সহজিয়া সহবাস সহবসতি
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৭, ০৯:০০
সহজিয়া সহবাস সহবসতি
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

সহজিয়া একটি জোড়কলম শব্দ। সংস্কৃত ‘সহজ’ ও বাংলা ‘ইয়া, ই, ঈ’ যোগে সহজিয়া শব্দটি গঠিত। বিশেষ্যে সহজিয়া মানে সাধন পদ্ধতি। যেমন বৌষ্ণব সহজিয়া, বৌদ্ধ সহজিয়া। আর বিশেষণে সহজিয়া মানে সহজাত, স্বাভাবিক, সাধারণ (সে এসে সহসা হাত রেখেছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)।


প্রায়োগিক অর্থে উদাসীন আউল চাঁদ কর্তৃক উপদিষ্ট জাতিবর্ণনির্বিশেষে পালনীয় ধর্ম বিশেষই সহজিয়া। এই ধর্মে দশটি গুরুপদেশের মধ্যে দুটি বিধি ও আটটি নিষেধ রয়েছে। বিধি হচ্ছে সত্য বলা ও সঙ্গে চলা, মাতাপিতাকে সমাদর ও প্রতিবাসীকে (প্রতিবেশী) ভালোবাসা। অন্যদিকে নিষেধ হচ্ছে মিথ্যা বলা, হিংসা করা, পরদার করা (অন্যের স্ত্রীর কাছে গমন), চুরি করা, উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ, মাছ খাওয়া, মাংস খাওয়া, মদপান করা।


আউল চাঁদের শিষ্যে রামশরণ পাল এই ধর্ম প্রচার করে ‘কর্তামহাশয়’ নামে অভিহিত হয়েছেন। আর এ সম্প্রদায় ‘কর্তাভজা’ নামে পরিচিত। এই ধর্মের গুরুর নাম ‘মহাশয়’ আর শিষ্যের নাম ‘বরাতি’।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘সাহিত্যে নবত্ব’ প্রবন্ধে সহজপন্থা অর্থে ‘সহজিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন (এঁরা অনেকেই সাহিত্যে সহজিয়া সাধন গ্রহণ করেছেন, তার প্রধান কারণ এটাই সহজ)।


অন্যদিকে মূলানুগ অর্থে সহবাস অর্থ এক সংগে অবস্থান, সংসর্গ (এই মহাশয়ের সঙ্গে অনেক দিন সহবাস করিয়াছিলাম- প্যারিচাঁদ মিত্র; হেন সহবাসে হে পিতৃব্য বর্বরতা কেন না শিখিবে? গতি যার নীচসহ, নীচ সে দুর্মতি- মাইকেল মধুসূদন দত্ত; মোসলমান সহবাসে প্রায় দিবারাত্তির থেকে ঐ কেতাই এঁর বড় পচন্দ- হুতোম প্যাঁচার নকশা, কালীপ্রসন্ন সিংহ; তবে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, তুমি স্ত্রীলোক হইয়া সর্বদা জীবানন্দ ঠাকুরের সহবাস কর কেন?- আনন্দমঠ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; নারীর সঙ্গ যাহাদের পক্ষে একান্ত উপাদেয় আমি সেই সামান্যশ্রেণীর মানুষ নই এবং দেশের ইতরসাধারণের ঘনিষ্ঠ সহবাস আমার পক্ষে সম্পূর্ণ বর্জনীয়- গোরা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


শব্দটিকে সংস্পর্শ বা সান্নিধ্য অর্থেও ব্যবহার করেছেন প্যারিচাঁদ মিত্র (সহবাসের দ্বারা এক রকম মন অন্য আর এক রকম হইয়া পড়ে)।


কিন্তু শব্দটি দিয়ে বাংলায় শুধু স্বামী-স্ত্রীর যৌনমিলন বোঝায় (নতুন বিবাহ হলে গুরুসেবা না করে স্বামী সহবাস করবার অনুমতি ছিল না- হুতোম প্যাঁচার নকশা, কালীপ্রসন্ন সিংহ; অতএব যাহাতে আপনার পুত্রবধূর সঙ্গে আপনার পুত্রের কখন সহবাস না হয় বা প্রীতি না জন্মে, সেই ব্যবস্থা করুন- সীতারাম, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


সংস্কৃতে সহবাস শব্দের সমার্থক শব্দ হল ‘সহবসতি’ (আমি তোমার স্বামী। আমার সহবসতিই তোমার ধর্ম)।


হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গীয় শব্দকোষে বাংলায় সহবাস শব্দের আরেকটি অর্থে লিখেছেন, ‘পতির পত্নীর সহিত অবস্থান’। আর মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর মেঘনাদবধ কাব্যে ‘সঙ্গদোষে’ অর্থে সহবাস শব্দটি ব্যবহার করেছেন (হেন সহবাসে, হে পিতৃব্য, বর্বরতা কেন না শিখিবে?)।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com