‘সক্ষম’ আর ‘সচকিত’ একই সমান্তরালে
প্রকাশ : ২৮ মে ২০১৭, ০৯:০৫
‘সক্ষম’ আর ‘সচকিত’ একই সমান্তরালে
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলা ভাষায় বিতর্কিত ‘সক্ষম’ শব্দটি ব্যাকরণের নিয়মে শুদ্ধ নয়। ক্ষম অর্থই শুদ্ধ। এটার অর্থ সমর্থ, যোগ্য। কিন্তু শব্দটি নিয়ে ব্যাকরণবিদদের প্রবল আপত্তি থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত টিকেনি। কারণ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস আর রাজশেখর বসুর মতো অভিধানকাররা সমর্থ অর্থে সক্ষম মেনে নিয়েছেন।


আবার সাহিত্যিকরাও এ গতিশীল শব্দটিকে সহজে গ্রহণ করেছেন (কৃষ্ণ যে জরাসন্ধের নিপাত সাধনে সক্ষম, তাহা দেখিয়াছি- কৃষ্ণরাত্রি, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; অল্প অল্প ভিক্ষা সঞ্চয় করিয়া যখন শীতবস্ত্র কিনিতে সক্ষম হইত- শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; এই লজ্জা হইতে, ইংরেজিয়ানার এই বিকার হইতে, স্বদেশকে রক্ষা করিবার জন্য আমরা কি সক্ষম নকলকারীকে সানুনয়ে অনুরোধ করিতে পারি না, কারণ, তাঁহারা সক্ষম, আর সকলে অক্ষম- নকলের নাকাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; নবকুমার শ্রুত ছিলেন যে কাপালিকেরা মন্ত্রবলে অসাধ্যসাধনে সক্ষম, এ কারণে তাহার অবাধ্য হওয়া অনুচিত- কপালকুণ্ডলা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; যে জাতি যে পরিমাণে তার সংশয় ও অবিশ্বাস বর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, নারীর মনুষ্যত্বের স্বাধীনতা যারা যে পরিমাণে মুক্ত করে দিয়েছে, নিজেদের অধীনতা-শৃঙ্খলও তাদের তেমনি ঝরে গেছে- স্বদেশ ও সাহিত্য, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


বিশিষ্ট ভাষাবিদ চিন্তাহরণ চক্রবর্তীও সক্ষম শব্দটি মেনে নিয়েছেন। তিনি শব্দটির সমর্থনে বলেছেন, ‘সচল, সচকিত, সঠিক, সক্ষম প্রভৃতি অশুদ্ধ শব্দকে অশুদ্ধ শব্দ বলে ঠেকিয়ে রাখা যায় না; এদের গ্রহণ করাই সংগত। এইসব শব্দের ‘স’ আতিশয্যবাচক স্বতন্ত্র শব্দ বা অর্থহীন ধ্বনি মাত্র।’


সংস্কৃত ব্যাকরণ মতে সক্ষম শব্দটি শুদ্ধ নয়। সমর্থ অর্থে সংস্কৃতে ক্ষম শব্দটি চালু। মধ্যযুগের বাংলায়ও সক্ষম শব্দটি ছিল না। তখন সক্ষম অর্থে ‘ক্ষমযুক্ত’ শব্দটি চালু ছিল।


মূলানুগ অর্থে বাংলায় সক্ষম মানে ‘ক্ষমতাসহ বিদ্যমান যে’। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের তথ্য মতে, বাংলায় সক্ষম শব্দটি উদ্ভাবন ও চালু করেন কালীপ্রসন্ন ঘোষ।


সক্ষম বাংলা বিশেষণ। সংস্কৃত ‘ক্ষম’ থেকে হিন্দি সক্ষম এর অনুকরণে বাংলায় সক্ষম শব্দটি এসে থাকতে পারে। সক্ষম অর্থ সমর্থ (তুমি সক্ষম, আমি নিরূপায়- কাহিনী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), সাবালগ, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী। সক্ষম শব্দের গঠন হচ্ছে সংস্কৃত স + ক্ষম। সক্ষমের বিপরীত অক্ষম।


অন্যদিকে সংস্কৃতে সচকিত মানে সভয়, সশঙ্ক, বিদ্যামান চকিত (সচকিত হয়ে কিছু বলে- কবিকঙ্কণ চণ্ডী)। কিন্তু বাংলায় সচকিত মানে চঞ্চল (সচকিত সো বরনারী- পদকল্পতরু), ত্রস্ত (তক্তা টানার ঘেসড়ানিতে সচকিত হইয়া- কাজী নজরুল ইসলাম; সচকিত সজনী শূন্য বিকুঞ্জিত অরণ্য- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সচকিতে বীরবর দেখিলা সম্মুখে, ভীমতম শূলহস্তে ধূমকেতুসম, খুল্লতাত বিভীষণে বিভীষণ রণে- মাইকেল মধুসূদন দত্ত; কোনো শোক নাই সদা ছলছল তবু এই দুটি আঁখি, ভয় নাই জানি তবু সচকিত সন্ত্রাসে চেয়ে থাকি- মো. আবদুল নঈম; সতিমির রজনি, সচকিত সজনী, শূন্য নিকুঞ্জ-অরণ্য, কলয়িত মলয়ে, সুবিজন নিলয়ে বালা বিরহবিষণ্ন- রবীন্দ্রসংগীত; চীৎকারে সমস্ত পাড়া সচকিত করিয়া বলিলেন, শোন্ জগো, তোর বিদ্যেধরী মেয়ের আস্পর্ধার কথাটা একবার শোন্- বামুনের মেয়ে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; পাতাঝরা হেমন্তের স্বর ক’রে দেয় সচকিত তারে, হিমানী-পাথারে কুয়াশাপুরীর মৌন জালায়ন তুলে চেয়ে থাকে আঁধারে অকূলে সুদূরের পানে!- শ্মশান, জীবনানন্দ দাশ)।


সচকিত শব্দের গঠন হচ্ছে সংস্কৃত স (সহ) + চকিত (ভয়)। স্ত্রীলিঙ্গে সচকিতা।


ক্রিয়া-বিশেষণে সচকিতে মানে ত্রস্তভাবে, আচমকা (সচকিতে জাগি উঠি লতাইবে বক্ষে মোর- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


● লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com