসের পাতায়।


অশোক নিয়ে পুরাণ কাব্যে উচ্ছ্বাসের অন্ত নেই। সংস্কৃত কবিরা ভাবতেন, অশোক ফোটে লাস্যময়ী তরুণীদের পদস্পর্শে। দেবেন্দ্রনাথ সেন অশোকগুচ্ছ নামে কাব্যই রচনা করেছেন। এতে আছে, ‘হে অশোক, কোন রাঙ্গা চরণচুম্বনে মর্ম্মে মর্ম্মে শিহরিয়া হলি লালে লাল।’ আর রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘আসতো তারা কুঞ্জবনে চৈত্র জ্যোৎস্নারাতে, অশোক শাখা উঠত ফুটে প্রিয়ার পদাঘাতে।’ প্রিয়ার পদস্পর্শ পাক আর না-ই পাক, বসন্তের স্পর্শে রক্তিম হয়ে যায় অশোকের শাখা।


বসন্ত যেমন প্রেমের ঋতু, তেমনি অশোকও প্রেমের ফুল। প্রেমের দেবতা কন্দর্পের পঞ্চশরের অন্যতম রক্তিম অশোক (অরবিন্দ, অশোক, চূত, নবমল্লিকা, নীলোৎপল)। আবার অশোক আছে পঞ্চবটীতেও (অশ্বত্থ, অশোক, বট, বিল্ব আমলকী)।


ইংরেজিতে অশোক গাছের নাম bo tree। এটা ডুমুর গোত্রীয় গাছ। এই গাছের ইংরেজি নামগুলো হচ্ছে pipal, pipal tree, pipul, peepul, sacred fig, bo tree। আর বৈজ্ঞানিক নাম Ficus religiosa।


পালি ভাষায় ‘বো’ অর্থ জ্ঞান বা বোধি। বৌদ্ধধর্ম মতে, সিদ্ধার্থ এ গাছের তলে ধ্যান করে বুদ্ধ (মহাজ্ঞান) লাভ করে দিলেন। হিন্দু ধর্মের অশ্বত্থ গাছ পবিত্র।


অশ্বত্থ বৃক্ষের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের সম্পর্ক রয়েছে। অর্জুন প্রশ্ন করেন জগতের কোন বস্তুর সাথে ব্রহ্মের সাদৃশ্য আছে। বাসুদেব বললেন তাকে অশ্বত্থ বৃক্ষের ন্যায় কল্পনা করো।


কবিতায় অশথ শব্দটি ব্যবহৃত হতে পারে (কোথা সে ছায়া সখী, কোথা সে জল! কোথা সে বাঁধা ঘাট, অশথতল! ছিলাম আনমনে একেলা গৃহকোণে, কে যেন ডাকিল রে ‘জলকে চল্’- বধূ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


আড়াই হাজার বছর আগেই অশ্বত্থ গাছের নাম ‘বোধিদ্রুম’ বা ‘বোধিবৃক্ষ’ হয় বলে জাতকে রয়েছে। গৌতম বুদ্ধ এই গাছের তলে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন বলে এ গাছের নাম হয় বোধিদ্রুম। আর পৌরানিক যুগে এই গাছের নাম ছিল ‘ধর্মবৃক্ষ’। বহুদিন বাঁচে বলেই এই গাছের নাম হয়েছে অশ্বত্থ। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই গাছ অত্যন্ত পবিত্র। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতে, গয়ায় এই জাতীয় গাছের নিচে ধ্যানমগ্ন থাকা অবস্থায় গৌতম বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। সেই কারণে এর অন্য নাম বোধিবৃক্ষ।


হিন্দু ধর্মমতে এই বৃক্ষ বিষ্ণুরূপী। এই গাছের উৎপত্তি নিয়ে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে দুটি গল্প প্রচলিত আছে। গল্প দুটি হলো: একদিন মহাদেব ও পার্বতী নির্জনে ক্রীড়া-কৌতুকে মত্ত ছিলেন। এমন সময় দেবতাদের আদেশে সেখানে অগ্নিপ্রবেশ করলে পার্বতী রাগান্বিতা হয়ে দেবতাদেরকে অভিশাপ দিয়ে বলেন, তোমরা বৃক্ষযোনি প্রাপ্ত হও। সে কারণে বিষ্ণু অশ্বত্থ বৃক্ষ হয়ে জন্মেছিলেন।


আরেক উপাখ্যানে বলা হয়েছে, জলন্ধর নামক এক রাক্ষস স্বর্গ দখলের উদ্দেশ্যে দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলে ইন্দ্র পরাজিত হন এবং মহাদেবের কাছে এর প্রতিকার চান। ফলে মহাদেবের সঙ্গে জলন্ধরের এক যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এই যুদ্ধে জলন্ধরের অনিবার্য পরাজয় জেনে, তাঁর পত্নী বিন্দা স্বামীর প্রাণ রক্ষার্থে বিষ্ণুর তপস্যা করতে থাকেন। ফলে মহাদেব জলন্ধরের হত্যা করতে অপারগ হয়ে ওঠেন। জলন্ধরের অমর রূপ দেখে দেবতারা শঙ্কিত হয়ে বিষ্ণুর কাছে যান। বিষ্ণু জলন্ধরের রূপ ধরে বিন্দার কাছে গেলে বিন্দার তপস্যা ভেঙে যায়। ফলে জলন্ধরের মৃত্যু ঘটে। বিন্দা বিষয়টি অবগত হয়ে বিষ্ণুকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হলে- বিষ্ণু তাঁকে বলেন যে তুমি তোমার পতির অনুগামিনী হও, তোমার ভষ্মে যে বৃক্ষ জন্মাবে, তা আমার স্বরূপ হবে, সে বৃক্ষের পূজা করলে আমি পরিতৃপ্ত হব। পরে বিন্দার ভষ্ম থেকে তুলসী, ধাত্রী, পলাশ ও অশ্বত্থ বৃক্ষ জন্মে।


জিয়াউদ্দিন সাইমুমের ব্লগ থেকে


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com