গুগল থেকে ডাক পাওয়ার স্বপ্ন নাজমুস সাকিবের
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৭:২১
গুগল থেকে ডাক পাওয়ার স্বপ্ন  নাজমুস সাকিবের
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ছোটবেলায় সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন মো. নাজমুস সাকিব। ওই স্বপ্ন পূরণ হয়নি তার। কারণ, বাবা-মার স্বপ্ন ছিল তাকে কোরআনে হাফেজ বানানোর। হাফেজ হয়ে তাদের স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি।


এতেও মনে শান্তি পাচ্ছিলেন না সাকিব। এক সময় কম্পিউটার শেখা শুরু করেন। তখন কোডিংয়ের ওপরে তার একটা আকর্ষণ তৈরি হয়। ভাবেন, এ কাজগুলো ‍যদি পারতাম তাহলে একদিন দেশসেরা প্রোগ্রামার হতে পারতাম।


সময়ের পালাবদলে কম্পিউটারকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন সাকিব। তা থেকেই হয়ে উঠেন ওয়েব ডিজাইনার। কম্পিউটারই এখন তার ধ্যান-জ্ঞান।


সম্প্রতি বিবার্তা২৪ডটনেটের সাথে কথা বলেন নাজমুস সাকিব। একান্ত আলাপে বেরিয়ে আসে তার ওয়েব ডিজাইনার হয়ে ওঠার নানা ঘটনা। বিবার্তার পাঠকদের ওই ঘটনার কথা জানাচ্ছেন উজ্জ্বল এ গমেজ


ওয়েব ডিজাইনার হওয়ার শুরুটা সহজ ছিল না। কেননা সাকিবের কোনো কম্পিউটার ছিলো না। বাবা এমদাদুল হক মসজিদের ইমাম। বাবার ব্রেইন স্ট্রোক করার কারণে পরিবারের খারাপ সময় যাচ্ছিল। কম্পিউটার কেনার তো প্রশ্নই ওঠে না। তবুও বন্ধুদের বাসায় গিয়ে মাঝেমধ্যে কাজ শেখার চেষ্টা করতেন। যদিও বেশি সুযোগ পেতেন না।


দুই বছর আগে এক বন্ধুর বড় ভাই সাকিবের আগ্রহের কথা শুনে একটা কম্পিউটারের জন্য তাকে ২০ হাজার টাকা দেন। সাকিব তা দিয়ে একটি পুরাতন ল্যাপটপ কেনেন। প্রথমে দোকান থেকে সিডি কিনে কাজ শিখেছেন। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে কোর্স করার মতো টাকাও তার ছিল না। কিছুদিন পর এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে রাজধানীর ক্রিয়েটিভ আইটিতে ওয়েব ডিজাইনের ওপর একটি ফ্রি ট্রেনিংয়ের স্কলারশীপ পান। তখন থেকেই যাত্রা শুরু ওয়েব প্রোগ্রামিংয়ের।


ট্রেনিং শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মিরপুরের দেওয়ান আইটিতে ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে চাকরি পেয়ে যান। এভাবেই আইটি সেক্টরে শুরু তার পথ চলা।


প্রথম দিকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিলো সাকিবকে। নানাজন নানা কথা বলে তাকে নিরুৎসাহিত করতো। কেউ কেউ বলতো, ফ্রিল্যান্সিং, কোডিং, ওয়েব ডিজাইনিং এসব শিখে জীবনে কিছু হবে না, দেশে এই কাজের তেমন চাহিদা নেই। আবার কেউ বলতো, তোমাকে দিয়ে এসব হবে না ইত্যাদি।


তবে সাকিব এসব কোনো কথাই কানে তুলতেন না। তিনি জানতেন, ধৈর্য্, আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস থাকলে এবং সময় দিতে পারলে সফলতা আসবেই।


আলাপ প্রসঙ্গে সাকিবের জীবনের অনেক বিষয় বেরিয়ে আসে। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন ঢাকার মিরপুরে জন্ম তার। বাবা এমদাদুল হক মসজিদের ইমাম। মা জাহানারা বেগম গৃহিনী। ২ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে সাকিব সবার বড়।


বাবা তখন একটি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল। এই সুবাদে থাকতেন মাদ্রাসার কোয়ার্টারে। মাদ্রাসার ধর্মীয় পরিবেশেই কাটে তার শৈশবের দিনগুলো।


মিরপুর শাহিন স্কুলে প্রাইমারির পড়াশুনা, মাদ্রাসা থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় দাখিল ও আলিম পাস করেন সাকিব। এরপর তার ভাবনা ডানা মেলে অন্যদিকে। শুরু করেন কম্পিউটার সাইন্সের উপর পড়াশুনা। যদিও প্রথমে কম্পিউটার নিয়ে পড়াশুনাতে বাবার মত ছিলো না, কিন্তু মায়ের সহযোগিতায় তা চালিয়ে যান। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশুনা বন্ধ করেননি সাকিব। ওয়েব ডিজাইনার হওয়ার অদম্য ইচ্ছা তাকে সব প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে সফলভাবে শেষ করতে শক্তি যুগিয়েছে।


ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার নেশা ছিলো সাকিবের, যা পরে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়তে তাকে অনেক সাহায্য করেছে।


বিভিন্ন বই পড়ে এবং ট্রেনিং করে ওয়েব ডিজাইন সম্পর্কে বিষয়ে তিনি যা জেনেছেন তা হলো, আমরা যখন গুগলে কিছু লিখে সার্চ দেই তখন হাজার হাজার লিংক বা তথ্য আমাদের সামনে আসে, যা একেকটা ওয়েবসাইট। ওয়েবসাইট বানানোর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে টার্গেটকৃত ব্যবহারকারীদের রুচি ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে ওয়েবসাইটের কাঠামো, ইউজার ইন্টারফেস, টেম্পলেট বানানো, নেভিগেশন, লেআউট, রঙ, লেখার ধরন, ছবি, ভিডিও, অ্যানিমেশন, আইকনসহ কী ধরনের বিষয় থাকবে, কীভাবে থাকবে এবং ব্যবহারকারীরা কীভাবে সেটা পাবে এই সবই হলো ওয়েব ডিজাইনের অন্তর্ভুক্ত। আবার অনেক ওয়েববেসড সফটওয়্যারের জন্যও ডিজাইন করা হয়। সহজ ভাষায় বলতে গেলে এটাই ওয়েব ডিজাইন।


আগামী দিনগুলোতে ওয়েববেসড সফটওয়্যরের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে বলে জানালেন ওয়েব ডিজাইনার সাকিব। তিনি বলেন, এই কাজের চাহিদা দিনদিন বাড়বে। বর্তমানে সারা বিশ্বে এক মিলিয়নের উপর ওয়েবসাইট আছে। প্রতিদিন প্রায় এক লাখ ৪০ হাজারের মতো ওয়েবসাইট তৈরি হচ্ছে। এখন একজন ওয়েব ডিজাইনারের ন্যূনতম পারিশ্রমিক ধরা হয় ঘন্টায় ২০ থেকে ২৫ ডলার। আমাদের দেশে অল্প খরচে কাজ করার সুবিধার্থে বাইরের বেশিরভাগ কম্পানি আমাদের সাথে কাজ করে। সবচেয়ে বড় কথা, এই কাজে সময় দিতে পারলে এবং এ কাজকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিলে দেশের শিক্ষিত যুবকদের আর বেকার থাকতে হবে না।


ওয়েব ডিজাইন শেখার জন্য কী ধরনের প্রাথমিক যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন এমন প্রশ্নের জবাবে সাকিব বলেন, ওয়েব ডিজাইন শেখার জন্য প্রাথমিক যোগ্যতা বলতে কম্পিউটার আর ইন্টারনেট ব্যবহার জানলেই যথেষ্ট। যে কোনো সময়ে যে কেউ ওয়েব ডিজাইন শিখতে পারেন। এটি একটি সৃজনশীল ফিল্ড, এখানে আপনার কল্পনা, চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটাতে হয়। এর জন্য দরকার কাজের প্রতি ভালোবাসা ও ধৈর্য। তবে যারা এই সেক্টরে আসতে চান তাদের কাজে নামার আগে নিজেরাই একটু রিসার্চ করে নিলে ভাল। ওয়েব ডিজাইন শিখতে হলে প্রথমে এইচটিএমএল, সিএসএস, জাভাস্ক্রিপ্ট, পিএইচপি শিখতে হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে এই বিষয়গুলোতে এক্সপার্ট হতে হবে।


ক্যারিয়ার হিসেবে ওয়েব ডিজাইন বিষয়ে সাকিবের ভাষ্য, ওয়েব ডিজাইনার খুব সম্মানজনক পেশা। আর একই সাথে এই পেশা স্থান করে নিয়েছে ভোকেশনাল সেক্টরে সেরা ১০ সর্বোচ্চ বেতনের চাকরির তালিকায়। এই পেশায় কর্মক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার মূল্য আছে। কাজেই আপনার কর্মক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আপনি পাবেন সম্মান, সম্মানী ও পদোন্নতি।


সাকিব বলেন, বর্তমান যুগ হলো অনলাইনের যুগ। এখন কম্পানির ইনফরমেশন থেকে শুরু করে সার্ভিস এবং বিভিন্ন পণ্য অনলাইনে বিক্রয় করছে। ব্যক্তিজীবনে পাসপোর্ট বানানো, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, পরীক্ষার ফলাফল দেখা থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়েও ওয়েবসাইট হচ্ছে। এমনকি শিশুদের জন্যও রয়েছে বিশেষায়িত ওয়েবসাইট। জীবনের প্রত্যেকটা কাজেই আমরা ওয়েবসাইটের সাহায্য নিচ্ছি। প্রতিদিনই নতুন নতুন চাহিদার ওয়েবসাইট তৈরি হচ্ছে। এই চাহিদা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।


এখানে খণ্ডকালীন কাজের অবারিত সুযোগ রয়েছে বলে জানালেন ওয়েব ডিজাইনার সাকিব। যে কেউ চাকরি বা পড়াশোনার পাশাপাশি এই কাজ শিখতে পারেন। শেখার জন্য যে প্রতিদিন অনেক সময় দিতে হবে তা না। প্রতিদিন গড়ে দুই ঘণ্টা করে সময় দিলেই যথেষ্ট। কিন্তু তা হতে হবে নিয়মিত। ফ্রিল্যান্সিং মার্কেট প্লেসগুলোতে ক্রিয়েটিভ ওয়েবসাইট ডেভেলমেন্ট করার জন্য প্রতিটি সাইটে ২০০ ডলার থেকে ২০০০ ডলার পর্যন্ত পাওয়া যায়। দেশীয় ওয়েব সাইটগুলো তৈরির জন্য ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা দেয়া হয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন কম্পানি আছে, যারা শুধু খণ্ডকালীন চুক্তিতেই ওয়েব ডিজাইনারকে নিয়োগ দেয়। ওয়েব ডিজাইন যেহেতু ডেস্কভিত্তিক চাকরি নয়, কাজেই খণ্ডকালীন চাকরির ক্ষেত্রে বাসায় বসে কাজ করাটাও এই পেশার জন্য খুবই স্বাভাবিক। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করার জন্য এটি একটি উত্তম সেক্টর। সুতরাং এই পেশাটাকে যেকেউ খণ্ডকালীন হিসেবেও নিতে পারেন।


সাকিব বলেন, এই সেক্টরের আয়টা নির্ভর করবে ব্যক্তির কাজের অভিজ্ঞতার ওপর। অভিজ্ঞতা বেশি থাকলে আয় বেশি হবে, কম থাকলে আয় কম হবে। যে কোনো অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ করা যেতে পারে। তবে বর্তমানে মার্কেটপ্লেসে প্রচুর প্রতিযোগিতা হয়। প্রথমেই মার্কেটপ্লেস থেকে কাজ পেতে হয়তো সময় লাগবে। তাই এই সময়ে আগ্রহী ব্যক্তিকে যে কোনো কম্পানিতে ইন্টার্ন করতে হবে। এতে হাতখরচ হিসেবে কিছ টাকা পাওয়া যাবে, অপরদিকে দক্ষতার ঝুলিও ভারি হবে। এই পেশায় বাংলাদেশের যে কোনো ফার্মে কাজ করলে ন্যুনতম ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ পর্যন্ত মাসিক সম্মানি হতে পারে। আর বিদেশের কোনো ফার্মে কাজ করলে ন্যুনতম ৪০ হাজার থেকে দুই লাখ উপরে তা হতে পারে বা আরো বেশি। তবে অবশ্যই সময় দিয়ে ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে আগ্রহীকে।


উন্নত দেশগুলোতে ফ্রিল্যান্সিং নিঃসন্দেহে একটি ভালো পেশা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফ্রিল্যান্সিং পরিচয়টা তেমন একটা নয়, বরং উপেক্ষিত। কেন এমন ধারণা এ বিষয়ে সাকিব বলেন, একটা সময় আমাদের দেশের মানুষ জানত কম্পিউটার দিয়ে শুধু আনন্দ-বিনোদন হয়। কিন্তু এটা দিয়ে যে লাখ লাখ টাকা ইনকাম করা যায় তা অনেকেই বুঝতে চাইতো না। কিন্তু এখন সবাই কমবেশি জানে। বাংলাদেশে আইটির সুফলগুলো ভোগ করা শুরু হয়েছে অল্প কিছুদিন ধরে। সুতরাং তথ্যপ্রযুক্তির এযুগে ঘরে বসেই যে অন্য দেশের কোনো কম্পানিতে চাকুরি করা সম্ভব, বিষয়টি অনেকের কাছেই এখনও অবিশ্বাস্য। আবার অনেকের এবিষয়ে স্পষ্ট ধারণাও নেই। সেজন্য ফ্রিল্যান্সিং পেশাটি এখনও উপেক্ষিত।


ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা সেটাকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। যেমন কেউ ব্যাংকে কাজ করলে বলা হয় ব্যাংকার। এটা একটা পদবী। তেমনিভাবে ফ্রিল্যান্সারও যে একটা সম্মানজনক পেশা, এর মাধ্যমে ঘরে বসে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায় এরও একটা পদবী দেয়া দরকার। এই স্বীকৃতি দেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।


সাকিব বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রজেক্টের নোয়াখালী জেলার ওয়েবের মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি নিজের কিছু ওয়েব ডেভেলপিং কাজও করছেন। আর চেষ্টা করছেন গ্রাম পর্যায়ে ভালো ভালো ফ্রিল্যান্সার তৈরি করতে।


প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে চান সাকিব। নতুন কিছু শিখে অন্যকে তা শেখাতে ভালো লাগে তার। অনেক বড় প্রোগ্রামার হতে চান তিনি। তার স্বপ্ন, ভবিষ্যত হয়তো কোনো একদিন গুগল থেকে তার কাছে চিঠি আসবে তাদের সাথে কাজ করার। নিজেকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে এবং বাংলাদেশের একজন নামকরা প্রোগ্রামার হতে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন সাকিব।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com