‘একো গুরুর্ষেষাং তে সতীর্থ্যা’
প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৭, ১০:৩১
‘একো গুরুর্ষেষাং তে সতীর্থ্যা’
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

আমাদের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারেই হোক, বাংলা ভাষায় সতীর্থ শব্দটির অর্থের সম্প্রসারণ ঘটেছে। সমাসগত দিক থেকে ‘সমান তীর্থ যার’ মানে সতীর্থ (বহুব্রীহি সমাস)। বাক্য সংকোচনের দিক থেকে সতীর্থ মানে ‘একই গুরুর শিষ্য’।


মধ্যযুগে অমর সিং রচিত অমরকোষে সতীর্থ শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে ‘একো গুরুর্ষেষাং তে সতীর্থ্যা’- একই গুরুর কাছে যারা অধ্যয়ন করে তারাই সতীর্থ। কিন্তু অর্থের সম্প্রসারণ ঘটায় শব্দটি এখন একই দলভুক্ত ব্যক্তি এমনকি সহকর্মী অর্থেও ব্যবহৃত হচ্ছে (তাঁর কাছেই শুনেছি, তিনি, আপনার বাবা ও জগদীশবাবু এই তিনজনে শুধু সতীর্থ নয়, পরস্পরের পরম বন্ধু ছিলেন- বিজয়া, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; ব্যাপারটা কী, খবর দিতে হবে। শক্ত হল না, কেননা পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কেম্ব্রিজের সতীর্থ আছে বঙ্কিম- তিনসঙ্গী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


হরিনারায়ণ চক্রবর্তী তাঁর ‘নক্ষত্রের জাল’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সতীর্থ দু’ একজন ডিরেক্টরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।’ এখানে লেখক সতীর্থ বলতে কলিগ বা সহকর্মী বুঝিয়েছেন।


সতীর্থ শব্দের গঠন হচ্ছে সংস্কৃত স (সমান) + তীর্থ (গুরুঘাট)। একই অর্থে সতীর্থ্য বানানটিও শুদ্ধ। তবে এ সতীর্থ্য শব্দের গঠন হচ্ছে সতীর্থ + য।


আবার সংস্কৃতে সত্ত্ব শব্দটির রয়েছে নানা অর্থ। যেমন সত্তা (কেবল দূর হইতে সত্ত্ব নিংড়াইয়া যে রস বাহির হয়, তাহাই পান করিয়া এতকাল আত্ম এবং সাহেবত্ব রক্ষা করিয়া চলিতেছিলেন- জাগরণ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), অস্তিত্ব (বিদ্যা সত্ত্বেও লোকটি বর্বর), সত্ত্বগুণ (সত্ত্বগুণ হইতে তাঁহার দয়াদাক্ষিণ্যাদির উৎপত্তি, তাঁহার উপাসনা ভক্তির দ্বারা করিবে- আনন্দমঠ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), ত্রিগুণের শ্রেষ্ঠ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ), প্রকৃতি, স্বভাব, মন (শুদ্ধসত্ত্ব), আত্মা, প্রাণ, পরাক্রম, সাহস, প্রাণী (অন্তঃসত্ত্বা), বস্তু ধন (ধনী বলে নয়, মানী বলে নয়, জ্ঞানী বলে নয়, সৎ বলে নয়, সত্ত্ব রজ বা তমোগুণান্বিত বলে নয়, তারা স্পষ্ট ব্যক্ত হতে পেরেছে বলেই সমাদৃত- সাহিত্যবিচার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


কিন্তু বাংলায় সত্ত্ব মানে বিশেষত রস, নির্যাস, সার (আদার সত্ত্ব, আমসত্ত্ব)।


সত্ত্ব শব্দের গঠন হচ্ছে সংস্কৃত সৎ + ত্ব।


অন্যদিকে সংস্কৃতে সদ্ব্যবহার মানে ভদ্র ও শিষ্ট ব্যবহার (অধীনস্থ ব্যক্তিদিগকে সদ্ব্যবহার দ্বারা বশীভূত করিবে- ১৮৮৭ সালে একমাত্র ছেলে জ্যোতিষচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; আমার মত এই যে, যাদের মন কাঁচা তারা যতটা স্বভাবত পারে নেবে, না পারে আপনি ছেড়ে দিয়ে যাবে, তাই বলে তাদের পাতটাকে প্রায় ভোজ্যশূন্য করে দেওয়া সদ্ব্যবহার নয়- বিশ্বপরিচয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


কিন্তু বাংলায় সদ্ব্যবহার হচ্ছে ‘সদুদ্দেশ্যে প্রয়োগ’ (তবে আর কুলীন ধনী পরিবারদিগকে দেশ কেন পোষণ করিতেছে? তাহারা না খাটিবে, না তাহাদের অবকাশের সদ্ব্যবহার করিবে- টৌনহলের তামাশা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; আমরা গিয়া বলি, মশায়, আপনার দ্বাদশ ‘মূল্য’ আপনারই থাক, পারেন ত আগামী জন্মে লিখিবেন, কিন্তু যে ‘মূল্য’ আপাততঃ হাতে পাইয়াছি, তাহার সদ্ব্যবহার করি- দেশসেবা, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


· লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া।


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com