সমুদ্রে ডুবে যায় সমুদয়
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৭, ১১:৩২
সমুদ্রে ডুবে যায় সমুদয়
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

সমুদয় সংস্কৃত শব্দ। তবে শব্দটির সংস্কৃত অর্থগুলি বাংলায় অপরিচিত। বিখ্যাত মেদিনীকোষে সমুদয় মানে সমুদগম, সঙ্গম। অন্যদিকে বাচস্পত্য অভিধানে অত্যুন্নতি। আবার অমরকোষের টীকা মতে সমবায়। সাধারণ ভাবে সংস্কৃতে সমুদয় শব্দের অন্য অর্থের মধ্যে রয়েছে ধান্যহরিণ্যাদির উৎপত্তিস্থান, উদয়হেতু, দিবস, যুদ্ধ।


কিন্তু বাংলায় সমুদয় মানে সকল (সম্ভব থেকেই আমি অসম্ভবে চলে যাই, সমুদয় তোরই আহ্বানে- আবুল হাসান; লিখেছে পড়েছে যাহা বঙ্গকুলবালা, সমুদয় ভুলে যাক ভুলে যাক জ্বালা- প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়; সে আমার সহিত যে রূপ ব্যবহার করিল, আমি সমুদয়ই জানিতে পারিয়াছি- বিষাদ সিন্ধু, মীর মশাররফ হোসেন; শুধু চাল চলে নয় দ্রব্য সমুদয়, বিকাতেছে সব অগ্নিমূল্যে, নীলকর- ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত; তখন বাইরের দিকেই আমাদের সমুদয় প্রবৃত্তি, সমুদয় চিন্তা, সমুদয় প্রয়াস- শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; বিষয়-সম্পত্তির সমুদয় ভার সরকার মহাশয়ের উপর দিয়া এবং বসত-বাটীর ভার ব্রজকিশোরের উপর দিয়া অতি সামান্যভাবেই সে বিদেশযাত্রা করিল- চন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; এই দশ সহস্র সেনা সেই পুলের উপর দিয়া পার করিতে গেলে এত ভিড় হইবে যে, বোধ হয়, একটা তোপেই অবলীলাক্রমে সমুদয় সন্তানসেনা ধ্বংস করিতে পারিবে- আনন্দমঠ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; এবং টীকাতে যে সমুদায় ভুল আছে তাহা সংশোধন করিতে চেষ্টা করিয়াছেন- বাংলা শব্দতত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; যে ব্যক্তি স্থাবরজঙ্গমসংবলিত সমুদায় জগতের আধিপত্য লাভ করিয়াও মমতা পরিত্যাগ করিতে পারেন, তাঁহাকে কখনই সংসারপাপে বদ্ধ হইতে হয় না- কৃষ্ণচরিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; স্পষ্ট করে বল না কেন যে সমুদয় টাকাগুলি হাম করিয়াছ- ডমরুচরিত্র, ত্রিলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়)। উল্লেখ্য, শেষের বাক্যে ‘হাম’ মানে আত্মসাৎ।


বাংলা ভাষায় ‘সমুদায়’ বানানটিও শুদ্ধ (সকল পথের সমুদায় আলো জ্বালা হয়েচে- হুতোম প্যাঁচার নকশা, কালীপ্রসন্ন সিংহ)। সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘মনুসংহিতা’ গ্রন্থের শব্দকোষ অধ্যায়ে সমুদয় শব্দের অর্থে লিখেছেন ‘যার থেকে রাজস্ব হয়; যেমন ধান ক্ষেত, সোনার খনি ইত্যাদি।


অন্যদিকে চন্দ্রোদয়ে জল যেখানে উচ্ছ্বসিত হয়, তাকে সমুদ্র বলে। নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁর বিশ্বকোষে (একবিংশ খণ্ড) লিখেছেন, ‘মুদ্রা শব্দের অর্থ মর্য্যাদা, মর্য্যাদার সহিত বর্তমান। সমুদ্র মর্য্যাদার উল্লঙ্ঘন করে না। এই জন্যই উহার নাম সমুদ্র। বা যাহাতে র অর্থাৎ অগ্নি সমুদ্গত হয়, তাহাকে সমুদ্র, অথবা মুদ্ শব্দের অর্থ অর্থ আনন্দ, আনন্দ দান করে যে তাহার নাম মুদ্র, রত্ন প্রভৃতি। রত্ন প্রভৃতির সহিত বর্তমান। সমুদ্রে রত্নাদি আছে এই জন্যও উহা সমুদ্র পদবাচ্য’।


বাংলা ভাষায় সমুদ্র শব্দের প্রয়োগ অতি সাবলীল (আমি চাই সেইখানে মিলাইতে প্রাণ, সে সমুদ্র ‘আছে’ ‘নাই’ পূর্ণ হয়ে রয়েছে সমান- পলাতকা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সমুদ্রের পরপার থেকে তাই স্মিত চক্ষু নাবিকেরা আসে- জীবনানন্দ দাশ; সমুদ্র পার হয়ে মনসুন এলো আকাশে মেঘের পাখা ছড়িয়ে- বুদ্ধদেব বসু; তা সবার দ্বারে মনোবৃত্তি প্রকাশিব, বৃন্দাবনে সুখের সমুদ্র উথলিব- নরোত্তম বিলাস, নরহরি চক্রবর্তী; তাই কাঁপছে সমুদ্র ক্ষুধাতুর, বাতাস কাঁপানো তোমার ও কাঁপা পাল?- সাত সাগরের মাঝি, ফররুখ আহমদ; নাই আর! অন্ধকার-নিঃসাড়তার, মাঝখানে তুমি আনো সমুদ্রের ভাষা, ধূসর পাণ্ডুলিপি- জীবনানন্দ দাশ; ঘোল মইনির তাড়নে ঘোল আর বাত্যাতাড়িত সমুদ্র এক নিয়মে বিলোড়িত হয়- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; হিমালয় তো এককালে সমুদ্রের গর্ভে ছিল, এই শাঁখই তার প্রমাণ; তার ডানার কুটিগুলো এখানে ওখানে সমুদ্রের মাঝে টাপুর মত ভাসতে লাগল; চোদ্দের তিন গুন চোদ্দপালের ঘুণ্টি টানিয়া সাধু নদনদী সমুদ্র উজায়- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর; মধুবালা জপনা মদন কুমার সমুদ্রের জলে অচেতন হইলেন- দক্ষিণা রঞ্জনমিত্র মজুমদার; চন্দ্রমা যেমনভাবে স্থির নতমুখে চেয়ে দেখে সমুদ্রের বুকে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; হড়বড় হড়বড় করিয়া কোনরূপে নামাজটা শেষ করিয়াই সংসার সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ি- এয়াকুব আলী চৌধুরী)।


করুণাসিন্ধু দাস তাঁর ‘সংস্কৃত ব্যাকরণ ও ভাষা প্রসঙ্গ’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘অনুদরা ‘কন্যা’র উদর একেবারে নাই তা নয়, বলতে চাওয়া হচ্ছে, তা এত ক্ষীণ যে নাই বললেই চলে। আবার না থাকা বস্তুরও থাকার উল্লেখ দেখা যায় সমুদ্র ইত্যাদি শব্দে, কেননা সমুদ্রে সত্যিই তো মুদ্রা থাকে না’।


উল্লেখ্য, সমুদ্রকান্তা হচ্ছে নদী আর সমুদ্রনেমি, সমুদ্রসেনা ও সমুদ্রমেখলা হলো পৃথিবী।


সমুদ্র শব্দটির গঠন হচ্ছে সংস্কৃত সম্ +(উদ্ )+ র। বাংলায় সমুদ্দুর, সুমুদ্দুর আর সমুন্দর বানানও শুদ্ধ।


আরবিতে বহর উল অখ’যর বলতে আরব উপকূল থেকে ভারতের মধ্যবর্তী জলরাশিকে বোঝায়। অন্যদিকে বহর-ই অবয়খ উত্তর মহাসাগর; আরব ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী ভারত মহাসাগরের অংশ বহর-ই-অহমর, কৃষ্ণসাগর বহর অসওদ, আটলান্টিক মহাসাগর বহর-ই-অওকি’য়ানূস, বহর-ই-খি’যর কাস্পিয়ান সাগর। মজার ব্যাপার হচ্ছে আরবি ভাষার একটি বিখ্যাত অভিধানের নাম কামূস। শব্দটির অর্থ সমুদ্র।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com