ফ্রিল্যান্সার আমেনা আক্তারের জীবনকথা
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৫:৩৬
ফ্রিল্যান্সার আমেনা আক্তারের জীবনকথা
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

''অনার্সে ভর্তি হওয়ার পরপরই পড়াশোনার পাশাপাশি নিজে কিছু একটা করার বিষয়ে আগ্রহী হই। নিই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। ২০১১ সালের দিকে ইন্টারনেট ঘেঁটে অনলাইনে ঘরে বসে আয় করা সম্পর্কে জানতে পারি। বিষয়টা আমার ভালো লেগে যায়। পেশাটা নারীদের জন্য সবচেয়ে উত্তম, কেননা বাইরে চাকরি করতে গিয়ে নানারকম হয়রানির শিকার হওয়ার চেয়ে বাসায় বসে আয় করাই ভাল। মূলত এ বিষয়টি আমাকে ফ্রিল্যান্সিং করার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে।''


কথাগুলো বলেন সফল ফ্রিল্যান্সার আমেনা আক্তার। বর্তমানে তিনি সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) ও গ্রাফিক্স ডিজাইন নিয়ে ফ্রিল্যান্সিংকরছেন। পাশাপাশি নিজের প্রতিষ্ঠিত ফ্রিল্যান্সিং আইটি প্রতিষ্ঠান টেরিস্ট্রিয়াল আইটিতে অনলাইন মার্কেটারের দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্বের সেরা অনলাইন মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্ক এ ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে গত ছয় বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্লায়েন্টকে সেবা দিয়ে আসছেন।


সম্প্রতি বিবার্তার মুখোমুখি হয়ে আমেনা আক্তার জানালেন ফ্রিল্যান্সার হওয়ার পথে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা এবং এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার করে কীভাবে ফ্রিল্যান্সার হয়ে ওঠা যায়। বিবার্তার পাঠকদের জন্য ওই গল্প তুলে ধরছেন উজ্জ্বল এ গমেজ।



চাঁদপুরের উত্তর মতলব থানার বদরপুর গ্রামে শৈশব ও কৈশোর কাটে আমেনার। বাবা সিদ্দিকুর রহমান একজন স্কুলশিক্ষক আর মা গৃহিণী। গ্রামের আর পাঁচজন মেয়ের মতোই রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা তার। ফ্রিল্যান্সার স্বামী মো. নাজমুল ইসলাম একজন ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার। দু'জনের ছোট পরিবারে রয়েছে এক বছরের ছেলে আফনান ইসলাম আদীব।


ফ্রিল্যান্সার হওয়ার শুরুটা কীভাবে? জানতে চাইলে আমেনা বলেন, অনার্সে ভর্তি হয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু একটা করার ভাবনা থেকেই ফ্রিল্যান্সিংয় শুরু। এসইও-এর কাজ করার খুব আগ্রহ থাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি একটি স্বল্পমেয়াদি কোর্স করে নিলাম। হাসান সুমন, ফকরুল ইসলাম ভাইদের কাছে থেকেই আমার হাতেকলমে শিক্ষা, বিশেষ করে ফকরুল ভাই (যিনি বর্তমানে জার্মানিতে)। তারপর শিক্ষক/গুরু হলেন আমার জীবনসঙ্গী, অভিভাবক, পরম বন্ধু মো. নাজমুল ইসলাম। উনারা সবাই তখন সফল ফ্রিল্যান্সার। তারপর যখনই সমস্যায় পড়তাম প্রশ্ন করে গুগলে সার্চ দিয়ে বের করার চেষ্টা করতাম,পাশাপাশি ইউটিউব, এসইও সম্পর্কিত ব্লগ, ফোরাম সাইটের সাহায্য নিতাম।



তিনি বলেন, ২০১১ সালে জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেস ওডেক্সে অ্যাকাউন্ট খুলি। এসইও এবং এসএমএসের মাধ্যমে এই জগতে পদার্পণ হয়। আসলে এসইও কাজ করতে গিয়ে গ্রাফিক্স ডিজাইনের (ফটোশপ) কাজ করতে হতো। বিশেষ করে ইমেজ এডিটিংয়ের কাজ। তাই গ্রাফিক্স ডিজাইনের কোর্স করি এবং পরবর্তিতে কাজের পাশাপাশি ঘরে বসেই অনলাইনে ও স্বামীর সযোগিতায় ওয়ার্ডপ্রেসের কাজ শিখি, যা আমাকে একজন সফল মার্কেটার হয়ে ওঠায় দারুণভাবে সহযোগিতা করে। পরে এটিই মহিলা শাখায় সেরা ফ্রিল্যান্সার হওয়ার গৌরব এনে দেয়।


শুরুর দিকে আপনাকে কি ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে আমেনা জানালেন, আমার জন্য যেহেতু ফ্রিল্যান্সিংটা ছিল সম্পূর্ণ নতুন বিষয়, তাই অসংখ্যবার বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। ওই সময় আমাদের দেশের ইন্টারনেট স্পীড ছিল অনেক কম। ইন্টারনেট একজন ফ্রিল্যান্সারের প্রাণস্বরূপ। স্পীড কম থাকায় অনেক সময়ই ক্লায়েন্টদের কাজগুলো ঠিক সময়ে করে দেয়া সম্ভব হতো না।



ফ্রিল্যান্সিং করতে ইংরেজি জানাটা অত্যন্ত জরুরি। এই জগতে যোগাযোগের একমাত্র ভাষা ইংরেজি আর একজন এসইও এক্সপার্টের জন্য তো প্রধান হাতিয়ার। সেই সাথে রাত জেগে কাজ করা, মাঝরাতে স্কাইপে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অযাচিত লোকের মেসেজ, কল তো ছিল অত্যন্ত বিরক্তিকর। এসবকে উপেক্ষা করে কাজ করে যাওয়া ও অভিজ্ঞতা অর্জন করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।


আমেনা জানান, ফ্রিল্যান্সিং করে যে পরিমাণ আয় করছি, স্থানীয় কোনো চাকরি করেও হয়তো এতো টাকা আয় করা সম্ভব হতো না। আমার দৃষ্টিতে ফ্রিল্যান্সিং একটা স্বাধীন পেশা। এখানে নিজের পছন্দমতো বিষয় নিয়ে কাজ করার অবারিত সুযোগ রয়েছে। আমি ইতোমধ্যেই বেশ কিছু বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছি এবং নিজেকে আরো দক্ষভাবে তৈরি করার জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় আয়ত্ব করছি, যেটা সারা জীবনের পথ চলায় সাহায্য করবে।



আমেনা ফ্রিল্যান্সিংয়ের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে চান বহুদূর। ফ্রিল্যান্সিংয়ের পাশাপাশি তিনি ইতোমধ্যেই একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছেন। তিনি টেরিস্ট্রিয়াল আইটি নামে একটা আইটি প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন। এটাকে তিনি বিশ্বমানের একটি আইটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়তে চান। টেরিস্ট্রিয়াল আইটিকে বিশ্বের সব প্রান্তে পৌঁছে দিতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।


সমাজ সেবা করার ইচ্ছাটা ভীষণভাবে লালন করেন আমেনা। এই লক্ষ্যে এটুআই, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ওম্যান ইন আইটি (বিডব্লিউআইটি)-এর সহযোগিতায় ‘নারী আইসিটি ফ্রিল্যান্সার এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসুচি’র আওতায় ময়মনসিংহের ভালুকায় এবং কুড়িগ্রামে প্রশিক্ষক হিসেবে বেশ কিছু দিন ধরে কাজ করেছেন এবং অন্যান্য জেলাতেও এই প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা করছেন। এসব প্রশিক্ষণ, সভা, সেমিনার থেকে তিনি উপলব্ধি করেন দেশের নারীদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকার নারীদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহী ও সচেতন করে তুলতে নিজ উদ্যোগে একটি অনলাইন প্রশিক্ষণ স্কুল চালু করছেন। স্কুলটির প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। খুব অল্পদিনের মধ্যেই এর কার্যক্রম শুরু হবে জানালেন আমেনা।


বিবার্তা/উজ্জল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com