৭ মার্চের ভাষণ বাজানোয় ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে মারধর, ওসি বললেন ভাষণ নিষিদ্ধ
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪১
৭ মার্চের ভাষণ বাজানোয় ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে মারধর, ওসি বললেন ভাষণ নিষিদ্ধ
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোকে কেন্দ্র করে শাহবাগ থানার সামনে দু’পক্ষের হাতাহাতি ও একজনকে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ কর্মী দাবিতে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে।


শনিবার (৭ মার্চ) দিবাগত রাতে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে শাহবাগ।


ঘটনাস্থলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারা উপস্থিত রয়েছেন।


মারধরের শিকার ব্যক্তি হলেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন। শনিবার (৭ মার্চ) রাতে শাহবাগ থানার ভেতরে এই মারধরের ঘটনা ঘটে। প‌রে আব্দুলাহ আল মামুনকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়।


এই ঘটনায় পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি ব‌লে জা‌নি‌য়ে‌ছে পু‌লিশ।


এর আগে, রাজধানীর চানখারপুলে সাউন্ড বক্সে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে আটকের প্রতিবাদে শাহবাগ থানার সামনে মাইকে করে ৭ মার্চের ভাষণ বাজান ডাকসু নির্বাচনে প্রতিরোধ পর্ষদের ভিপি প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি। পরে এই ঘটনার প্রতিবাদে শাহবাগ থানার সামনে অবস্থান নিয়েছে ডাকসুর নেতা ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা।


কিছুক্ষণ পরে আরেকটি গ্রুপ এসে বাধা দিতে চাইলে দুপক্ষের মধ্যে হাতাহাতির সৃষ্টি হয়। যারা ভাষণ বাজাতে না করছিল তাদের সঙ্গে কথা বলা হলে তারা নিজেদের ‘সাধারণ জনতা’ বলে পরিচয় দেয়। এদেরকে শাহবাগ থানার সামনে থেকে আসতে দেখা যায় এবং পরবর্তীতে থানায় প্রবেশ করতে দেখা যায়।


শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি বলেন, “মাইকে ভাষণ বাজানোর এক পর্যায়ে কিছু লোকজন শাহবাগ থানার সামনে থেকে এসে ভাষণ থামাতে বলেন— যা বাকবিতন্ডায় রূপ নেয়।”


তিনি আরও বলেন, “বিনা উসকানিতে অসম যে হামলাটি করা হলো— এটি অত্যন্ত ধিক্কারজনক। তাদের যে ইনসিকিউরিটি তা প্রমাণ করে যে আমরা ইতিহাসের সঠিক দিকে আছি।”


সেখানে উপস্থিত বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে জামায়াত বাদে কারও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ নাই, ছাত্রদল হোক ছাত্রলীগ হোক প্রত্যেকটা সংগঠনে এরা ঢুকে বসে আছে।”


তিনি আরও বলেন, “শুধুমাত্র এই রাজাকারের বাচ্চারা বাদে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সেসব নিয়ে কোনও বিরোধিতা নাই।”


এসময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা জোনের ডিসি মাসুদ আলম বলেন, “তারাবীর নামাজের সময় এখানে মাইক নিয়ে এসে মাইক বাজানো— এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক। এটা মব তৈরি করার চেষ্টা।”


পরবর্তীতে ১০ টা ১৫ মিনিটের জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হয়ে ভাষণ বাজানোর বিরুদ্ধে স্লোগান ও বক্তব্য দেন।


জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাবি কমিটির আহ্বায়ক তাহমিদ আল মুদাসসির চৌধুরী বলেন, “আজ বিকালে যাকে আটক করা হয়েছে তাকে ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর জন্য আটক করা হয়নি বরং সে ‘নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের’ সঙ্গে জড়িত।”


তিনি আরও বলেন, আজ যারা তাকে মুক্তিযুদ্ধের আড়ালে, ৭ মার্চের আড়ালে এই ছাত্রলীগারকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।


পরবর্তীতে সেখানে ডাকসু নেতারা যেমন সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদ এবং সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের উপস্থিত হন এবং তারাও ভাষণ বাজানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।


এরপর সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দেকের নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে অবস্থান নেন। পরে তারা রিকশায় বসে থাকা ইমিকে রিকশাসহ শাহবাগ থানায় নিয়ে যান। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, মুসাদ্দেক রিকশার প্যাডেল ধরে রিকশাটি থানার ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন।


এরপর রাত পৌনে এগারটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী আল মামুনকে ছাত্রলীগ বলে অভিযোগ তুলে মারধর করে জাতীয় ছাত্রশক্তি নেতাকর্মীরা এবং আরও কিছু উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা।


সেখানে একপর্যায়ে ইমির সঙ্গে থাকা আল মামুনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে তাকে মেরে প্রথমে শাহবাগ থানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে আবার আল-মামুনকে টেনে-হিঁচড়ে থানার ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো সময় ইমি মামুনকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় পিছন থেকে একজন ইমির চুল ধরে টান দেন। পরবর্তীতে তারা ইমি ও আল মামুনকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করে।


পরবর্তীতে জানা যায়, আল মামুন শহীদ সার্জেন্ট জহরুল হক হল ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক।


ঘটনার পর ইমি তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “আল মামুনের ওপর হামলা করসে জুবায়ের আর মোসাদ্দেকের নেতৃত্বে। আমার গায়েও হাত তুলেছে। যতদিন বেঁচে থাকবো, দাবায়ে রাখতে পারবা না।”


বিকালে চানখারপুল মোড় থেকে আটক করা সাবেক ঢাবি শিক্ষার্থী এবং শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগের কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক সেই ব্যক্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে ডিসি মাসুদ বলেন, “ছাত্রলীগের যেহেতু পদধারী নেতা এবং ছাত্রলীগ যেহেতু নিষিদ্ধ আর জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকার কথা আমরা শুনছি এবং কিছু লিঙ্ক পেয়েছি, এগুলা দেখে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো।”


এর আগে দুপুরে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকা থেকে সাউন্ডবক্সসহ তাকে আটক করে শাহাবাগ থানায় নেওয়া হয়। আটক আসিফ আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শহীদুল্লাহ হলের শিক্ষার্থী।


প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ৭ মার্চ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলের পার্শ্ববর্তী চানখাঁরপুল এলাকায় সাউন্ড বক্সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ বাজাচ্ছিলেন আটক ওই শিক্ষার্থী। ভাষণের বিখ্যাত অংশ “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম” বাজতে শোনা যায়। এসময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য সেখানে উপস্থিত হলে তাদের সঙ্গে তার কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি হয়।


একপর্যায়ে পুলিশ তাকে একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশায় করে থানায় নিয়ে যায়। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে সাউন্ড অপারেটর ও মালিককে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সাউন্ড বক্সগুলো জব্দ করা হয়।


শাহবাগ থাকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “তি‌নি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজাচ্ছিলেন। এইটা তো নিষিদ্ধ এজন্য নিয়ে আসা হয়েছে।” কোনও অভিযোগ এসেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অভিযোগ দিচ্ছে বলেই তাকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।”


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com