‘উপযুক্ত অন্যকালে অপেক্ষা আদর’
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০১৬, ১১:০০
‘উপযুক্ত অন্যকালে অপেক্ষা আদর’
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

সংস্কৃত ‘অপেক্ষা’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে প্রতীক্ষা, আকাঙ্ক্ষা। অপেক্ষা বলতে আমরা প্রতীক্ষা বুঝি। প্রতীক্ষা শব্দটিও সংস্কৃত এবং তা অপেক্ষারই প্রতিশব্দ। তবে অপেক্ষা শব্দের যে বাংলা চালু রয়েছে, তা দিয়ে মোটেও প্রতীক্ষা বোঝায় না। বরং ‘সম্বন্ধে’ বা ‘বিবেচনায়’ বোঝায়। যেমন বুশরা অপেক্ষা ফাহিম বুদ্ধিমান। একইভাবে বাংলায় অপেক্ষাকৃত মানে ‘অন্যের অপেক্ষায়’। বাংলা অপেক্ষাকৃত’র মাঝেও সংস্কৃত ‘অপেক্ষা’ নেই।


মধ্যযুগের বাংলায় শব্দটি খাতির বা সম্মান (তোমার অপেক্ষা হেতু আমি শুধু আমি- কাশীরাম দাসের মহাভারত), আপ্যায়ন (উপযুক্ত অন্যকালে অপেক্ষা আদর- ঘনরামের ধর্মমঙ্গল) অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে।


আবার সংস্কৃতে ‘অবস্থা’ শব্দের রয়েছে নানা অর্থ। যেমন অবস্থান, স্থিতি, বিরতি, আহবান, দশা, বয়োবিশেষ, ভাব, প্রকার, আকার, বিত্তাদিবিষয়ে সাংসারিক দশা ইত্যাদি। কিন্তু বাংলায় অবস্থা অর্থ দুর্দশা, দুর্গতি (ইন্দ্র বেটা কৈল বড় আমার অবস্থা- কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অযোধ্যা কাণ্ড), বাহ্যভাব, (ইউরোপের গ্রন্থাগারের অবস্থা যে রকম উন্নত, সে রকম অবস্থা যে আমাদের দেশে কবে হবে, তা কল্পনাও করা যায় না- বইয়ের দুঃখ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; স্কুলে তাহার এমন অবস্থা হইল যে, তাহার মামাতো ভাইরা তাহার সহিত সম্বন্ধ স্বীকার করিতে লজ্জা বোধ করিত- ছুটি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; লক্ষণ (কিন্তু ফৌজদারী সিপাহীর এমনি অবস্থা হইয়াছিল যে, তাহারা কোন বৃদ্ধা স্ত্রীলোকের মুখেও হরিনাম শুনিলে পলায়ন করিত- আনন্দমঠ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


আবার সংস্কৃতে ‘অবস্থাচতুষ্টয়’ বলতে চার প্রকার শারীরিক অবস্থা বোঝায়। শরীরের এ চার প্রকার অবস্থা হচ্ছে বাল্য, কৌমার, যৌবন ও বার্ধক্য। শব্দকল্পদ্রুমে বলা হয়েছে, ১৫ বছর পর্যন্ত বাল্য, ৩০ বছর পর্যন্ত কৌমার, ৫০ বছর পর্যন্ত যৌবন এবং তারপর বার্ধক্য। জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি হচ্ছে ‘অবস্থাত্রয়’। জীবনের দুই দশা- সুখ ও দুঃখ হচ্ছে অবস্থাদ্বয়।


অন্যদিকে অলঙ্কার শাস্ত্রে দশ প্রকার দশার কথা বলা হয়েছে, যা অবস্থা দশক নামে পরিচিত। এই দশ প্রকার দশা হচ্ছে অভিলাষ চিন্তা স্মৃতি গুণকথন উদ্বেগ প্রলাপ উন্মাদ ব্যাধি জড়তা ও মৃত্যু। নায়ক-নায়িকার পূর্বরাগে কামজ এই দশ দশা। আবার মানবজীবনের দশটি অবস্থাও হচ্ছে অভিলাষ, চিন্তা, স্মৃতি, গণকথন, উদ্বেগ, প্রলাপ, উন্মাদ, ব্যাধি, জড়তা ও মৃত্যু। মতান্তরে গর্ভাবাস, জন্ম, বাল্য, পৌগ্ল, কৌমার, যৌবন, স্থবির, জরা, প্রাণরোধ ও নাশ।


এছাড়া ‘অবাক’ বৈদিক শব্দ। সংস্কৃতে অবাক মানে বাক্যরহিত, বাকশক্তিহীন, বোবা। কিন্তু বাংলায় অবাক অর্থ আনন্দ বিস্ময়ের কারণে বাক্যহীন, নীরব (পুলকে প্রেমের সিন্ধু উথলিয়া উঠে। অবাক অমনি দ্বিজ রহে করপুটে- রামেশ্বরী সত্যনারায়ণ)।


বাংলায় বিস্মিত অর্থেও শব্দটি চালু রয়েছে (অবাক হইনু হাটে দেখিয়া গুবাক- ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর; (লোকে) বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে যেত, দেখতো অবাক চোখে- পলাতকা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


বিস্ময়জনক, অদ্ভুত অর্থেও বাংলা অবাক শব্দটি ব্যবহৃত হয় (অবাক কাণ্ড একি!- পলাতকা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


অবনত, নিচের দিকে নামানো অর্থেও (বিশেষণ হিসেবে) সংস্কৃত অবাক শব্দটির প্রয়োগ রয়েছে। বিশেষ্যে অবাক আবার দক্ষিণ দিক, অব্যয় পদ হিসেবে নিম্নদেশ, অধোদেশ। ‘অবাক জলপান’ বিশেষ্য। এটার অর্থ ঝাল মেশানো খাদ্যবস্তু সহযোগে জলপান। সংসদ বাংলা অভিধান মতে, অবাক জলপানের অর্থ ‘বিচিত্র জলপান।’


জিয়াউদ্দিন সাইমুমের ব্লগ থেকে


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com