সদানীরা আর সন্দেশ
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৭, ১০:০৪
সদানীরা আর সন্দেশ
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

সদানীরা নদী যে কোনটি, তার সুরাহা হলো না। তবে অধিক প্রচলিত মত হচ্ছে, বাংলাদেশের করতোয়া নদীই সদানীরা নামে পরিচিত। হিন্দুশাস্ত্র মতে, শ্রাবণ মাসে সব নদী রজস্বলা থাকে। কিন্তু করতোয়া নদী নির্মল জলবাহী থাকার কারণে এটার নাম হয়েছে সদানীরা (শতপথ ব্রাহ্মণ হইতে যাহা উদ্ধৃত হইয়াছে, তাহাতেই আছে, সদানীরা নদীর পরপারস্থিত প্রদেশ জলপ্লাবিত- বঙ্গে ব্রাহ্মণাধিকার, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; তোমাদের অঙ্গ থেকে চৈত্রের ঘূর্ণিতে কেঁপে ওঠা সদানীরা নদীর উত্তাল হিল্লোল চাই!- পিতৃগণ, জাকির তালুকদার)।


হিন্দুপুরাণ মতে, গৌরীর বিবাহকালে মহাদেশের করতলগলিত সম্প্রদান জল হতেই এ নদীর উদ্ভব। এই জন্যই নাকি নদীটির নাম করতোয়া হয়েছে। বেদে করতোয়া নদীর নাম রয়েছে।


ড. সুকুমার সেন তাঁর ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ প্রথম খণ্ডে লিখেছেন ‘সদানীরা শব্দটি নাম নয়, বিশেষণ। মানে যাহার জল বারো মাস প্রবাহিত থাকে। পণ্ডিতেরা নদীটিকে গণ্ডক মনে করিয়া থাকেন। গঙ্গা মনে করিলে দোষ কী? বারানসীর পরে গঙ্গা পারে যে বিশাল পার্বত্য জাঙ্গল ভূমি বাঙ্গালা দেশের কোল পর্যন্ত চলিয়া আসিয়াছে সেখানে যে অসুর সভ্যতার শেষ নীড় রচিত হইয়াছিল এমন মনে করিবার কারণ আছে। ‘শতপথব্রাহ্মণ’ গ্রন্থে সদানীরা নদীর নাম রয়েছে।’


বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বঙ্গে ব্রহ্মাণাধিকার প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘এক্ষণে সদানীরা নামে কোন নদী নাই। কিন্তু হেমচন্দ্রাভিধানে এবং অমরকোষে করতোয়া নদীর নাম সদানীরা বলিয়া উক্ত হইয়াছে। কিন্তু দেখা যাইতেছে যে, সে এ সদানীরা নদী নহে; কেন না, শতপথব্রাহ্মণেই কথিত হইয়াছে যে, এই নদী কোশল (অযোধ্যা) এবং বিদেহ রাজ্যের (মিথিলা) মধ্যসীমা।’


এদিকে সংস্কৃত সন্দেশ অর্থ বার্তা, সংবাদ, আদেশ (তাহার নিকট নিজ প্রভুর সন্দেশ জানাইল- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর)। কিন্তু বাংলায় সন্দেশ মানে চিনির সাথে পাক করা ছানার মিষ্টান্ন বিশেষ (সন্দেশের গন্ধে বুঝি দৌড়ে এল মাছি- সন্দেশ, সুকুমার রায়; কখনো কখনো আমাদের উৎসাহ দেখার জন্যে ফি পয়ার পিছু একটি করে সন্দেশ প্রাইজ দিতেন- হুতোম প্যাঁচার নকশা, কালীপ্রসন্ন সিংহ; মাইরি বলচি, আমি তা হলে ভাত খাব না, কাল রাত্তির একটা পর্যন্ত জেগে সন্দেশ তৈরি করেচি- বিরাজবউ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; এই বলিয়া সাগর কতকগুলা সন্দেশ আনিয়া প্রফুল্লের মুখে গুঁজিয়া দিতে লাগিল- দেবী চৌধুরাণী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি, সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে হাপুস হুপুস শব্দ চারিদিক নিস্তব্ধ, পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে- জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সন্দেশের গন্ধে বুঝি দৌড়ে এল মাছি? কেন ভন্ ভন্ হাড় জ্বালাতন ছেড়ে দেওনা বাঁচি!- সন্দেশ, সুকুমার রায়)।


মূলগত অর্থে সন্দেশ মানে খবর বা সংবাদ। কিন্তু শব্দটিতে নতুন অর্থের আগমন ঘটেছে। এখন সন্দেশ মূলত মিষ্টান্ন জাতীয় খাদ্যকেই নির্দেশ করে। অথচ দূত বা যে সংবাদ বহন করে অর্থে সন্দেশবহ বা সন্দেশহর শব্দের অর্থ পাল্টায়নি (তবে কেন, হে সন্দেশবহ, মলিন বদন তব- মধুসূদন দত্ত)।


শব্দটির গঠন হচ্ছে সংস্কৃত সম্ + দিশ্ + অ।


এক তথ্যে জানা যায়, ছানা চিনি থেকে নয়, সম্-পূর্বক দিশ্ ধাতুতে ঘঞ্ প্রত্যয়ে সন্দেশের উৎপত্তি, যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ সম্যকরূপে দিক্নির্দেশ বা সঠিক বিষয় জ্ঞাপন। এক সময় আত্মীয়স্বজনের খবরাখবর দেয়া নেয়ার জন্যে লোক পাঠানো হতো। খালি হাতে পাঠানো অভদ্রতা বলে সঙ্গে মিষ্টি খাবার। কালক্রমে সেই যে কোনো মিষ্টি খাবার, পরবর্তীকালে এক বিশেষ মিষ্টি খাবারই সন্দেশ হয়ে দাঁড়াল।


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com