উষসী আর উষা এখন একাকার
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৬, ১৩:৫৭
উষসী আর উষা এখন একাকার
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর অভিধানে ‘ঊষসী’ শব্দ দিয়ে ‘ঊষা’ যেমন নির্দেশ করেছেন, তেমনি ‘সন্ধ্যা’ও নির্দেশ করেছেন। কিন্তু উভয় অর্থে শব্দটির গঠনেও যে পার্থক্য রয়েছে, তাও ব্যাখ্যা করেছেন। শুরুতেই বলে নেয়া ভালো, বাংলা একাডেমির অভিধানেও বিকল্প হিসেবে ‘ঊষসী’ আর ‘ঊষা’ বানান মেনে নেয়া হয়েছে।


ঊষস (প্রভাত) + ঈ = ঊষসী। শব্দটিকে এভাবে বিশ্লেষণ করলে যে অর্থগুলো পাওয়া যায়, সেগুলি বিশেষণ ও বিশেষ্য পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন বিশেষণে ঊষসী অর্থ ঊষারাগরঞ্জিতা, প্রভাতী, রূপবতী, পরমাসুন্দরী কিন্তু বিশেষ্যে ঊষা। অন্যদিকে ঊষসী শব্দটি দিয়ে যখন সন্ধ্যা বোঝায়, তখন শব্দটির গঠন হয় এমন: ঊষস (প্রভাত) + সো (শেষ করা) + অ + ঈ (স্ত্রীলিঙ্গে) = ঊষসী (ঊষসী-আকাশ ধূসুর করেছে মরণের আনাগোনা- বিষ্ণু দে)।


প্রকৃতিবাদ অভিধানে ঊষসী অর্থে সন্ধ্যা নির্দেশিত হয়েছে। কিন্তু ‘সন্ধ্যা’ অর্থে ঊষসী যে বিরল প্রয়োগ, তাও নির্দেশ করেছেন জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস। তিনি তাঁর অভিধানটি রচনা করেছেন ১৯৩০ এর দশকে। সঙ্গত কারণে সন্ধ্যা অর্থে ঊষসী শব্দের প্রয়োগ এখন আর দেখা যাবার কথা নয়। তিনি ‘ঊষসি’ শব্দটিকেও তার অভিধানে ঠাঁই দিয়েছেন। কিন্তু ‘ঊষসী’ আর ‘ঊষসি’ মোটেও এক জিনিস নয়। কারণ ‘ঊষসি’ হচ্ছে ক্রিয়াপদ, বানানেও ফারাক রয়েছে।


ঊষসি শব্দের মূল উচ্ছ্বাস। এই উচ্ছ্বাস থেকেই ব্রজবুলিতে ‘উসাস’ ও উচাস হয়েছে। বাংলায় ‘উষসি’ বা ‘উসসি’ অর্থ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে (উষসি উষসি খসি খসি পড়ূ নোর অথবা ‘উসসি উসসি পড়ূ খসি খসি আলি আলিঙ্গন চাহে- বিদ্যাপতি)।


বাংলা ভাষায় যেসব শব্দের বিপরীতধর্মী অর্থ পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে উষসী বা ঊষসী অন্যতম। শব্দটির মূল সংস্কৃত। আর সংস্কৃতে উষসী শব্দের অর্থ সন্ধ্যা বা দিনের শেষ। অথচ উষসীর বাংলা অর্থ এখন উষা। শব্দটাকে উষা অর্থে ব্যবহার করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ-নজরুল।


রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক কবিতায় লিখেছেন, ‘স্বর্গের ভুবন তলে মূর্তিমতী তুমি হে উষসী, হে ভুবনমোহিনী উর্বশী’। আরেকটি কবিতায় লিখেছেন ‘বিলুপ্ত করিবে দূরে উন্মুক্ত বাতাস দুর্বল দীপের গাঢ় বিষতপ্ত কলুষনিশ্বাস, আলোকের জয়ধ্বনি উঠিবে উচ্ছ্বসি, নাম কি উষসী।’ আর কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘সুরের সভায় রাত্রিপারের উষসীরে আন টানি’।


পল্লীকবি জসীমউদদীন তাঁর ‘রজনীগন্ধার বিদায়’ কবিতায় লিখেছেন ‘পূর্ব তোরণে আসিছে রূপসী রঙিন উষসী-বালা, হস্তে লইয়া রাঙা দিবসের অফুট কুসুমডালা)।


এদিকে খনার বচনে ঊষার সময়কাল নির্দেশিত হয়েছে এভাবে, ‘ডাকে পাখী ছাড়ে না বাসা। উড়ে বসে খাবে করি আশা। ফিরে যায় ঘরে না পেয়ে দিশা। খনা ডেকে বলে তার নাম ঊষা’।


এটা ঠিক, রাতের শেষে কা কা শব্দ করতে করতে কাক বাসা থেকে উড়ে যায়। কিন্তু তখনও চারিদিকে প্রভাতের আলো প্রকাশিত হয় না বলে কাক আবার বাসায় ফিরে আসে। ভোর হয়ে গেছে ভেবে কাক বার বার বাসা থেকে উড়ে। এ সময়টাই ঊষা (সত্য আছে স্তব্ধ ছবি যেমন ঊষার রবি, নিম্নে তারি ভাঙে গড়ে মিথ্যা যত কুহক কল্পনা- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; কল্য ঊষার মধুর-কণ্ঠ মুআজ্জিন অদ্য নিশার নিদ্রাস্মরণে আকণ্ঠ বিলীন- শব্নম্, সৈয়দ মুজতবা আলী; বিরাম হৃদয় সে যেন আমার দৃপ্ত জয়োল্লাস, তিমির রাতের তোরণে তোরণে ঊষার পূর্বাভাস- জীবন বিনিময়, গোলাম মোস্তফা; কোথায় খুলবে নওল ঊষার রশ্মিধারা সফেদ; আলো করি সুবেহ সাদেক শিথিল বিশ্ব ঊষা নেমে এল- ফররুখ আহমদ)।


ভারতীয় শাস্ত্র ও পুরাণে দেবী অর্থে ঊষা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। গবেষক আবি আবদুল্লাহ তাঁর ‘প্রসঙ্গ সংস্কৃতি আর্য বনাম অনার্য’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ঋগ্বেদে উষা লেখা হয় উ-কার দিয়ে। কিন্তু বাংলায় লেখা হয় ঊ-কার দিয়ে।’


এদিকে উষা বানানটিকে ‘ঊষা’ শব্দের আধুনিক রূপ ধরা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ঠিক নয়। প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে ঊষা নেই, উষা আছে। অমরকোষেও ঊষা নেই। অমরকোষে পাওয়া যায় ‘উষারাত্রেরবসানে’। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাই ‘ঊষা’ বানানটিকে তাই অর্বাচীন সংস্কৃত ধরে নিয়েছেন।


বৈদিক সমাজে রূপের রানী হলেন উষা। বৈদিক ঋষিরা নানাভাবে উষা দেবীর রূপের বর্ণনা দিয়েছেন। গ্রিকদের মাঝেও উষা ছিলেন সৌন্দর্য ও প্রেমের দেবী। উষার গ্রিক প্রতিরূপ হচ্ছে Charis যা থেকে ইংরেজি Charm শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে। Charis হচ্ছে আফ্রোদিতির অন্য নাম। বৈদিক উষা আকাশ কন্যা আর Charis হলেন জিউস-কন্যা। উষার আরেক নাম অর্জুনী (শুভ্র বা উজ্জ্বল), আফ্রোদিতির আরেক নাম Argynmis।


স্লাভ ভাষায় Zora শব্দটি উষা অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটার অর্থও ঔজ্জ্বল্য। পণ্ডিত Max Muller এর মতে, উষার আর এক নাম উর্বশী। উষা বিস্তারমান, উর্বশীও নিজেকে ব্যাপ্ত করেন। Max Muller তাই উর্বশী শব্দের অর্থ করেছেন ‘পরিব্যাপ্ত’।


আর্য যাস্কের মতে, উরু + অশ্ ধাতু হতে উর্বশী নিষ্পন্ন। তাই উর্বশীর অর্থ ‘যে মহৎ যশ ব্যাপ্ত করে।’ অর্থাৎ মহাযশের অধিকারিনী অথবা মৈথুনকালে উরুদ্বয়ের দ্বারা পুরুষকে যে ব্যাপ্ত করে (বশীভূত করে)। অথবা যার যশ বা কাম উরু (মহান)। উল্লেখ্য, উরু শব্দের অর্থ অধিক বা মহান।


উর্বশী অপ্সরাও বটে। ‘অপ’ শব্দের অর্থ জল। যিনি ‘অপ’-এ বিচরণ করেন, তিনিই অপ্সারিনী বা অপসরা বা জলকারিনী। অপ্সরা জলপ্রিয়। জলকেলি করতে ভালোবাসেন। অপ্সরার গ্রিক প্রতিরূপ হচ্ছে দেবী আফ্রোদিতি। তারও জন্ম জলে (সাগরে)।


উষার সমতুল শব্দ হিন্দিতে উঁজিয়ানা, ফারসিতে বামদাদ, উর্দুতে তড়কা।


জিয়াউদ্দিন সাইমুমের ব্লগ থেকে


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com