বাংলা ভাষার বহুল বিতর্কিত শব্দ ‘সৃজন’
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০১৭, ০৯:২৩
বাংলা ভাষার বহুল বিতর্কিত শব্দ ‘সৃজন’
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘সৃজন’ শব্দটি আর্ষপ্রয়োগের দৃষ্টান্ত হতে পারে। প্রাচীনকালেও শব্দটির প্রয়োগ ছিল বলে জানা গেছে। তবে বাংলার গদ্য সাহিত্যের যুগে সৃজন শব্দটি চালু করেছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এ কারণে অভিযুক্তও হয়েছিলেন। শব্দটির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক খুবই তুঙ্গে উঠেছিল। তাই খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত আশঙ্কা করেছিলেন বোপদেবের সূত্রে সৃজন শব্দটিকে মোচড় দিয়ে সংস্কৃত পণ্ডিতরা হয়তো ‘সর্জন’ করে ছাড়বেন।


তবে শব্দটি এখন তরতরিয়ে চলছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব’ গ্রন্থে লিখেছেন: ‘শুনেছি’ ‘সৃজন’ শব্দটা ব্যাকরণের বিধি অতিক্রম করেছে, কিন্তু যখন বিদ্যাসাগরের মতো পণ্ডিত কথাটা চালিয়েছেন, তখন দায় তারই, আমার কোনো ভাবনা নেই। অনেক পণ্ডিত ‘ইতিমধ্যে’ কথাটা চালিয়েছেন, ‘ইতোমধ্যে’ কথাটার ওকালতি উপলক্ষে আইনের বই ঘাঁটবার প্রয়োজন দেখিনে- অর্থাৎ এখন ঐ ইতিমধ্য শব্দটার ব্যবহার সম্বন্ধে দায়িত্ব বিচারের দিন আমাদের হাত থেকে চলে গেছে।’


বাংলা সৃজন মানে সৃষ্টি, নির্মাণ, রচনা (যার লাগি সদা ভয়, পরশ নাহিক সয়, কে তারে ভাসালে হেন জড়ময় সৃজনের স্রোতে- নিষ্ঠুর সৃষ্টি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; ইহা জানি মনে হেন করে না গুমান। দেখাদার সৃজন দুই একাই সমান- হেয়াত মাহমুদ; ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর, প্রলয় নতুন সৃজন বেদন, আসছে নবীন জীবনহারা অসুন্দরের করতে ছেদন- কাজী নজরুল ইসলাম; জিঘাংসা শোণিতপায়ী করিছে গর্জন, কারুণ্য ঔদার্য মৈত্রী শিষ্টতা সর্জন, উত্তমর্ণ- সুধীন্দ্রনাথ দত্ত; সৃজন-উৎসবের আজি, হে নবীন, খুলে দাও দ্বার, আনো তব নব উপহার, জয়যাত্রা- আব্দুল কাদির; সৃষ্টিছাড়া সৃজন কত মতো পক্ষীরাজ উড়িছে শত শত- সোনার তরী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; মননই সৃজনের জনক, সৃজনেই মননের সমৃদ্ধি- যতীন সরকার; ‘অনুবাদিত’ কথাটা বাংলায় চলিয়া গেছে, আজকাল পণ্ডিতেরা অনূদিত লিখিতে শুরু করিয়াছেন, ভয় হয় পাছে তাঁহারা সৃজন কথার জায়গায় ‘সর্জন’ চালাইয়া বসেন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


আসলে সৃজন শব্দটি নতুন নয়, বেশ বয়সী। চণ্ডীদাসের কবিতাতেও শব্দটির সাবলীল ব্যবহার রয়েছে (আঁখি তারা দুটি বিরলে বসিয়া সৃজন করেছে বিধি। নীলপদ্ম ভাবি লুবধ ভ্রমরা ফুটিতেছে নিরবধি)।


এদিকে সংস্কৃতে সৃষ্ট (সৃজ্ + ত) অর্থ নির্মিত (নারীর যে পুরুষের মতো ব্যক্তিত্ব আছে, সে যে অন্যের জন্য সৃষ্ট নয়, তাহার নিজের জীবনের যে সার্থকতা আছে, তাহা স্ত্রীশিক্ষার স্বপক্ষের বা বিপক্ষের কোনো উকিল স্বীকার করেন না- স্ত্রীশিক্ষা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; যদি কখনও সৃষ্ট জীবে দৈবশক্তির আবির্ভাব সম্ভব হয়, তবে ইহাই সেই দৈবশক্তি- অব্যক্ত, জগদীশচন্দ্র বসু), নিবেশিত, প্রচুর, ত্যক্ত, ভূষিত, প্রযুক্ত, নিঃসারিত, মুক্ত।


কিন্তু বাংলায় সৃষ্ট মানে রচিত, উদ্ভাবিত (তাহা মহাম্মদ আলিরই সৃষ্ট সংস্কৃত- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


সৃষ্ট শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ হচ্ছে সৃষ্টি। সংস্কৃতে সৃষ্টি শব্দের হরেক অর্থ রয়েছে। কিন্তু বাংলায় সৃষ্টি অর্থ রাজ্য (কি কব করের কথা জয়পত্র লিখে। সঁপিনু সকল সৃষ্টি সদাশয় দেখে- ঘনরামের ধর্মমঙ্গল)। মজার ব্যাপার হলো বাংলায় জগত, মাটিও সৃষ্টি (বাইরেতে মেঘ ডেকে উঠে সৃষ্টি ওঠে কাঁপি)।


আবার বাংলা ভাষায় সেঁউতি (সেঁওতি বানানভেদ) শব্দটি সংস্কৃত ‘সেচনী’ থেকে যেমন এসেছে, তেমনি সংস্কৃত ‘সেবন্তী’ থেকেও এসেছে। সেচনী থেকে আসা সেঁউতি মানে নৌকার পানি সেঁচবার জন্য ব্যবহৃত পাত্রবিশেষ (রাখিলা দুখানি পদ সেঁউতি উপরে- ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর; পাঁচটি বৈঠা পাছ-গলুইয়ে, পিঁড়ায় বাঁধা দড়ি, আকাশ-সেঁউতি দিয়ে নৌকা সেচো পড়িমরি- ডোমনি, চর্যাপদ থেকে অনুবাদ সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ)।


আর সেবন্তী থেকে আসা সেঁউতি অর্থ এক ধরনের সাদা গোলাপ ফুল (যদি সেঁউতি পরে চরণ পড়ে- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত; তটের চরণে তটিনী ছুটিছে, ভ্রমর লুটিছে ফুলের বাস সেঁউতি ফুটিছে, বকুল ফুটিছে ছড়ায়ে ছড়ায়ে সুরভিশ্বাস- ফুলবালা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সেই স্পর্শে যূথী, জাতি, মল্লিকা, শেফালিকা, কামিনী, গোলাপ, সেঁউতি-সব ফুলের ঘ্রাণ পাইলাম- রজনী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com