
বিশ্বজুড়ে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হার্টের রোগ। কিন্তু এই রোগ নিয়ে এখনও অজস্র ভুল ধারণা রয়েছে জনমনে। অনেকে মনে করেন, তারা ঝুঁকির বাইরে; কারণ তারা তরুণ বা বাইরে থেকে দেখতে সুস্থ। বাস্তবে হার্টের স্বাস্থ্য নির্ভর করে জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং বংশগত হার্টের অসুখের ইতিহাসের ওপর। তাই ভুল ধারণাগুলো ভেঙে সচেতন হওয়াই সুস্থ থাকার প্রথম ধাপ।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হার্টের রোগ নিয়ে নিচের প্রচলিত ১০টি ভুল ধারণা থেকে সাবধান না হলে অকালেই মরতে হতে পারে আপনাকেও।
হার্টের রোগ শুধু বয়স্কদের হয়: এই ধারণাটি একেবারেই ঠিক নয়। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, শরীরচর্চায় অনীহা এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ, এসব কারণে অল্প বয়স থেকেই হার্টের ক্ষতি হতে শুরু করে। এখন তরুণের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল দেখা যায়। তাই বয়স কম হলেও অবহেলা না করে এখন থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া জরুরি।
হার্টের রোগ শুধুই পুরুষদের সমস্যা: অনেকেই ভাবেন হার্টের রোগ শুধু পুরুষদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বিশ্বজুড়ে নারীদের মৃত্যুরও অন্যতম কারণ হার্টের রোগ। নারীদের ক্ষেত্রে উপসর্গ অনেক সময় ভিন্ন থাকে এবং সহজে বোঝা যায় না। ফলে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়, যা ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
কোনো উপসর্গ নেই মানেই হার্ট ঠিক আছে: হার্টের অনেক সমস্যাই দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে। উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কিন্তু অনেকে তা টেরই পান না। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষণই হয় হার্ট অ্যাটাকের মতো গুরুতর ঘটনা। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানও খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা যায়।
পরিবারিক ইতিহাসে হার্টের রোগ না থাকলে ঝুঁকি নেই: অনেকে মনে করেন পরিবারে কারও হার্টের রোগ না থাকলে তাদের কোনো ঝুঁকি নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীবনযাপনই সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং মানসিক চাপ-এসব কারণে যে কোনো মানুষ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাই পারিবারিক ইতিহাস না থাকলেও সচেতন থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।
বুকে ব্যথাই হার্ট অ্যাটাকের একমাত্র লক্ষণ: বুকে তীব্র ব্যথা হার্ট অ্যাটাকের একটি সাধারণ লক্ষণ হলেও এটি একমাত্র নয়। অনেক সময় শ্বাসকষ্ট, বমিভাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, মাথা ঘোরা কিংবা ঘাড় ও চোয়ালে ব্যথাও হতে দেখা যায়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই উপসর্গগুলো বেশি দেখা দেয়। তাই এসব লক্ষণ অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
আমি রোগা, আমার চিন্তা নেই: অনেকে মনে করেন শরীর পাতলা হলে হার্টের রোগের ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু এটি পুরোপুরি ভুল ধারণা। অনেক রোগা মানুষও খারাপ খাদ্যাভ্যাস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা ব্যায়ামের অভাবের কারণে ঝুঁকিতে থাকেন। শরীরের ওজন নয়, বরং জীবনযাপনই হার্টের স্বাস্থ্যের আসল নির্ধারক।
শুধু ওষুধই যথেষ্ট: ওষুধ হার্টের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করলেও এটি একমাত্র সমাধান নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ কমানো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে ফল ভালো হয় না। তাই ওষুধের সঙ্গে জীবনযাপনে পরিবর্তনও সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
সব ধরনের ফ্যাট খারাপ: অনেকেই ভাবেন সব ধরনের ফ্যাট শরীরের জন্য ক্ষতিকর, কিন্তু আসলে তা নয়। আমন্ড, অলিভ অয়েল ও অ্যাভোকাডোর মতো উৎস থেকে পাওয়া ভালো ফ্যাট হার্টের জন্য খুবই উপকারী। এগুলো কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো হার্টের ঝুঁকি বাড়ায়।
উচ্চ রক্তচাপ হলে বুঝতে পারবেন: উচ্চ রক্তচাপকে ‘নিরব ঘাতক’ বলা হয় কারণ এটি সাধারণত কোনো লক্ষণ ছাড়াই বাড়তে থাকে। অনেক মানুষ স্বাভাবিক বোধ করেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঝুঁকি বাড়তে থাকে। একসময় হঠাৎ করে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
হার্টের রোগ থাকলে ব্যায়াম করা উচিত নয়: অনেকে ভয় পান যে ব্যায়াম করলে হার্টের সমস্যা আরও বাড়বে। কিন্তু সঠিক নিয়ম মেনে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম করলে হার্ট আরও ভালো থাকে। এটি রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে এবং বিভিন্ন ঝুঁকি কমায়। তাই একেবারে নিষ্ক্রিয় না থেকে, সক্রিয় থাকা জরুরি।
হার্টের রোগ নিয়ে এ ভুল ধারণাগুলো অজান্তেই জীবনের ঝুঁকি বাড়ায়। সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সঠিক জীবনযাপনই পারে এই ঝুঁকি কমাতে। তাই ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য গড়ে তোলে। আজ থেকেই নিজের হার্টের যত্ন নেয়া শুরু করুন, কারণ সুস্থ হৃদয়ই সুস্থ জীবনের ভিত্তি।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]