সাক্ষীগোপাল এক সাঙাত
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০১৭, ১২:০১
সাক্ষীগোপাল এক সাঙাত
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

মূলানুগ দিক থেকে ‘সাক্ষীগোপাল’ হচ্ছে পুরীর নিকটবর্তী স্থান বিশেষ বা ওই স্থানে প্রতিষ্ঠিত শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ বিশেষ। তবে শব্দটি বাংলা ভাষায় আলঙ্কারিক অর্থেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।


আলঙ্কারিক অর্থে সাক্ষীগোপাল মানে যে ব্যক্তি নিজে নিষ্ক্রিয় থেকে অন্যের কার্যকলাপ লক্ষ্য করে বা ঘটনা দেখে অথচ পুতুলের মতো নিষ্ক্রিয় ব্যক্তি (তাহার সহধর্মিনী, তৎকালে সাক্ষীগোপালস্বরূপ ছিলেন- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর; সাক্ষীগোপালরা সমাজেরও শত্রু, নিজেদেরও শত্রু)।


শব্দটির পেছনে একটি ইতিহাস রয়েছে। চৈতন্যচরিতামৃত মতে, ‘ইনি বিদ্যানগরের এক ব্রাহ্মণের পক্ষে তার বিয়ের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে বৃন্দাবন হতে কটক এসেছিলেন। ইনি সাক্ষীরূপে কিছুই বলেননি। কারণ তার আগমনই সাক্ষীর কাজ করেছিল।’


এ প্রসঙ্গ থেকে নিজের কাজে উদাসীন বা অনাবিষ্ট ব্যক্তিকে বাংলা ভাষায় সাক্ষীগোপাল বলা হয়। অবশ্য শব্দটি এখন নেতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। বিশেষত, যারা বা যে ব্যক্তি কর্তার ইচ্ছামতো কোন ব্যাপারে ক্রীড়ানক সাজেন, তারা বা তিনি সাক্ষীগোপাল। সাক্ষিগোপাল বানানভেদ।


অন্যদিকে ড. নীহাররঞ্জন রায় (বাঙালীর ইতিহাস আদি পর্ব) মতে, বৌদ্ধ বাংলা ‘সংঘ’ থেকে বাংলায় ‘সাঙাত’ শব্দটি এসেছে। আবার একই উৎস থেকে হিন্দি ‘সংঘত’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। হিন্দি ‘সংঘত’ মানে ঘনিষ্ঠ।


উদাহরণ: কোটালের পুত্র এবং সদাগরের পুত্র ব্যাকুল হইয়া রাজপুত্রকে কহিল, ভাই সাঙাত, এই নিরানন্দ ভূমিতে আর একদণ্ড নয়- একটি আষাঢ়ে গল্প, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।


‘দ্বিতীয় স্বামী’ অর্থেও শব্দটির প্রচলন দেখা যায় (আসলে বাড়ি বাড়ি ঝি’য়ের কাজ করে যার দিন গেছে তাছাড়া জোয়ানকালে জামাই মরছে, তাই শইল্যের ত্যাজ সবটুক জমা রইয়া গ্যাছে। অহনো সাঙাত দরকার...- দীলতাজ রহমান, আলোকিত বিশ্বের প্রতিশ্রুতি)।


সাঙ্গাত বানানভেদ (মজা কি জান সাঙ্গাত? আগুন জ্বালছি, জ্বালিয়ে রাখছি, তুমি আমি পোড়াচ্ছি, পুড়ছি তুমি, আমি, আমরা, আমাদের- যুবনাশ্ব না, মণীশ ঘটক)।


তবে বেশির ভাগ অভিধানে বলা হয়েছে, সংস্কৃত ‘সঙ্গ’ থেকে বাংলা ভাষায় সাঙাত শব্দটি এসেছে। মূলানুগ অর্থে সাঙাত ইতিবাচক শব্দ। কারণ সাঙাত অর্থ বন্ধু, মিতা, সখা (কি বল ভাই সাঙাত- কাজী নজরুল ইসলাম)।


কিন্তু শব্দটি এখন মন্দার্থেই ব্যবহৃত হয়। মন্দার্থে সাঙাত মানে অপকর্মের সহযোগী, সহচর বা সহকর্মী (সাঙাতসহ সে এখন কারাগারে)। সাঙ্গাত বানানভেদ।


সাঙাত থেকে বাংলায় বিশেষ্যে সাঙাতি শব্দটি এসেছে (সাঙ্গাতি বানানভেদ)। এটার অর্থ মিত্র বা বন্ধুবান্ধব (পাড়ার সই সাঙাতিদের সঙ্গে মিলিবার জন্যই তখন আমার মন ছুটিত- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। সাঙাতি শব্দটি দিয়ে মিত্রতা বা বন্ধুত্বও বোঝায়।


সাঙাৎ এর স্ত্রীলিঙ্গ সাঙাতনি (সে গুমরে উঠে বললে, ‘তোমরা সবাই যাও, একবার আমার স্যাঙাৎনিকে ডেকে দাও’- সুয়োরানীর সাধ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


স্যাঙাত বানানভেদ (বড় সাহেব আর গারোয়ান দুই স্যাঙাতই এক সমান- নজরুল রচনাবলী)।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com